”এবার তো উনি এই কাপটা নিয়ে গিয়ে হেডমাস্টারকে দেখিয়ে ছুটি আদায় করবেন।” চন্দ্রিমা বিপন্ন স্বরে বললেন।
”করলেই হল? রমুর বাবা কী বলল জানেন, তা হলে একটা কাপ কিনে হেডমাস্টারকে দেখিয়ে বলব, রমুকে এক ঘণ্টা আগে ছুটি দিতে হবে, ডায়মন্ড হারবারে ওয়াকিং কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়েছে, হাঁটায় ওর দারুণ প্রতিভা, ওর আরও প্র্যাকটিস দরকার।” বলেই সুধা ঘোষাল হাসতে হাসতে চন্দ্রিমার গায়ে প্রায় গড়িয়ে পড়লেন। অন্য দু’জনও খুকখুক শব্দ করলেন।
”একটা জিনিস লক্ষ করেছ, টেনিস খেলাকে ছুতো করে বসুমল্লিকরা জমিটাকে নিজেদের সম্পত্তি করে ফেলেছে। কাউকে তো খেলতেই দেয় না!”প্রতিভা বললেন গলায় ক্ষোভ নিয়ে।
”যা বলেছেন!” চন্দ্রিমা সূত্রটা ধরে নিয়ে যোগ করলেন,”অনিরুদ্ধ বাগচির কেসটা জানেন তো? ছেলেটা যে কী ভাল, কী বলব! রীতিতমতো চাঁদা দিয়ে টেনিস খেলতে পাঠিয়েছিল ওর বাবা। কোথায় খেলা! শুধু নিজের ছেলে দুটোকে খেলাতেই উনি ব্যস্ত, অনিরুদ্ধ বেচারি চুপচাপ শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। শেষে ওর ঠাকুমা রেগে গিয়ে যাচ্ছেতাই বলে নাতিকে নিয়ে চলে আসেন।”
”যাক গে এসব কথা, কান্তি চা আনছে, চুপ করো।” প্রতিভা হুঁশিয়ার করে দিলেন।
ওদের টেবলের পাশের টেবলেই স্ত্রী বরুণাকে নিয়ে বসে ছিলেন এম জে টি এম—এর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজার সুভাষ সেন। ওঁর ছেলে শঙ্কু শান্তিনিকেতনে চলে যাবে, টেনিস খেলবে না, তবুও তিনি তপতীকে চাঁদা দিয়েছিলেন,কারণ বাচ্চচাদের খেলাধুলোর প্রয়োজনটা তিনি বোঝেন। পাশের টেবলের কথাবার্তার অনেকটাই তাঁদের কানে এসেছে।
”শুনলে, কী সব কথা বলল?” সুভাষ সেন স্ত্রীকে বললেন।
”কেউ ভাল কিছু করলে এইসব পুরস্কারই তার জোটে।”
”শঙ্কু যদি এখানে থাকত, তা হলে নিশ্চয় আমি ওকে টেনিস খেলতে পাঠাতাম। লক্ষ করেছ ওঁর দুটি ছেলের কী চমৎকার স্বাস্থ্য তৈরি হয়েছে! হাঁটাচলায় কত স্মার্ট! ছোটটি পাঁচ বছর আগে কী রুগণ দেখতে ছিল, রীতিমতো তো ধুঁকত। আর এখন?” সুভাষ সেনের স্বরে প্রশংসার সঙ্গে শ্রদ্ধাও ফুটে উঠল। ”সবই ওই দু’জনের জন্য।”
”সত্যিই, কষ্ট করেছেন ওদের বাবা মা।” বরুণার গলায় অকৃত্রিম সহানুভূতি। ”মিসেস বসুমল্লিককে ছেঁড়া ব্লাউজ সেলাই করে পরতে দেখেছি। তন্ময়বাবুর জুতোটা দেখেছ? তোমার বেয়ারাও ওর থেকে ভাল জুতো পরে। অথচ ছেলেদের জন্য খরচ করতে কার্পণ্য করেন না। টেনিসের কোচকেই ওঁরা দেন মাসে দুশো টাকা, ভাবতে পারো?”
