”কেন পেলেন না সেটা তো আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, আমি তো কাগজের সম্পাদক নই।” তপতী শান্ত স্বরে পরিহাস মিশিয়ে বললেন।
”হয়তো ছাপার যোগ্য খবর নয় বলেই ছাপেনি।” হেডমাস্টারের গলা ঈষৎ তির্যক।
”তা হতে পারে।” তপতী উঠে দাঁড়ালেন। ”আমি এটা নিয়ে যাচ্ছি।”
”হ্যাঁ, নিশ্চয়। ওটা তো দেখা হয়ে গেছে।”
তপতী যত্নভরে কাপটা দু’হাতে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ধীর পায়ে।
বাড়ি ফিরে তিনি বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে রইলেন। বেলা একসময় খেতে ডাকল। ”মাথা ধরেছে”, ”খিদে নেই” বলে কিছু খেলেন না। গাড়ি নিয়ে স্কুলে গেলেন ঠিক সাড়ে তিনটেয়। চিনু—মিনু যখন গাড়ির দিকে আসছে তিনি তীক্ষ্নদৃষ্টিতে ওদের মুখের দিকে তাকালেন। দুই ছেলেরই মুখ গম্ভীর। জামাপ্যান্টে মারামারির কোনও চিহ্ন নেই দেখে তিনি খানিকটা আশ্বস্ত হলেন। তবে মুখের ভাব তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলল। সকালে শোনা কথাগুলো বোধ হয় ওদের মন থেকে মুছে যায়নি।
গাড়িতেই ওরা প্যান্ট শার্ট বদলে খাবার খেয়ে নেয়। কিন্তু আজ খানিকটা খেয়ে রেখে দিল। পোশাক বদলাল না।
”ড্রেস চেঞ্জ করবি না?” গাড়ি চালাতে চালাতে তপতী বললেন।
”না।” চিনু বলল।
”খেলবি না?”
”ভাল লাগছে না।…মা এই স্কুলে আর পড়ব না।” চিনুর স্বরে ক্ষোভ আর বিরাগের সঙ্গে তিক্ততা মাখানো রয়েছে। মিনু চুপ করে আছে।
তপতী উত্তর দিলেন না। তিনি বুঝতে পারছেন দু’জনের মনের অবস্থা। এখন কথা না বলাই ভাল। জমে ওঠা রাগ আর বেদনা ওরা বার করে দিক আগে।
সহদেব অপেক্ষা করছিলেন। তপতী নিজেই বললেন,”আজ আর ওয়ার্ক আউট করাবেন না সহদেববাবু, ওদের মন খুব বিক্ষিপ্ত রয়েছে।”
”সে কী! একটা তো মোটে টুর্নামেন্ট জিতল, এখনও অনেক জিততে হবে মিনুকে। আমি তো ঠিক করে রেখেছি ওকে এ—বছরই কলকাতার সব টুর্নামেন্টে নামাব।”
”তা নামাবেন। কিন্তু আজ থাক, কারণটা আমি পরে বলছি। বরং ওরা নিজেদের মধ্যে খেলুক তা হলে মনটাকে কিছুটা গুছিয়ে নিতে পারবে।”
সহদেব দু’জনকে ডাকলেন। ”ড্রেস করোনি কেন? যাও চেঞ্জ করে এসো…আজ দু’জনে সেকেন্ড সার্ভ প্র্যাকটিস করো। মিনু কাল তিনটে ডাবল—ফল্ট করেছ।”
”আজ আমি কোর্টে নামব না।” মুখ নিচু করে গোঁয়ারের মতো মিনু দাঁড়িয়ে রইল।
”চিনু?”
