বুকপকেট থেকে পার্কার ফাউন্টেন পেনটা তুলে নিয়ে তন্ময়ের হাতে দিয়ে বললেন,”মৃন্ময়কে আমার উপহার।”
.
বেঙ্গল লন টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে রাজ্য জুনিয়ার চ্যাম্পিয়ানশিপ শুরুর দু’দিন আগে খেলার ফিক্সচার দেখে সহদেবের চোখ কুঁচকে উঠল। বত্রিশ জনকে নিয়ে চ্যাম্পিয়ানশিপ হচ্ছে। ফিক্সচারের ওপরের দিকে ষোলো জনের মধ্যে রয়েছে অরুণ মেটা। তলার দিকের ষোলো জনে রয়েছে মিনু, সেইসঙ্গে চিনুও। দু’জনেই যদি তাদের প্রথম দুটো ম্যাচ জেতে তা হলে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে দুই ভাই।
সহদেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াবে? সন্দেহ নেই মিনুই জিতবে। চিনু হরিণের গতিতে তার খেলায় উন্নতি করেছে কিন্তু মিনু করেছে চিতাবাঘের গতিতে। দু’জনের মধ্যেকার ব্যবধানটা এতই যে, মিনু তার অর্ধেক খেলা খেলেই চিনুকে স্ট্রেট সেটে হারাবে। কিন্তু এর ফলে কোনও খারাপ প্রতিক্রিয়া ঘটবে না তো? দুই ভাইয়ের মধ্যে এত মনের মিল, একের জন্য অপরের এত ভালবাসা, হরিহর আত্মার মতো দু’জনের সম্পর্ক তাতে চিড় ধরবে না তো?
সহদেব বুঝে উঠতে পারছেন না মিনুর মনে ভাইকে হারিয়ে দেওয়ার দুঃখটা কতখানি বাজবে, কতদিন ধরে তাকে মানসিক অবসাদের মধ্যে রাখবে। চিনুর মনেও অভিমানের মেঘ কতটা জমবে সেটাও তাঁর অনুমানের বাইরে। অবশেষে তিনি ঠিক করলেন ব্যাপারটা ওদের বাবা—মায়ের হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভাল। বিষয়টি নিয়ে তিনি ছেলে দুটির সামনে আলোচনা করতে চান না, তাই ওরা মায়ের সঙ্গে স্কুলে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তন্ময় যখন খেতে বসেছেন তখন সহদেব তাঁকে সমস্যার কথা জানালেন।
তন্ময় শুনেই বললেন,”ফিক্সচারটা বদলানো যায় না?”
”অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন বদলানো যায় না।” সহদেব মাথা নাড়লেন।
”কিন্তু ভাইয়ের হাতে ভাই হারবে এটা তো মেনে নেওয়া যায় না।…যাই হোক, তপতী আসুক, ওঁর সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটার একটা নিষ্পত্তি করুন।”
তন্ময় বেরিয়ে যাওয়ার পর সহদেব অপেক্ষা করলেন তপতীর ফিরে আসার জন্য। মিনিট দশেকের মধ্যেই তিনি ফিরলেন।
”দিদি, আপনার জন্যই বসে আছি।” তপতী কিছু বলার আগেই সহদেব কথা শুরু করে দিলেন। তাঁর অপেক্ষা করার কারণটা তপতী শুনলেন। ”এটা নিয়ে এত ভাবার কী আছে? দু’জনকে যদি মুখোমুখি হতে হয়, হবে। সহদেববাবু আপনি অযথাই একটু বেশি বেশি ধরে নিচ্ছেন। খেলাটা ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের তো হবে না, হবে দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে। আপনিই তো বহুদিন ওদের বলেছেন, ‘নেটের ওধারের লোকটা তোমায় খতম করতে চায় তাই তোমার একমাত্র কাজ আগেই ওকে খতম করে দেওয়া। সব সময় ভাববে ও লোকটা তোমার শত্রু, ও তোমায় দয়া করবে না। তুমিও কখনও দয়া দেখাবে না।’ সহদেববাবু এখন কি ওদের অন্যরকম কিছু বলবেন?”
