”একমাস তা হলে স্কুল করা হবে না।” মিনু মনে করিয়ে দিল।
”তা হবে না। যদি কলকাতায় থাকতে তা হলে হাফ স্কুল করেও খেলতে যেতে পারতে। কিন্তু এখান থেকে পৌঁছতেই তো দেড়—দু ঘণ্টা লেগে যাবে।…স্কুল কামাই করতেই হবে।” সহদেব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালেন।
”একমাস কামাই করলে আমাদের তো নাম কেটে দেবে।”
তপতী গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন,”আমি বরং একবার হেডমাস্টারমশাইকে বলে দেখি যদি মাসখানেকের জন্য ছুটি দেন।”
”যদি না দেয়?” চিনুর চোখে সংশয়।
”না দিলে কী আর করা যাবে, নাম কেটে দিলে দেবে।” তপতী সহজ সুরে কথাগুলো বললেন কিন্তু ঋজু ভঙ্গিতে। ”কেউ যদি অসুখে পড়ে একমাস স্কুলে না যায় তা হলে কি তার নাম কাটা যাবে?”
”আমাদের তো অসুখ নয়।” চিনুর আবার সংশয়।
”তার থেকেও বড় ব্যাপার, সুস্থ থাকার জন্য খেলা! হয়েছে এবার, চলো। সহদেববাবু আপনি টুর্নামেন্টের তারিখগুলো যদি দেন তো কথা বলতে সুবিধে হবে। তবে একটা কথা, ছুটি না দিলেও ওরা কিন্তু খেলতে যাবে।”
এক সপ্তাহ পর তপতী দেখা করলেন হেডমাস্টারের সঙ্গে। তপতীর কথা শুনে পুরো পনেরো সেকেন্ড তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন,”ছেলে দুটো লেখাপড়া শিখে মানুষ হোক, বড় হোক, এটা কি আপনি চান না?”
”মানুষ হোক এটা তো অবশ্যই চাই। কিন্তু লেখাপড়া শিখলেই মানুষ হবে, এ—ধারণাটাও তো ঠিক নয়। জীবনের আরও অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, যেখান থেকে বড় হওয়া যায়। ছবি আঁকা,গানবাজনা, অভিনয় নাচের মধ্য দিয়ে যেমন, তেমনই খেলার মধ্য দিয়েও তো বড় হওয়া যায়, সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায়। এই স্কুলের সব ছেলেই কি স্টার পেয়ে পাশ করে? আমার ছেলেরাও নয় স্টার লেটার পাবে না কিন্তু অন্যদিকে তো স্টার পেতে পারে।” তপতীর গলা আবেগে একটু চড়ে গেল, সেটা বুঝতে পেরেই তিনি লজ্জিত হয়ে পড়লেন।
”তা ঠিক। সবাই স্টার লেটার পায় না।” হেডমাস্টার গম্ভীর মুখে সামনে ঝুঁকে বললেন। ”মৃন্ময়, চিন্ময় স্ট্যান্ড করে না বটে, কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্টও খারাপ নয়। কিন্তু এতদিন স্কুল কামাই করে খেলে বেড়ানো, এটা আমি সমর্থন করতে পারছি না।”
”আমরা ঝুঁকি দিয়ে দু’জনকে টেনিস প্লেয়ার তৈরি করছি, আপনিও একটু ঝুঁকি নিন না আমাদের সঙ্গে। এই স্কুলের দুটি ছেলে যদি খেলায় নাম করে তা হলে তো স্কুলেরও সুনাম হবে।” তপতী আশাভরে হেডমাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হল,’স্কুলের সুনাম’ কথাটায় বোধ হয় কাজ হয়েছে। হেডমাস্টার ঠোঁট টিপে মাথা নাড়লেন, চোখ দুটো একটু বড় হল।
”এক মাস স্কুলে না এলে পড়াশুনোয় পিছিয়ে পড়বে।”
”আমি বাড়িতে পড়িয়ে সেটা মেকআপ করে দেব…গ্যারান্টি দিচ্ছি।
”বেশ, ওরা খেলুক। মিসেস বসুমল্লিক এই ফেভার কিন্তু এই একবারই; আর কিন্তু দেব না। আশা করি আপনিও আর চাইবেন না।”
”চাইব না।”
.
