মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দু’জনে বেরিয়ে পড়ল মালোপাড়ার উদ্দেশে। সিংহিবাড়ির পশ্চিমে আট ফুট উঁচু পাঁচিল। পাঁচিল ঘেঁষে মাটি আর খোয়ার সরু গলি চলে গেছে একটা পানাপুকুরের ধার দিয়ে দক্ষিণে, এটাকে বলা হয় পগার গলি। সেই পুকুরে গোটা মালোপাড়া কাপড় কাচে, বাসন মাজে এবং স্নান করে। বাড়ির ছাদ থেকে কলাবতী দেখেছে গরমের দিনে ছোট ছেলেমেয়েরা দুপুরে সাঁতারও কাটে। পুকুরটার ধারে একখণ্ড জমি, সেখানে ছেলেরা ফুটবল খেলে বাঁশের পোস্ট পুঁতে, রবারের বল দিয়ে ক্রিকেটও খেলে। মাঠের ধারেই মালোপাড়া। পগার গলি দিয়ে ক্বচিৎ যাতায়াত করে লোকজন। পাঁচিলের একটা ছোট্ট একপাল্লার লোহার দরজা দিয়ে পগার গলিতে যাওয়া যায়। লোহার খিল দিয়ে দরজাটা বন্ধ থাকে। আজ সেই দরজা দিয়ে বেরোল কলাবতী আর অপুর মা।
পগার গলি দিয়ে তারা পুকুরধারের মাঠে এল। মাঠ পেরিয়ে তারা ঢুকল মালোপাড়া বস্তির মধ্যে। কলাবতী আগে কখনও বস্তি দেখেনি। চার হাত চওড়া মাটির রাস্তায় মুখোমুখি বাড়ি বা ঘরের সারি। রাস্তার ধারে খোলা নর্দমায় জমে রয়েছে থকথকে পাঁক। ইঁটের পাতলা দেওয়ালের ধারে ছোট ছোট জানলা, ঘরের ছাদ টিনের বা খোলার বা টালির। ঘরগুলো একটার সঙ্গে অন্যটা লেগে রয়েছে। অদ্ভুত এক ধরনের গন্ধ সে পেল, আগে যা কখনও তার নাকে লাগেনি। গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠল। চাপা গলায় সে বলল, ”পিসি কোথায় কামারশাল? একটু তাড়াতাড়ি চলো।”
দু’জনে পা চালিয়ে দ্রুত এগোল। একটি ছোট মেয়ে দুটি বাচ্চচা সমেত একটা ছাগল নিয়ে আসছে। তাকে দাঁড় করিয়ে অপুর মা জিজ্ঞেস করল, ”হ্যাঁ রে মেয়ে, এখানে কামারশালটা কোথায় জানিস?”
মেয়েটি চোখ কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, ”জানি না।”
সেইসময় দরজা খুলে বেরোল বয়স্কা এক স্ত্রীলোক, হাতে প্লাস্টিকের বালতি। কৌতূহলে সে অপুর মাকে জিজ্ঞেস করল, ”কাকে খুঁজছেন?”
”শুনেছি এখানে একটা কামারশাল আছে।”
”আছে। কী করবেন সেখানে?”
