”আর?”
”লক্ষ্যপূরণের জন্য মনকে—” চিনু দাদার দিকে তাকাল।
”একমুখীন করতে হবে।” মিনু সম্পূর্ণ করে দিল।
”তোমরা কি তাই করছ?” তপতী ছেলেদের যখন গভীর কোনও কথা বলেন তখন ‘তুই’ হয়ে যায় ‘তুমি’। ”আজ তোমরা কোর্টে নামতে চাইলে না কেন? তোমাদের লক্ষ্য বড় প্লেয়ার হওয়া, কিন্তু আজেবাজে কথা শুনে…।”
”আজেবাজে? প্রণবেন্দু যে কথাটা বলল সেটা আজেবাজে?” রাগে ফুঁসে উঠল মিনু।
”হ্যাঁ আজেবাজে।” শান্ত ধীর স্বরে তপতী কথাটা বলে ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মিনু চোখ নামিয়ে নিল।
”তুমি জানো, পরিশ্রম করে কোনও অন্যায় সুযোগ না নিয়ে, পাঁচজন প্লেয়ারকে পরিচ্ছন্নভাবে হারিয়ে কাপটা জিতেছ।…নিজের কাছে তুমি সৎ। এটাই হল বড় কথা, একমাত্র কথা। জেতার জন্য তোমার মনের মধ্যে একটা সুন্দর অনুভূতি পেয়েছ, তোমার কাজ এই অনুভূতিটাকে বাঁচিয়ে রাখা। তা করতে পারলে দেখবে একটা দুর্লভ ট্রফি তুমি জিতে ফেলেছ।” তপতী কথা শেষ করে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। চিনু—মিনু উৎসুক কৌতূহলভরে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
”নিজেকে নিজের ভাল লাগছে—এটাই হল ট্রফি আর এই ট্রফিটা তোমাদের জিততে হবে। সেজন্য যা কিছু সুন্দর জিনিস, সংগ্রহ করে মনে ভরে রাখতে হবে। তা করতে পারলে দেখবে মন একমুখীন হয়েছে। কুৎসা ঈর্ষা রটনা এসব হল আবর্জনা। এগুলো দিয়ে মন ভরিয়ে ফেললেই দেখবে তোমাদের ভেতর দুর্গন্ধ জমে উঠেছে, শ্বাস নিতে পারছ না, ছটফট করছ। তখন মন আর একমুখীন হতে পারবে না…তোমরা বড় প্লেয়ার কেন, কিছুই হতে পারবে না।”
তপতীর নম্র স্বর সারা ঘরে একটা গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করেছে। মিনু একদৃষ্টে টেবলের একটা বইয়ের দিকে তাকিয়ে। চিনু ইরেজারটাকে নখ দিয়ে খুঁটছে। তপতী আড়চোখে দেখলেন বসার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তন্ময় নিঃশব্দে হাসছেন।
”তাই বলে আমরা হজম করে যাব?” চিনু এখনও মানতে পারছে না সকালে স্কুলের ঘটনাটা।
”হজম করতে না পারলে কোরো না। আমরা কত আশা নিয়ে তোমাদের দিকে তাকিয়ে, তোমরা বড় প্লেয়ার হবে, আমাদের বুক গর্বে ভরে উঠবে। আমাদের দেখে লোকে বলবে ‘ওই যে মৃন্ময় বসুমল্লিকের মা, ওই যে চিন্ময় বসুমল্লিকের বাবা।’ আর আমরা বলব,’ওই দেখো আমাদের মিনু, ওই দেখো আমাদের চিনু, ওদের জন্য আমরা কত কষ্ট করেছি, কত অপমান—কুৎসা সয়েছি। আজ দ্যাখো ওদের কত নাম, কত যশ, ওরা বাবা—মা’র মুখ রেখেছে,ওরা বাবা—মা’কে ভালবাসে।…”’ তপতী থেমে গেলেন মিনুর চোখ ছলছল করছে দেখে। চিনু দু’ হাতে আঁকড়ে মায়ের ডান বাহুতে মুখ চেপে ধরল।
”…কিন্তু মিনু আর চিনু একটা বড় ভুল করে বসল। মায়ের কথা না শুনে ওরা লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে মনকে অশান্তিতে ভরিয়ে তুলল, তাই ওরা বড় হতে পারল না। মা আর বাবাকে দুঃখ দিল। কেউ আর বলবে না ওই যে মৃন্ময় বসুমল্লিকের মা, ওই যে চিন্ময়—।” তপতীকে থেমে যেতে হল।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে মিনু টেবলের বইগুলিকে দু’হাত দিয়ে ছত্রখান করে টেবলে একটা ঘুঁসি বসিয়ে চিৎকার করল,”না,না,না।” তারপরই সে ছুটে নিজেদের ঘরে চলে গেল।
”চিনু!” তপতীর বাহু কামড়ে ধরেছে চিনু।
”আমি হজম করব।”
মিনিটখানেক পর ব্যস্ত হয়ে বেলা হাজির হল। ”কী হয়েছে গো বউদি? মিনু বিছানায় উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেন গো?”