মিনু চারটে টুর্নামেন্টের তিনটিতে জুনিয়ার চ্যাম্পিয়ান হল একটা সেটও না হারিয়ে। চিনু তিনটির দুটিতে কোয়ার্টার ও একটিতে সেমিফাইনালে উঠেছিল। সহদেব শুধু অর্ডন্যান্স ক্লাবের টুর্নামেন্টে মিনুকে সিনিয়ার বিভাগে এন্ট্রি করিয়েছিলেন ওর যোগ্যতা ও ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য। সেমিফাইনালে উঠে সে ভারতের ডেভিস কাপার প্রেমজিত লালের সামনে পড়ে। ২—৬,৩—৬—এ হেরে যায় মিনু। ম্যাচটা গড়িয়েছিল পঁয়ষট্টি মিনিট। প্রতিটি পয়েন্টের জন্য মিনু লড়াই করেছে আর সেটাই ভাল লেগেছে দর্শকদের, বিশেষ করে বেঙ্গল লন টেনিসের প্রেসিডেন্ট ভাস্কর মুখার্জির, তিনি অল ইণ্ডিয়া লন টেনিসেরও ট্রেজারার। মিনুকে কাছে ডেকে বলেন,”শুনলাম তুমি সহদেবের হাতে তৈরি, তা হলে তো আর কিছু বলার নেই। তবে এখন তুমি স্টেট আর ন্যাশনাল লেভেলে খেলার কথা ভাবো। প্রেমজিতের কাছে তুমি যে হারবে এটা আমি ধরেই নিয়েছিলাম, কিন্তু কীভাবে হারো সেটাই দেখার ছিল। আমি খুশি তোমার খেলা দেখে। বয়স কত?”
”চোদ্দোয় পড়েছি।”
ভাস্কর মুখার্জির ভুরু উঠে গেল। ”তোমাকে তো ষোলো—সতেরো ভেবেছিলাম। এই বয়সেই প্রেমজিতের কাছ থেকে পাঁচটা গেম নিয়েছ!” মিনুর পিঠ চাপড়ে তিনি অন্য লোকের সঙ্গে কথায় ব্যস্ত হলেন। ওদের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ইংরেজি কাগজের সাংবাদিক। তিনি ভাস্কর মুখার্জির কথা শুনেছিলেন। সাংবাদিক এক ফাঁকে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন ”বসুমল্লিক সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?” ”ওয়ান অব দ্য মোস্ট প্রমিসিং জুনিয়ারস ইন দ্য কান্ট্রি।” পরদিন সাংবাদিক তাঁর রিপোর্টে দুটি বাক্য লিখলেন মিনু সম্পর্কে: ”বসুমল্লিকের বয়স মাত্র চোদ্দো, কিন্তু লালকে ব্যস্ত রেখে সে পাঁচটা গেম ছিনিয়ে নিয়েছে। টেনিস রসিকদের ধারণা, এই কিশোর ভারতীয় টেনিসে একদিন উজ্জ্বল তারকা হয়ে উঠবে।”
পরদিন তপতী বাক্য দুটি পড়তে পড়তে চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। ‘একদিন উজ্জ্বল তারকা হবে উঠবে’ এই স্বপ্নই তো তাঁদের চালিয়ে নিয়ে এসেছে পাঁচটা বছর।
সকালে খাওয়ার টেবলে কাগজটা সকলের হাতে ঘুরল। এর আগে মিনু যে তিনটি টুর্নামেন্টে জুনিয়ার খেতাব জিতেছে তাতে শুধু সিনিয়ারদের ফল কাগজে বেরিয়েছিল। আর এবার নামের সঙ্গে দুটো কথাও। তন্ময় বললেন ”এর কারণ অবশ্য প্রেমজিত লালের সঙ্গে খেলেছে বলে।”
