মিনু তার র্যাকেট কভারের চেন টেনে খুলল। সারের উপদেশ মনে পড়ল,’যতক্ষণ না রেডি হচ্ছ ততক্ষণ কোর্টে নামবে না।’ বাঁ কব্জিতে সোয়েটলেটটা আর একবার ঘুরিয়ে একটু তুলল। এখন তার দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে এসেছে। র্যাকেটটা চোখের সামনে ধরে হাতের তালুতে আঘাত করে তাঁতের বাঁধন টানটান আছে কি না অনুভব করল। বাতাসে কয়েকবার সে র্যাকেট চালিয়ে ব্যাকহ্যান্ড ও ফোরহ্যান্ড মারল।
”দেয়ার উইল বি আ থ্রি—মিনিট নক আপ।” আম্পায়ার জানিয়ে দিলেন দু’জনকে।
মিনু প্রথম বল মারার আগে হাতের খিল ছাড়াবার জন্য র্যাকেটটা ঘোরাতে লাগল। অরুণ বেস লাইনে এগিয়ে গেছে। এরপর দু’জনে র্যালি শুরু করতেই মিনুর হাতের আড়ষ্টতা কেটে যেতে লাগল। চারপাশের দর্শক, বাবা—মা, সার আর চিনুকে চোখের বাইরে রেখে ধীরে ধীরে সে তার দৃষ্টিকে গুটিয়ে আনল সাদা লাইন কাটা ঘাসের জমির মধ্যে, যে জমিতে শুধু টেনিস বল আর অরুণ মেটাকে নিয়ে এবার সে থাকবে।
”ওয়ান মোর মিনিট।”
অরুণ পরপর দুটো ভলি নেটে মারল। মিনুর মনে হল ও ভাল করে হাতটা তুলতে পারছে না, বল নজর করতেও যেন ওর অসুবিধে হচ্ছে।
প্রথম সার্ভ করল অরুণ। মিনু একটা পয়েন্টও নিতে না দিয়ে ওর সার্ভিস ভেঙে নিজের সার্ভিস ধরে রেখে ২—০ গেমে এগিয়ে গেল।
পরের দুটো গেম, মিনুর সার্ভিস ভেঙে অরুণ দখল করল। ২—২—এর পর পঞ্চম গেমে শুরু হল যেন তলোয়ারের খেলা। ভোঁতা ডগার তলোয়ার নিয়ে ওলিম্পিকসে যে প্রতিযোগিতা হয়—এই বাড়িয়ে দিচ্ছে,পাঁয়তারা করছে, ঝনঝন ঠোকাঠুকি হচ্ছে, একে অপরকে বুঝে নিচ্ছে—সেইভাবে যেন তারা খেলতে শুরু করল। ৩—৩, ৪—৪, ৫—৫। এর পরই খোঁচাখুঁচি আর আত্মরক্ষার ভঙ্গিটা বদলে এসে গেল আক্রমণ। এবার ভোঁতা ডগার তলোয়ারের বদলে ওদের হাতে উঠে এল তীক্ষ্ন ডগার ধারালো ফলার বাঁকা তলোয়ার। বনবন করে ঘোরাতে ঘোরাতে এবার তারা নিধনের জন্য মেতে উঠল।
মিনুর কপাল থেকে গাল আর নাকের দু’ধার দিয়ে ঘাম ঝরছে। আঙুল দিয়ে কপাল থেকে ঘাম মুছল। সে জানে অরুণের থেকে তার শরীর মজবুত, ফুসফুসের ক্ষমতাও বেশি। এখন তাকে শুধু একটা কাজই করতে হবে—কোর্টে টিকে থাকা আর অরুণকে ছুটিয়ে খাটিয়ে ধীরে ধীরে যন্ত্রণার মধ্যে নিয়ে ফেলা।
প্রথম সেট মিনু জিতল ৭—৫। দ্বিতীয় সেট অরুণ পেল ৮—৬। তৃতীয় সেটে আবার শুরু হল জাঁতাকলে পেষাই। ঘাসের কোর্টে খেলার ধরন হয় সার্ভ আর ভলি, পয়েন্ট জেতা হয় খুব অল্প সময়ে। কিন্তু মিনু খেলার ধরনটা এমনই মন্থর করে দিয়েছে যেন খেলা ক্লে কোর্টে। বুদ্ধিটা, বলাবাহুল্য, সহদেবের। অরুণকে তার স্বাভাবিক খেলা খেলতে না দেওয়ার জন্যই এই কৌশল। কিছুদিন আগেই সৈদুলের কাছ থেকে সহদেব শুনে নিয়েছেন অরুণ সহনশীলতা বাড়াবার জন্য দৌড়য় না। ওকে অবসন্ন করে শেষ করে দেওয়ার নির্দেশ মিনুকে তিনি দিয়েছেন।
