রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে অপুর মা তার বড়ির দিকে তাকিয়েই থ হয়ে রইল। বড়িগুলো ছত্রখান। দুটো কাক বড়িগুলো মাড়িয়ে কাপড়ের ওপর হেঁটে হেঁটে কপাকপ করে বড়ি গিলছে। এই দৃশ্য দেখে অপুর মা’র মুখ দিয়ে আর স্বর বেরোল না, মুহ্যমানের মতো থপ করে টুলে বসে পড়ে অস্ফুটে শুধু বলল, ”খা খা, সব খেয়ে নে।”
মুরারিই বরং হইহই করে কাক তাড়িয়ে পাটিটা টেনে সরিয়ে এনে বলল, ”কেমন পাহারা দিচিছলে? এবার বড়িগুলো তুমিই খেয়ো। হুঁশ রাখনি কাক শালিকে উড়ে বেড়াচ্ছে।”
গম্ভীর শান্ত গলায় অপুর মা দাঁত চেপে বলল, ”খাব, আমিই খাব। আর মাছের যে দুটো টুকরো পড়ে আছে সে দুটো তুমি খেয়ো।”
”দুটো পড়ে আছে? ছ’টা ছিল তো!”
”ছিল। যদি হুঁশ রাখতে বেড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা হলে মিটসেফটা হাট করে খুলে রেখে যেতে না।”
মুরারি চমকে উঠে রান্নাঘরে দৌড়োল এবং ফিরে এসে মাথার চুল টেনে বলল, ”মানিকতলা বাজারে ওই একটাই এতবড় ভেটক আজ এসেছিল, তিন কিলোর। কাটিয়ে পেটি থেকে আধ কিলো আনলুম ছোটবাবুর কথা ভেবে।” এর পরেই সে হুংকার দিয়ে উঠল, ”কোথায় গেল সেই মা ষষ্ঠীর বাহন, আজ ওর পিণ্ডি চটকে ছাড়ব।”
”আজ কেন, পনেরোদিন ওর ন্যাজের ডগাটিও দেখতে পাবে না।” অপুর মা এরপর মনোযোগ দিল বড়ির দিকে, ”কত সাধ করে বড়ি দিলুম কালুদিদিকে খাওয়াব বলে। ঠিক আছে এখনও তো ডালবাটা অনেকটা ফিজে তোলা আছে, কাল আবার আমি বড়ি দোব, এবার দেখি বাছাধন আমাকে ফাঁকি দিয়ে খেয়ে পালাতে পারে কিনা। থাকত যদি এখন আমার সেই গুলতিটা তা হলে যমের বাড়ি পাঠিয়ে দিতুম।” চল্লিশ বছর আগের গুলতিটার কথা মনে পড়তেই অপুর মা’র মাথায় রক্ত ছুটে গেল। বিড়বিড় করল দাঁতে দাঁত চেপে, ”ডাকাত তাড়িয়েছি আর কাক তাড়াতে পারব না।”
দোতালার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপুর মা’র কথা শুনে রাজশেখর হাসছিলেন। পাশে দাঁড়ানো সত্যশেখরকে বললেন, ”ভীষণ রেগে গেছে। দ্যাখ, ঠিক এবার একটা গুলতি বানিয়ে কাক মারবে, কানাই মোদকের নাতনি তো।”
”জানো দাদু, পিসি ছেলেবেলায় গুলতিতে সুপুরি লাগিয়ে ডাকাতদের মেরে তাড়িয়েছিল। হ্যাঁ, সত্যি বলছি, পিসি আজই আমায় বলল।”
”গুল মেরেছে।” গম্ভীর স্বরে কথাটা বলে সত্যশেখর খাবার টেবলে ফিরে গেল। তার পিছু পিছু কলাবতীও এসে খাবার টেবলে বসল।
”কাকা, তুমিও ও—কথা বললে কেন?”
”বললুম এজন্য যে, গুলতি মেরে ডাকাত তাড়ানো যায় না, ছিঁচকে চোর হয়তো তাড়ানো যায়। ডাকাতদের সঙ্গে কীসব অস্ত্র থাকে জানিস?”