”আমিও না।”
সহদেব চোখে প্রশ্ন নিয়ে তপতীর দিকে তাকালেন।
”তা হলে আজ থাক।” তপতী বললেন।
”বেশ, তা হলে মন গুছিয়ে নেওয়ার খেলাই ওরা খেলুক।” সহদেব একটা বল তাঁর হাতের র্যাকেটের ওপর রেখে ঝাঁকুনি দিয়ে বলটাকে প্রায় পনেরো ফুট শূন্যে ছুড়ে দিলেন। পড়ন্ত বলটা তাঁত ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে র্যাকেটটা নীচে নামিয়ে নিতে নিতে বলটাকে তিনি তাঁতের ওপর স্থিরভাবে বসিয়ে নিলেন, যেন জালে ধরা পড়ল বলটা। দু’বার—তিনবার করলেন।
”মিনু র্যাকেট নাও। বলেছ যখন কোর্টে তোমায় আজ নামতে হবে না। এখন তুমি ওদিকে কুড়ি পা যাও।”
নির্দেশ মতো কোর্টের বাইরের জমিতে মিনু গুনে গুনে কুড়ি পা দূরত্বে গেল। সহদেব র্যাকেটে রাখা বলটা ছুড়ে দিয়েই বললেন,”র্যাকেটে ধরো।”
মিনু র্যাকেট আলতো করে বলের সঙ্গে নামিয়ে নিতে নিতে তাঁতের ওপর বলটা ধরল।
”ছুড়ে দাও, যেমনভাবে আমি দিলাম।”
এর পর সহদেব বলটাকে মিনুর পেছনে, দু’পাশে কখনও—বা পাঁচ গজ সামনে পাঠাতে লাগলেন। মিনু নিখুঁতভাবে প্রতিটি বল র্যাকেটে ধরে পাঠিয়ে দিল।
সহদেব ইশারা করলেন চিনুকে। ”তুমি এবার আমার জায়গা নাও।…এটা করে যাও তা হলে ‘টাচ’ তৈরি হবে, কন্ট্রোল আসবে।” কথাগুলো বলে তিনি তপতীর পাশে এসে বসলেন। ”হ্যাঁ বলুন কী বলবেন।”
তপতী সকালে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বললেন,”ওরা কতটা দাগা পেয়েছে বুঝতেই পারছেন, খেলতে এত ভালবাসে অথচ খেলতে চাইল না।”
শুনতে শুনতে সহদেবের মুখ থমথমে হয়ে গেল রাগে। কিছুক্ষণ কথা না বলে মুখ নামিয়ে রইলেন। একসময় মুখ তুলে বললেন,”দিদি, খেলাটা কোর্টে যতটা না হয় তার থেকেও বেশি হয় মনে। আর মন যদি এইসব কথা শুনে ছত্রাকার হয়ে যায় তা হলে খেলার অবস্থাটাও তাই হবে। ওদের যদি আর একটু বয়স বা অভিজ্ঞতা হত, তা হলে নিজেরাই নিজেদের সামলাতে পারত।…এই কাজটা কিন্তু এখন আপনাকেই করতে হবে। ওদের আড়াল করা, ওদের মনের চার পাশে দেয়াল তুলে শুধু ছাদটা খুলে রাখা, সেখান দিয়ে টেনিস ছাড়া আর কিছু যেন না দেখতে পায়।…পারবেন?”
”পারতে হবে।”
।।৮।।
”মিনু, চিনু তোমরা কী হতে চাও, তোমাদের জীবনের লক্ষ্য কী?”
”বড় টেনিস প্লেয়ার হতে চাই।”
”আমিও।”
খাওয়ার টেবলে ছড়ানো বই, খাতা, স্কুলব্যাগ। তপতীর ডান দিকে চিনু, টেবলের ওধারে মিনু। কোর্ট থেকে ফিরে প্রতি সন্ধ্যার মতো তিনি ছেলেদের নিয়ে পড়াতে বসেছেন। চিনুকে অঙ্ক বুঝিয়ে দিয়ে প্রশ্নমালা থেকে দশটা অঙ্ক করতে দিয়েছেন। তারপর মিনুকে করতে দেওয়া ট্রানস্লেশন সংশোধন করতে করতে হঠাৎই তিনি ছেলেদের প্রশ্নটা করলেন। বসার ঘরে সোফায় শুয়ে তন্ময় খবরের কাগজ পড়ছেন, কাগজটা নামিয়ে তিনি দরজা দিয়ে একপলক তাকিয়ে আবার পড়তে শুরু করলেন।
”বড় প্লেয়ার হতে গেলে প্রথমেই কী দরকার?”
উত্তরটা দুই ছেলেরই বহুবার মায়ের কাছ থেকে শোনা আছে।
”কঠোর পরিশ্রম।” মিনু বলল।
