তপতী প্রতিবাদ করলেন,”সে তো অনেকেই খেলেছে, কই এমন ভাবে তো তাদের সম্পর্কে লেখা হয়নি।”
”সহদেববাবু, মিনুর সম্পর্কে যা বলা হয়েছে সেটা এখনই বলার মতো খেলা কি খেলেছে?” তন্ময় সিরিয়াস স্বরে জানতে চাইলেন।
”ভাস্কর মুখার্জি বহু বছর ধরে বহু প্লেয়ারকে দেখেছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, কৃষ্ণন, প্রেমজিত, জয়দীপের পরের একটা ব্যাচ তৈরির জন্য এ আই এল টি এ চারজন জুনিয়ারকে ইউরোপ ট্যুরে পাঠাবে। মিনু যদি জুনিয়ার ন্যাশনালের সেমিফাইনালেও উঠতে পারে তা হলে ট্যুরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।” সহদেব মিনুর দিকে তাকালেন। মুখে পাতলা হাসি। মুখ নামিয়ে মিনু ভাত খেয়ে যাচ্ছে।
”পারবি না মিনু?” তন্ময় আশান্বিত স্বরে জানতে চেয়ে একটা ইতিবাচক উত্তরের আশায় তাকালেন।
মুখ না তুলে মিনু ভাত মুখে একটা শুধু শব্দ করল। যেটা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দুইই হতে পারে।
”সেমিফাইনালে যেতে পারবি?” তন্ময় আবার বললেন।
”তন্ময়বাবু এসব কথা থাক এখন।” সহদেব প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য তাড়াতাড়ি যোগ করলেন, ”আগে জুনিয়ার বেঙ্গলটা উতরোক। ধাপে ধাপে জিনিসগুলো হওয়া ভাল।”
খাওয়া শেষ করে মিনু হাত ধোওয়ার জন্য উঠে যেতেই সহদেব বললেন,”জুনিয়ার ন্যাশনাল নিয়ে একটা কথাও ওকে বলবেন না। অযথা মনের ওপর একটা প্রেশার তৈরি হবে। আপনাদের আশা যত বাড়বে, প্রেশারটাও তত বাড়বে, বাচ্চচা ছেলে সেটা নিতে পারবে না।”
”আপনি ঠিকই বলেছেন।” কথাটা বলে তপতী চাহনি দিয়ে স্বামীর ভর্ৎসনা জানালেন। ”চিনু, এসব নিয়ে কারও সঙ্গে গল্প করবে না।”
খাওয়া চিনুরও শেষ হয়েছে। চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে সে বলল,”খবরের কাগজটা আমি স্কুলে নিয়ে যাব, সবাইকে দেখাব। নর্থ ক্যালকাটার কাপ জেতার থেকেও স্টাফ রিপোর্টারের এই কথাগুলো দাদার মান বাড়িয়েছে।”
”একদম নয় চিনু।” তপতী ছিলেছেঁড়া ধনুকের মতো দাঁড়িয়ে উঠলেন। ”কাউকে কিছু দেখাতে হবে না।…এখানকার কারোর কোনও প্রশংসা আমার দরকার নেই, আমার ছেলেদেরও দরকার নেই।” তপতী উত্তেজনায় কাঁপছেন।
”চিনু যদি তুমি এই কাগজ নিয়ে কাউকে দেখাও বা কাউকে এর উল্লেখ পর্যন্ত করো তা হলে র্যাকেট দিয়ে তোমার পিঠ ভাঙব।”
তুই নয় তুমি! মার মুখের দিকে তাকিয়ে চিনু বুঝে গেল র্যাকেট তার পিঠের সঙ্গে মাথাও ভেঙে দিতে পারে। সে একটি কথাও আর না বলে বেরিয়ে গেল। তপতীর হঠাৎ এমন আচরণে তন্ময় ও সহদেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এভাবে ওঁকে রেগে উঠতে তাঁরা কখনও দেখেননি।
