”খুব ভাল করেছিস, দুপুরে যা খিদে পায় স্কুলে! একটা টিনের তোরঙ্গয় গরম মাংসের প্যাটিস নিয়ে রহমান বসত টিফিনের সময় স্কুলের গেটে। গোটাচারেক খেয়ে মনে হত কিছুই খাওয়া হল না। গোটা তোরঙ্গটাই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করত কিন্তু পকেটে তো আর পয়সা নেই।”
তিরিশ বছর আগে খাওয়া রহমানের প্যাটিসের স্বাদটা আবার জিভে অনুভব করার চেষ্টা করে সত্যশেখর বলল, ” যেমন মুড়মুড়ে তেমনই টেস্টি, কত তো দোকান পার্ক স্ট্রিটে, দূর দূর, একটাও কেউ রহমানের তোরঙ্গের কাছে লাগে না।” এই বলে সে চামচের দিকে হাত বাড়াল।
”আমিও তো ঠিক এই কথাই বলেছিলুম পিসিকে, কী দারুণ বড়িভাজা, মোহন্তর পকৌড়িকেও হার মানিয়ে দেবে। ব্যাসস, পিসির আঁতে ঘা পড়ল। অন্যের রান্নার প্রশংসা একদম সহ্য করতে পারে না সেটা তো তুমি জানো।”
”জানি বলেই তো সেদিন অপুর মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললুম, কী দারুণ ধোঁকার ডালনা খেলুম হাইকোর্ট পাড়ার ফুটপাতের হোটেলে। মনে আছে তোর?”
”খুব মনে আছে, পরের দিন রাতেই তো…কাকা ও মাছটা কিন্তু আমার শেয়ারের।” কলাবতী হাত তুলে কাকাকে থামিয়ে দিল। অপ্রতিভ সত্যশেখর তাড়াতাড়ি চামচে তোলা ভেটকির টুকরোটা বৌলে নামিয়ে রেখে বলল, ”বলেছিলুম তো আমার ভুলো মন। ধোঁকাটা অপুর মা রেঁধেছিল কেমন বল তো?”
”তুলনাহীন অতুলনীয়।”
”কারেক্ট। ম্যাচলেশ, ভোজনবিলাসীর সুখানন্দ। কালু, বাংলাভাষাটা আমিও জানি রে। পারিস তো ওর কাছ থেকে রান্না শিখে নে।”
”ওরে বাবা রান্নাঘরের ধারে কাছে আমায় ঘেঁষতে দেয় না। বলে রং কালো হয়ে যাবে। গরম তেলের ছিটে লেগে ফোসকা পড়ে দাগ হবে। আচ্ছা কাকা, আমার এই গায়ের রং আরও কি কালো হওয়া সম্ভব?”
”কালু, পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই, তুই যত কালো হবি ততই তোকে সুন্দর দেখাবে। পিসিকে পটিয়েপাটিয়ে ওর অ্যাপ্রেন্টিস হয়ে রান্নাঘরে ঢুকে যা। কী জিনিস যে বাবা আটঘরা থেকে তুলে এনেছেন! শুধু ওর গলার ডেসিবেলটা যদি আদ্দেক কমানো যেত!” সত্যশেখর মাথা নাড়ল আপশোসে।
”দাদু তো পিসিকে এনেছে কানাই মোদকের নাতনি আর ছোটবেলার বন্ধু সাতকড়ির মেয়ে বলে। কানাই মোদক ছিল আটঘরার লেঠেলসর্দার। তার মানে ডাকাতের ওপরেও আর এক কাঠি। দাদু বলেছিল ওর চেহারা আর গলার আওয়াজ শুনেই আমার মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় দেখা কানাই মোদককে। তারপর যখন শুনলাম সাতকড়ির মেয়ে, আর দ্বিতীয় চিন্তা করতে হয়নি।”
”কিন্তু এখন তো অপুর মাকে তৃতীয় চিন্তা করতে হবে বড়ি নিয়ে।”
”তৃতীয় কেন?”