ভাবতে পারেননি তপতী, মিনুর নর্থ ক্যালকাটা টুর্নামেন্ট জেতার প্রতিক্রিয়া এমন হবে।
সোমবার তিনি ছেলেদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার সময় কাপটাও সঙ্গে নিয়ে গেছলেন হেডমাস্টারকে দেখাবার জন্য। গিয়ে শুনলেন তিনি আজ স্কুলে আসবেন না, কলকাতায় মধ্যশিক্ষা পর্যদের মিটিংয়ে গেছেন। কাপটা হেডমাস্টারের টেবলের একধারে রেখে তপতী বেয়ারাকে বলে আসেন,”ওঁকে বোলো, ক্লাস এইটের বি সেকশনের মৃন্ময় বসুমল্লিক এটা জিতে এনেছে কলকাতা থেকে। আমি কাল এসে নিয়ে যাব।”
পরদিন গাড়ি থেকে নেমে তপতী দুই ছেলের সঙ্গে স্কুলের বড় ফটক দিয়ে ঢুকে স্কুলবাড়ির কোলাপসিবল ফটকের দিকে এগোচ্ছেন, তখন একটি বড় ছেলে চেঁচিয়ে বলল,”কী রে মৃন্ময়, কাকে হারিয়ে কাপটা পেলি, কৃষ্ণনকে, না জয়দীপ মুখার্জিকে?”
ওরা তিনজন থমকে পাঁচটি ছেলের জটলার দিকে তাকাল। চিনু চাপা গলায় বলল,”দাদা প্রণবেন্দু বলল, চুপ করে থাক, কথা বলিসনি।”
তিনজন কোলাপসিবল ফটকের কাছে পৌঁছেছে তখন তাদের কানে এল,”জিতে আনলি না কিনে আনলি?”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওদের পা অচল হয়ে পড়ল। তপতী তাকালেন মিনুর মুখের দিকে। অপমানে আর বেদনায় মুখটা দিশাহারা। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, জল ভরে আসছে চোখে। কথাগুলোর ধাক্কা ওর বুকে বেজেছে। ”তাড়াতাড়ি ক্লাসে যা।” তপতী দুই ছেলের পিঠে হাত রেখে ঠেলা দিলেন। ”এসব কথায় জবাব দিলে ওরা আশকারা পেয়ে আরও বলবে, ক্লাসে যা।”
”মা, আমি প্রণবেন্দুকে মারব।” চিনু জ্বলন্ত চোখে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে হাত মুঠো করল।
”মারবে? কেন?”
”দাদাকে অপমান করেছে, আমাদের সবাইকে, তোমাকে, বাবাকে মিথ্যেবাদী, জোচ্চচর বলল।”
”বলতে দে। মিনু ক্লাসে যা। চিনু খবর্দার,যদি মারপিট করিস তা হলে আমি লজ্জায় মরে যাব।”
ছেলেরা দোতলার সিঁড়ির দিকে এগোল। তপতী ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজলেন। শরীরের ভেতরটা থরথর করছে। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারেন, দেয়ালে হাত রেখে মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে মনে শুধু বলে গেলেন,”হায় ভগবান, এত পরিশ্রম, এত কষ্ট, এত সাধনা করল মিনু আর ওইটুকু ছেলের মাথায় কিনা এমন অপবাদের বোঝা তুলে দিল! ওর জীবন তো শুরুই হয়নি, আর এখনই ঈর্ষা হিংসার আঘাত ওকে পেতে হল! ভেঙে না পড়ে মিনুর নরম কাঁচা মন! ভগবান ওকে শক্তি দাও।”
তপতী হেডমাস্টারের ঘরে ঢুকলেন। দেখলেন কাপটা টেবল থেকে মেঝেয় নামানো।
”আসুন মিসেস বসুমল্লিক।” হেডমাস্টার আচার্য তিনটি চেয়ারের মধ্যে একমাত্র খালি চেয়ারটার দিকে হাত দেখিয়ে বললেন,”বসুন।” অন্য দুটি চেয়ারে দু’জন অভিভাবক বসে।
”কাল এসে কাপটা রেখে গেছেন। বেশ বড় কাপ। আজ সকালে তিনটে কাগজে খুঁজলাম—কিন্তু মৃন্ময়ের নাম তো কোথাও দেখতে পেলাম না!” হেডমাস্টারের বিস্মিত চোখে তপতী দেখতে পেলেন প্রশ্ন,’কেন পেলাম না?’