”ও কাঁদছে আর এ কামড়াচ্ছে, কী করি বলো তো?” কৃত্রিম অসহায়তা ফোটালেন তপতী তাঁর গলায়।
দিনকয়েক পর তপতী কোর্টের ধারে বসে। চিনু—মিনুকে দাঁড় করিয়ে সহদেব কথা বলছেন।
”ভলি মারার জন্য, রিফ্লেক্সের স্পিড বাড়াবার জন্য, তোমাদের কব্জির আর হাতের জোর বাড়াবার জন্য নেট গেম প্র্যাকটিসটা আজ অন্যভাবে করতে হবে। বাঁ হাতটা পিঠে ঠেকিয়ে তোমাদের খেলে যেতে হবে। ব্যালেন্সের জন্য একটা হাত না থাকলে দেখবে তোমাদের আরও চটপট মুভ করতে হচ্ছে, উপরন্তু যাবতীয় চাপ পড়বে ডান হাতের ওপর। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছ?” দু’জনে মাথা নাড়ল। ”এবার করে দেখা যাক।”
পাঁচ মিনিটের মধ্যে দু’জনেই তিন—চারবার কোর্টে পড়ে গেল ভারসাম্য হারিয়ে।
”আস্তে খেলো আস্তে, প্রথম দিনেই অত ফাস্ট মুভ করতে যেয়ো না…মিনু ব্যাকহ্যান্ডটা বড় দেরিতে হিট করছ তাই বল বাইরে যাচ্ছে, আরও তাড়াতাড়ি র্যাকেটটা পেছনে নাও, মাথাটা নামিয়ে দাও স্ট্রোক নেওয়ার সময়…লবটা আরও তুলে দাও চিনু, সূর্যের দিকে তাকাতে মিনুকে বাধ্য করো” সহদেব সমানে চিৎকার করে গেলেন এবং দশ মিনিট পরই ছেলে দুটি দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁফাতে শুরু করল।
”কী হল?” সহদেব ধমকে উঠলেন।
”সার দু’ মিনিট।” মিনু আবেদন জানাল। সহদেব ঘড়ি দেখতে লাগলেন।
”দু’ মিনিট হয়ে গেছে, স্টার্ট।”
বিকেল গড়িয়ে গেছে। চারদিক ধূসর হয়ে উঠছে। গাছে গাছে পাখিদের কিচিরমিচির। চিনু, মিনু ক্লাবের কলে মুখ হাত পা ধুয়ে ফিরে এল।
”চারটে ক্লাব টুর্নামেন্টে তোমাদের এন্ট্রি করিয়েছি, দুটো হবে হার্ডকোর্টে। শ্যামবাজার,কাশীপুর, অর্ডন্যান্স, স্যাটারডে, টানা প্রায় একমাস।
”নানারকমের কোর্টে, নানা কন্ডিশনে, নানা ধরনের প্লেয়ারদের সঙ্গে তোমাদের এখন খেলা দরকার, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তোমাদের ডেভেলপমেন্টের জন্য।”
সহদেব জুতোর ভেতর থেকে কাঁকর ঝেড়ে ফেলে ফিতে বাঁধলেন।