”দ্বিতীয় চিন্তা তো আবার বড়ি দেওয়া, তৃতীয় চিন্তা বড়ি রক্ষার জন্য গুলতি তৈরি করা।”
কথা বলতে বলতে দু’জনে খাওয়া শেষ করল। বাড়ি নষ্ট বা বেড়ালের মাছ খেয়ে যাওয়াটাকে দু’জনেই কোনও গুরুত্ব দিল না বরং হাসাহাসি করল গুলতি মেরে অপুর মা’র ডাকাত তাড়ানোর গল্প নিয়ে।
.
গুলতির জন্য শ্যামার কামারশালে
অপুর মা’র জেদ আর গোঁয়ার্তুমি যে শুধু মুখের কথা নয়, সেটা বিকেলেই কলাবতী বুঝে গেল।
”কালুদিদি, আমার সঙ্গে চলো তো পেছনের মালোপাড়া বস্তিতে, মুরারিদা বলল এখানে একটা কামারশাল আছে।” অপুর মার স্বরে তাড়া কথার ভঙ্গিতে ব্যস্ততা। ধবধবে দামি থানের ওপর গায়ে মুগার চাদর জড়ানো, পায়ে চামড়ার চটি। বাড়ির বাইরে বিশেষ কাজে যেতে হলে অপুর মাকে এই সাজে যেতে হয় রাজশেখরের নির্দেশে।
কলাবতী অবাক হয়ে বলল, ”কামারশাল সে আবার কী? যেখানে যাবে কেন?”
আরও অবাক হয়ে অপুর মা বলল, ”সে কী কামারশাল কী জান না। সাঁড়াশি, খুন্তি, হাতা, সাঞ্চা, চাটু, গজাল, লাঙলের ফলা, আংটা এইসব কামারেরা যেখানে তৈরি করে তাকেই কামারশাল বলে। আমাদের আটঘরায় ছিল সূয্যিকামার, ওর বাড়িতেই ছিল কামারশাল। একহাত দিয়ে সে মাঝে মাঝে হাপর টেনে হাওয়া চালিয়ে কয়লার আগুন উসকে গনগনে করত, আর অন্য হাতে সেই কয়লার মধ্যে ঢোকানো লোহাটাকে সাঁড়াশিতে ধরে উলটেপালটে দিত। লোহা লাল টকটকে হলে তখন লম্বা সাঁড়াশি দিয়ে ধরে নেহাইয়ের ওপর রেখে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে চ্যাপটা করত কি বাঁকিয়ে গোল করত।
”ডাকাতে ভুলুকাকার ঘরের দরজার লোহার হুড়কো ভেঙে দিয়েছিল। সুয্যিকামার পরের দিনই নতুন একটা বানিয়ে দেয়, সেই সঙ্গে মোটা একটা শিকলও। তোমাকে মুখে বলে কামারশাল বোঝাতে পারব না, এখন চলো তো আমার সঙ্গে, মুরারিদাকে বললুম আমাকে কামারশালটা একবার দেখিয়ে দাও, তাইতে বলল বুড়ো বয়সে ওসব ছেলেমানুষি খেলনা তৈরি করে দিতে বললে কামারটা তো হেসে গড়াগড়ি খাবেই আর মালোপাড়ার বাচ্চচারা আমাকে দেখলেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলবে ‘বুড়োখোকা গুলতি ছোড়ে, বুড়োখোকা গুলতি ছোড়ে।’ মুরারিদা তাই বলল যেতে হয় তুমি একাই যাও—আমি গুলতির মধ্যে নেই।”
এবার কলাবতী বুঝতে পারল পিসি কেন মালোপাড়ায় কামারশালে যেতে চাইছে। লোহার গুলতি বানিয়ে কাকেদের ভয় দেখিয়ে বড়ি রক্ষার জন্য পিসি যে এমন জেদ ধরবে সেটা শতচেষ্টা করেও সে কল্পনায় আনতে পারবে না। তার খুব মজা লাগল অপুর মা’র গম্ভীর উৎকণ্ঠিত মুখ দেখে।
”মুরারিদার এমন কথা বলা খুব অন্যায় হয়েছে। গুলতি সব বয়সের মানুষই ছুড়তে পারে। পিসি, এক মিনিট দাঁড়াও, আমি চটিটা পরে আসি, তোমার সঙ্গে যাব।”