সহদেব চুপ করে রইলেন।
।।৯।।
প্রথম রাউন্ডের ষোলোটি ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই বোঝা গেল অন্তত পঁচিশজন খেলোয়াড়ের এই চ্যাম্পিয়ানশিপে খেলার কোনও যোগ্যতা নেই। মিনু তার প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারাল ৬—০, ৬—০। ষোলোটা ‘এস’ সমেত সে ম্যাচটা শেষ করল পঁয়ত্রিশ মিনিটে। চিনু জিতল ৬—১, ৬—২। দ্বিতীয় রাউন্ডে মিনু জিতল ৬—১, ৬—০, চিনু হারাল তার থেকে পাঁচ বছরের বড় একজনকে ৬—৩, ৬—১।
কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার আগের রাতে যখন ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া বিশ্বচরাচর নিঝুম, তখন মিনু হাত বাড়াল পাশের খাটের দিকে। চিনুর কাঁধে তার আঙুল ঠেকল।
”ঘুম আসছে না?”
”না।”
”কী ভাবছিস?”
”অনেকদিন আগে আমায় কুকুরে তাড়া করেছিল। তুই আমাকে আড়াল করে ঘুঁসি চালাচ্ছিলি। একটা লোক এসে কুকুরদুটোকে তাড়িয়ে দিল। তুই আমাকে পরে বললি ‘ভয় কী রে, আমি থাকতে ভয়ের কিছু নেই।’ এখন আবার বলবি কথাটা।”
”কেন?”
”আমার খুব ভয় করছে। কাল তুই বোধ হয় ইচ্ছে করে হেরে যাবি।”
মিনু হাত টেনে নিল। অনেকক্ষণ পরে সে বলল,”কাল আমি জিতব।…এবার ঘুমো।”
তপতী আর তন্ময় ইচ্ছে করেই দুই ছেলের খেলা দেখতে কলকাতায় গেলেন না। সন্ধ্যায় সহদেবের সঙ্গে তারা ফিরতেই বাবা—মা প্রথমেই দুই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে খেলার ফল বোঝার চেষ্টা করলেন। দু’জনের মুখেই তৃপ্তির ছোঁয়া লেগে। তাঁরা সহদেবের দিকে তাকালেন। সেখানেও সুখের আভাস।
”সিক্স—থ্রি, সেভেন—ফাইভ। চিনু যে এমন খেলা খেলবে ভাবতে পারিনি। আপনারা যদি যেতেন তা হলে খেলার মতো খেলা একটা দেখতে পেতেন। কোর্টের ধারে অন্তত জনা ষাটেক লোক জমে গেছল। এত লোক এখনও কোনও ম্যাচে হয়নি। সেকেন্ড সেটটা নরেশকুমার দেখে বলল, ছোটভাইয়ের টাচ খুব ভাল, কৃষ্ণনকে মনে পড়িয়ে দেয় কিন্তু পাওয়ার আর স্পিড এই দুটোতেই ও বড় ভাইয়ের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এমন হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচ দেখে কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এরা দুই ভাই! রীতিমতো লড়ে মিনুকে জিততে হয়েছে।”
”যাক, আমার দুশ্চিন্তা দূর হল, বোধ হয় আপনারও।” তপতী বললেন সহদেবকে।
”কোথায় দূর হল, এখন তো চিনুর স্পিড আর পাওয়ার নিয়ে আমায় ভাবতে হবে। এখানে দু’জনের মধ্যে খেলায় তো এমন প্রচণ্ডভাবে ভেতরের জিনিস বেরিয়ে আসে না, যা আজকে দেখা গেল।”
.
আম্পায়ারের উঁচু চেয়ারের দু’পাশে দুটি চেয়ার। তার একটি মৃন্ময় বসুমল্লিকের জন্য,অপরটি অরুণ মেটার।