এখন দু’জনেই পরীক্ষায় নেমেছে শরীর আর মন কতক্ষণ কষ্ট সইতে পারবে তাই নির্ধারণের জন্য, কতক্ষণ অরুণ মনে রাখতে পারবে খেলায় সে জিততে চায়। যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মিনুর আগে আগুনের ওপর থেকে সে কখন হাত সরিয়ে নিয়ে জেতার বাসনা জুড়িয়ে ফেলবে, তারই খেলা চলেছে।
অরুণ বুঝতে পেরেছে মিনুর কৌশল। মরিয়া হয়ে এবার সে চেষ্টা শুরু করল দ্রুত পয়েন্ট জেতার জন্য। র্যালি কমিয়ে একটা মার থেকেই পয়েন্ট জেতার জন্য সে শট নিতে থাকল। কোর্টের এধার—ওধার থেকে প্রায় অসম্ভব শট ছোটাছুটি করে নিল। মিনুর র্যাকেট ধরা মুঠোয় আঙুলের ছাল উঠে গেছে। জড়ানো টেপের ফাঁক দিয়ে ঘাম ঢুকে আঙুল জ্বলছে। সে মুঠো শক্ত করল।
দর্শকরা শ্রান্ত হয়ে পড়ছেন টেনশনের জন্য। নিশ্বাস ধরে রেখে বেশিক্ষণ খেলা দেখা যায় না। অনেকে চেয়ার থেকে উঠে কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন, তখন কোর্টে খেলোয়াড় দু’জনও তাদের কাঁধে, তাদের মুঠোয়, পায়ের তলায় এবং হাজার হাজারবার সার্ভিস করায়, পাঁচ—ছ’ মাইল দৌড়োনোয় সাহায্য করা পেশিগুলোয় সেই শ্রান্তি বোধ করছে। বোধ করেও তারা কোর্টে দাঁড়িয়ে। পরস্পরের দিকে ওত পেতে। একে অন্যকে ডাইনে বাঁয়ে ছোটাচ্ছে,পেছনে হটাচ্ছে, নেট থেকে ঠেলে দিচ্ছে, শরীরকে শাস্তি দিচ্ছে, ক্রমশ চুপসিয়ে আসছে এবং এইরকমই চলবে যতক্ষণ না কোনও একজনের পেশির ওপর থেকে তার মস্তিষ্ক কর্তৃত্ব হারায়।
অরুণের মস্তিষ্ক তার দুই পা, দুই হাত এবং দুই চোখের কাছে কাজ করার দাবি জানাতে লাগল। কিন্তু পা দুটো মন্থর হতে শুরু করেছে, হাত দুটো দুর্বল হয়ে পড়ছে আর চোখ দুটো সেকেন্ডের ভগ্নাংশের দেরিতে বল দেখছে।
মিনু এবার সংহার শুরু করে দিল। ফেরত দেওয়া অসম্ভব, এমন কিছু সার্ভ আর ভলি পরপর মেরে সে অরুণকে ব্যতিব্যস্ত করল; আর অরুণের সার্ভগুলো গুঁড়িয়ে ভলিগুলোকে ঘুসিয়ে, আঘাতের পর আঘাত হেনে গেল যতক্ষণ না ১১—৯—এ অরুণ পরাজয় মানতে বাধ্য হল।
কোর্ট থেকে বেরিয়ে এষস মিনু চেয়ারে বসল। কথা বলার, জল খাওয়ার, এমনকী হাসার মতো ক্ষমতাও তার নেই। মুখটা ফ্যাকাসে, চোখ বসা। বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে। সহদেব জলের বোতল হাতে দিয়ে বললেন,”এখন চুপ করে বসে থাকো।”
সৈদুলের কাঁধে হাত রেখে ছাপান্ন গেম খেলা শ্রান্ত দেহটাকে টানতে টানতে প্রাক্তন রাজ্য জুনিয়ার চ্যাম্পিয়ান হেঁটে চলে গেল ড্রেসিং রুমে।