”জানি। লাঠি, বন্দুক, রামদা, বল্লম, তির—ধনুক, তরোয়াল।” কলাবতী নামতা পড়ার মতো বলে গেল।
”ওসব ছিল বাজপাখি, রোঘো, বিশে আর কালোপাঞ্জার আমলের অস্ত্র। এখন ওদের সঙ্গে থাকে বোমা, পিস্তল, পাইপগান, রিভলভার, ভোজালি। তখন ছিল রনপা, এখন মোটরবাইক। অপুর মা একবার এদের সামনে পড়ুক, বোমা মেরে গুলি করে গুলতির দফা রফা করে দেবে…কালু দ্যাখ তো ওটায় ফুলকপির মতো কী যেন একটা রয়েছে।” সত্যশেখর আঙুল দিয়ে টেবলে রাখা চিনেমাটির বৌলটা আঙুল দিয়ে দেখাল।
কলাবতী মাথা কাত করে তাকিয়ে দেখে বলল, ”কড়াইশুঁটি, টম্যাটো, ফুলকপি আর ভেটকি মাছ দিয়ে কি যেন একটা রান্না। ঘি—গরম মশলার দারুণ একটা গন্ধ পাচ্ছি।”
শুনেই সত্যশেখরের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
”বাবা টেবল থেকে উঠলে আর বসেন না, সেকেলে বুর্জোয়া জমিদারি কেতা। তুই তো ভেটকি মাছ একদম পছন্দ করিস না, নিশ্চয় এটা খাবি না। তা হলে বৌলটা আমার দিকে ঠেলে দে।”
তাজ্জব বিভ্রান্ত কলাবতী প্রতিবাদ করে উঠল, ”কাকা আমি ভেটকি মাছ ভীষণ ভালবাসি।”
সত্যশেখর হতাশ স্বরে বলল, ”অ্যা ভালবাসিস। আমি তো জানতাম তুই শুধু গলদা চিংড়ি ভালবাসিস।”
”শুধু গলদা কেন, ভেটকি, ইলিশ, ট্যাংরা, গুলে, আড়, পারশে সব ভালবাসি। তুমি একাই পুরোটা খাবে তা কিন্তু হবে না। মনে রেখো এটা তিনজনের জন্য পিসি রেঁধেছে।”
”ঠিক আছে, তা হলে দু’জনেই শেয়ার করে খাব। রাতে তো মাছ পাব না, বেড়ালে খেয়ে গেছে। কালু, এই বেড়াল আর কাকদের শায়েস্তা করা দরকার। পাকা ভেটকি মাছের পেটি একটা রেয়ার জিনিস, কত কষ্ট করে মুরারি কিনে আনল, আর সেটার অর্ধেকটা কিনা একটা জানোয়ারের পেটে চলে গেল। এসব এদেশেই সম্ভব।”
”কাকা, তুমি কথায় কথায় এদেশ নিয়ে খোঁটা দিয়ে বিলেত টেনে আন। কই বড়দি তো একবারের জন্য বিলেতের নামও উচ্চচারণ করে না। অথচ তোমরা দু’জনে একই সঙ্গে ইংল্যান্ডে থেকেছ, তুমি ব্যারিস্টার হয়েছ, বড়দি এডুকেশনে ডক্টরেট করেছে।”
কলাবতীর মৃদু ভর্ৎসনা শুনে সত্যশেখর মুখ নামিয়ে বলল, ”হয়েছে, হয়েছে, বড়দির গুণ আর গাইতে হবে না, বৌলটা এদিকে ঠেলে দে।”
বৌলটা কাকার দিকে সরিয়ে দিয়ে কলাবতী বলল, ”পিসি কাল হুলুস্থুলু কাণ্ড বাধাবে।”
সত্যশেখর জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বলল, ”কীরকম?”
”আবার বড়ি দিতে বসবে, আবার কাক আসবে, পিসি আবার দাদুর ছড়িটা নিয়ে ডাকাতে—গলায় হুংকার দিয়ে কাক তাড়াবে।”
”কালু, তোর শেয়ারটা তুলে নে, নইলে ভুল করে পুরোটাই খেয়ে ফেলব। দারুণ রেঁধেছে। হ্যাঁ রে, হঠাৎ বড়ি দেওয়ার শখ হল কেন অপুর মা’র?”
বৌল থেকে চামচ দিয়ে মাছ কপি আলু ইত্যাদি নিজের প্লেটে তুলে নিতে নিতে কলাবতী বলল, ”পিসিকে বলার মধ্যে শুধু বলেছিলুম, টিফিনে ধুপু খিচুড়ি খাচ্ছিল বড়ি ভাজা দিয়ে। ওর মা বাড়িতে বড়ি দিয়েছিলেন। আমি খানিকটা খিচুড়ি আর গোটাচারেক ভাজাবড়ি খেলুম মানে ধুপুর অফারটা আর ফেরালুম না।”