”এখানকার কয়েকটা লোক এমন সব কথা রটিয়েছে, যা শুনলে মনে হবে পৃথিবীটা খুব খারাপ জায়গা…আমি চাই ছেলেরা জানুক পৃথিবীটা খুব ভাল জায়গা।…এরপর হয়তো শুনব কাগজের রিপোর্টারকে টাকা খাইয়ে লিখিয়ে নিয়েছি। এরা সব কিছুই বলতে পারে।”
তপতী বেরিয়ে গেলেন গাড়ি বের করতে। সহদেব নিচু গলায় বললেন,”দিদিকে কিন্তু আর রাগতে দেবেন না, তা হলে ছেলেদের ক্ষতি হবে।”
”আমি কি রাগিয়েছি না কি! রাগ বহুদিন জমে ছিল, আজ সেটা ফেটে বেরোল। তবে এটুকু বলতে পারি, আর কখনও রাগবে না।” তন্ময় নিশ্চিত স্বরে জানালেন।
বাইরে হর্ন বাজল। মিনু চিনু স্কুলব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল।
”তা হলে এবার?” তন্ময় বললেন।
”এবার জুনিয়ার বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ানশিপ।” সহদেব আড়মোড়া ভাঙলেন।
ছেলেদের পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময় তপতী একটা শক্ত মলাটের সাদা এক্সারসাইজ খাতা কিনে আনলেন। বাড়ি এসে দেখলেন তন্ময় স্নান করতে কলঘরে গেছেন। খবরের কাগজ থেকে টেনিস ম্যাচের রিপোর্টের অংশটি কাঁচি দিয়ে কেটে গঁদ লাগিয়ে তিনি কাটিংটা খাতার প্রথম পাতায় সেঁটে দিলেন।
অফিসে যাওয়ার সময় খবরের কাগজটা খাওয়ার টেবলে ভাঁজ করা পড়ে আছে দেখে তন্ময় থমকে গেলেন। তপতী রান্নাঘরে। সেদিকে দু’বার তাকিয়ে চট করে কাগজটা তুলে হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। অফিসে প্রথমেই তিনি গেলেন ম্যানেজিং ডিরেক্টরের ঘরে। তিনি ব্যস্ত টেলিফোনে কথা বলায়। তন্ময় খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে মুখ হাসি হাসি করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
”কী ব্যাপার বসুমল্লিক?” এম ডি ফোন রেখে বললেন।
”সার, আজকের কাগজে আমার বড়ছেলের সম্পর্কে দুটো সেন্টেন্স আছে। দেখুন।” তন্ময় গর্বিতভাবে স্পোর্টসের পাতাটা খুলে কাগজটা হাতে দিয়ে মুখ ফ্যাকাসে করে ফেললেন।
”কী হল!”
”সার একটা গোলমাল হয়ে গেছে। রিপোর্টটা কেউ কেটে নিয়েছে, বোধ হয় আমার স্ত্রী। আই অ্যাম ভেরি সরি।” তন্ময় কাঁচুমাচু।
এম ডি হাসি চেপে হাত বাড়িয়ে র্যাকে রাখা তিন—চারটে খবরের কাগজের থেকে একটা তুলে নিলেন। পাতা উলটে বললেন,”এই খবরটা?”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ।” তন্ময়ের ধড়ে যেন প্রাণ এল।
এম ডি দু’বার পড়লেন। ভ্রূ কয়েকবার উঠল, নামল। তন্ময়ের মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললেন,”পাঁচটা গেম নিয়েছে, আ বিগ অ্যাচিভমেন্ট।”
.
”বেঙ্গল লন টেনিসের প্রেসিডেন্ট বলেছেন যদি ন্যাশনালের সেমিফাইনালেও উঠতে পারে তা হলে ইউরোপ ট্যুরের জন্য মিনু সিলেক্ট হতে পারে।”
এম ডি চোখ কুঁচকে বললেন,”ইউরোপ ট্যুরে? বলেন কী! এই মহাদেবপুর থেকে ইউরোপে খেলতে যাবে? মাই গড! এটা তো আমাদের পক্ষে খুব গর্বের ব্যাপার হবে।”