‘গুলতি করাব’ বলতে গিয়ে থেমে ঢোক গিলে অপুর মা বলল, ”সাঁড়াশি করাব।”
”ভেঙে গেছে বুঝি। আজকালকার সাঁড়াশির যা দশা, আমারটা দু—দু’বার ঢলঢলে হয়ে খুলে গেল। ওই শ্যামা কামারকে দিয়ে নতুন একটা তৈরি করালুম, তা আজ ছ’মাস হয়ে গেল এখনও বেশ টাইট আছে। ওর হাতের কাজ খুব ভাল, তবে গাঁজা না খেলে ও মন দিয়ে একদম কাজ করতে পারে না। আমি তো আট আনার গাঁজা কিনে দিয়ে একবেলার মধ্যে সাঁড়াশিটা করালুম। আসুন আমি দেখিয়ে দিচ্ছি, তবে একটা কথা বলে রাখি, কামারশালটাল বলা ও কিন্তু পছন্দ করে না, বলতে হবে শ্যামাচরণের কারখানা। না বললে আপনার কাজ নাও নিতে পারে।”
স্ত্রীলোকটি এই বলে হাঁটতে শুরু করল। ওরা দুজন পিছু নিল। প্রথম বাঁকটা ঘুরতেই পড়ল একটা বেলগাছ, তার নীচে টিউবওয়েল এবং প্লাস্টিকের জারিকেন, বালতি, মাটির কলসি, পেট্রলের টিন ইত্যাদির দীর্ঘ লাইন টিউবওয়েল থেকে থার্ড ব্যাকেটের মতো হয়ে রাস্তায় এসেছে, স্ত্রীলোকটি হাতের বালতি লাইনের শেষে রেখে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বউকে বলল, ”ফুলি, বালতিটা দেখিস। আমি এদের শ্যামার কারখানায় পৌঁছে দিয়েই আসছি।” এই বলে সে ব্যস্ত পয়ে হাঁটতে শুরু করে দিল।
শ্যামার কামারশাল বা কারখানা বস্তির আর একপ্রান্তে এবং বড় রাস্তার ধারে।
কলাবতী বলল, ”পিসি, আমরা তো মানিকতলা মেন রোড দিয়েই আসতে পারতুম, মিছিমিছি বস্তির মধ্য দিয়ে আসতে হল। এই রাস্তা দিয়েই তো বড়দিদের বাড়ি যাওয়া যায়।”
”এরপর যখন আসব বড় রাস্তা দিয়েই আসব।”
একটা টালির চালের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্ত্রীলোকটি বলল, ”এইটেই শ্যামার কারখানা, ও ভেতরে রয়েছে। যান কথা বলুন।” তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, ”আমি চারটে টাকা আর গাঁজা দিয়ে সাঁড়াশি করিয়েছি। আপনি কিন্তু এর বেশি দিয়ে রেট খারাপ করে দেবেন না। ও যদি চায় দশ টাকা, আপনি তখন বলবেন তিন টাকা। তারপর দরকষাকষি করে রাজি হবেন চার টাকায়। মনে রাখবেন, তাড়াতাড়ি পেতে চান যদি, তা হলে ওই গাঁজাটা দিতে হবে। চললুম, খাবার জল নিয়ে ঘরে যেতে হবে।”
স্ত্রীলোকটি ব্যস্ত হয়ে চলে গেল। অপুর মা বলল, ”দেখলে কালুদিদি, মানুষটা কত ভাল। কী উপকারটাই না করল উপযাচক হয়ে। গরিব লোকেরাই এটা করে।”
পরিহাসের স্বরে কলাবতী বলল, ”উপকার তো নিশ্চয়ই করল, কামারশাল না বলে কারখানা বলতে হবে, নয়তো অর্ডার নেবে না। আর আর্জেন্ট পেতে হলে আটআনার গাঁজা ঘুষ দিতে হবে, এই পরামর্শ দিয়ে উনি তো উপকারই করলেন।”
অবাক হয়ে অপুর মা বলল, ”এটা উপকার করা নয়?” আমার একটা লোহার গুলতি এখুনি চাই, বাগানে আজ দুপুরে দু—দুটো পেয়ারা গাছ কাটার মতো একটা ডালও পেলুম না, যা দিয়ে গুলতি বানানো যায়। কাঁচা কাঠের গুলতি তো মট করে ভেঙে যাবে, কাঠ শুকিয়ে শক্ত হতে হতে আমার বড়ি তদ্দিনে কাক—শালিকের গব্বায় চলে যাবে।”
.
শ্যামা বনাম অপুর মা
কামারশাল বা কারখানার খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপুর মা এবং কলাবতী কথা বলছিল, তখন ভেতর থেকে তীক্ষ্ন চোখে তাদের লক্ষ করছিল শ্যামাচরণ। কথা শুনতে পাচ্ছিল না তবে দু’জনের কথা বলার ভঙ্গি থেকে সে আন্দাজ পাওয়ার চেষ্টা করছিল। দশাসই অপুর মা’র পরনের ধবধবে থান ও গায়ে জড়ানো মুগার চাদর দেখে তার মনে হল এ নিশ্চয় বড়ঘরের গিন্নি আর সাধারণ সালোয়ার কামিজ, চটি পরা প্রসাধনহীন শ্যামলারঙের কলাবতীকে দেখে সে নিশ্চিত হল, এটা গিন্নির কাজের মেয়ে।
