”এই হতচ্ছাড়ারা আমার বড়ি নষ্ট করতে এসেছে। যাও তো কালুদি দৌড়ে দাদুর লাঠিটা নিয়ে এসো।”
কলাবতী দোতলা থেকে রাজশেখরের তিনটে ছড়ির মধ্য থেকে একটা নিয়ে এল, অপুর মা ছড়িটা শূন্যে সপাৎ সপাৎ আছড়ে ছাদের মেঝেয় ঠকঠক শব্দ করতেই কাকটা শুধু পাঁচিলের একধারে হাতদুয়েক সরে মাথা ঘুরিয়ে অপুর মার দিকে তাকিয়ে রইল।
”গুলতি থাকলে বাছাধনের এই অগ্রাহ্যি করা ঘুচিয়ে দিতুম।” গজগজ করল অপুর মা।
”একটা গুলতি তৈরি করো না পিসি।” আবদারের সুরে বলল কলাবতী।
”বললেই কি তৈরি করা যায়।” অপুর মা দুটো আঙুল ইংরাজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো দেখিয়ে বলল, ”এইরকম দেখতে পেয়ারা গাছের শুকনো ডাল চাই আর চাই নরম রবাট। তুমি জোগাড় করে দাও, আমি তৈরি করে দোব।”
কাকটা আবার সরে এল পাঁচিলে আগের জায়গায়। উড়ে এল আরও দুটো কাক। অপুর মা ছড়ি ঘুরিয়ে মৃদু ‘হুসস’ করল। তিনটি কাকই একটু নড়াচড়া করে বড়ির দিকে তাকিয়ে বারদুয়েক ‘কা কা কা’ ডেকে অপুর মার আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানাল। সিঁড়িঘরের মাথা থেকে শালিকের কর্কশ ডাক উঠল। অপুর মা বিরক্ত হয়ে ওপরদিকে মুখ তুলে ”জ্বালিয়ে মারলে” মন্তব্য করে বড়িসমেত শীতলপাটিটা সিঁড়িঘরের মধ্যে টেনে আনল।
”কাজকম্মো ফেলে এখন বড়ি পাহারা দেওয়া পোষাবে না। কালুদি পাটিটার একটা দিক ধরো, একতলার রকে নিয়ে যাই, ওখানে রোদ আছে।”
দু’জনে পাটিটা নামিয়ে এনে উঠোনের ধারের রকের ওপর পাতল। ঘণ্টাখানেক অন্তত রোদ পাবে এখানে। মিনিট তিনেক পর কলাবতী চেঁচিয়ে উঠল, ”পিসি, ওই দ্যাখো আবার এসেছে।”
কলাবতী আঙুল দিয়ে দোতলার কার্নিসে বসা কাকটাকে দেখাল। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে থমথমে হয়ে গেল অপুর মা’র মুখ। কাকটা উড়ে এসে বসল ঠিক বড়ির ওপরের কার্নিসে। দু—তিনবার ভেংচি কাটার মতো ডাকল। এবার অপুর মা রান্নাঘর থেকে টুল এনে বসল পাটির ধারে হাতে ছড়িটা নিয়ে। মুরারিকে ডেকে বলে দিল, ”আজ আর আমি ভাত বেড়ে দিতে পারব না কাউকে, মুরারিদা, তুমি ম্যানেজ করে দোতলায় খেতে দাও, আমি হতচছাড়া কাকটার আস্পদ্দার শেষ দেখে ছাড়ব। বড়ি দিতে অনেক কষ্ট করতে হয়।”
যতক্ষণ না রোদ সরে যায় ততক্ষণ অপুর মা ছড়ি হাতে বসে থাকবে। কাকটা এবং তার সঙ্গে আরও দু—তিনটি অতঃপর অপুর মা’র সঙ্গে ধৈর্যের পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা না করে মিনিট পাঁচেক পরেই উড়ে গেল। কাকের স্বভাব সম্পর্কে অপুর মা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। সে জানে এমন মশলা দেওয়া সুগন্ধি ডালবাটা কাকরা ভীষণ পছন্দ করে। ওরা তার ওপর ঠিক নজর রাখবে। যেই টুল থেকে উঠে যাবে অমনই উড়োজাহাজের মতো নেমে এসে—ভাবতেই সে শিউরে ওঠে। সব বড়ি এঁটো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট করবে।
মুরারি ভাত আর অন্যান্য ব্যঞ্জন নিয়ে রান্নাঘর থেকে দু’বার দোতলায় উঠল। অপুর মা আড়চোখে দেখল সব রান্না মুরারি ঠিকঠাক নিয়ে গেল কি না। তারপরই চোখ পড়ল রান্নাঘরের দরজার দিকে। ধূসর রঙের একটা হুলো বেড়াল ধীরেসুস্থে রান্নাঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার সামনে উবু হয়ে বসে তৃপ্তিভরে ঠোঁট চাটল। হুলোটা রোজ একবার বাইরে থেকে এসে সিংহিবাড়িতে টহল দিয়ে যায়।
”সর্বনাশ করেছে।” অপুর মা আঁতকে উঠল ”রাতে কালিয়া করব বলে ভেটকি মাছ ভেজে রেখেছিলুম—” কথা শেষ না করেই ছড়ি হাতে অপুর মা তেড়ে গেল হুলো বেড়ালটার দিকে। হুলো হকচকিয়ে প্রথমে রান্নাঘরে ঢুকে গেল, পিছু পিছু অপুর মা’ও। সেখানে অপুর মা’র হাতের ছড়ির এক ঘা খেয়ে রান্নাঘরের লাগোয়া কয়লার ঘরে ঢুকে গেল।
কলকাতায় সিলিন্ডারে ভরা রান্নার গ্যাস বাড়ি বাড়ি চালু হওয়ার আগে রান্না হত কয়লার উনুনে। সেইসময় সিংহিবাড়িতে কয়লা আসত ঠেলাগাড়িতে একসঙ্গে পাঁচ বস্তা। সদর দরজা দিয়ে নোংরা কয়লার বস্তার ঢোকা বারণ ছিল। তাই রান্নাঘরের সঙ্গে জুড়ে উত্তরে বাগানের দিকে একটা ছোট ঘর বানানো হয় কয়লা রাখার জন্য। তাতে থাকত ঘুঁটে এবং লকড়িও। কয়লার ঘরটায় একটা ছোট দরজা করা হয় যেটা দিয়ে বাইরে থেকে বস্তা নিয়ে ঢুকে কুলিরা কয়লা ঢেলে দিয়ে যেত। কয়লার ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই ঘরে অন্তত তিরিশ বছর কারওর ঢোকার দরকার হয়নি। বাইরে যাওয়ার দরজাটা খিলও তাই দেওয়া থাকে।
বেড়ালকে তাড়া করে অপুর মা কয়লার ঘরে ঢুকে দেখল বাগানে বেরোবার পুরনো দরজাটার তলার কাঠ পচে ছোট্ট একটা গর্ত হয়ে রয়েছে। হুলোটা সেই গর্ত দিয়ে প্রাণভয়ে কোনওক্রমে গলে বাইরে চলে গেল। রান্নাঘরে এসে অপুর মা দেখল মুরারি মিটসেফ খুলে রেখে গেছে এবং ভাজা ভেটকি মাছের বড় চারটে টুকরো কম, পড়ে আছে মাত্র দুটো টুকরো। কপালে হাতের চাপড় দিয়ে অপুর মা চিৎকার করে উঠল, ”মুরারিদা, শিগগির এসে দেখে যাও কী কাণ্ড তুমি করেছ!”
দোতলার খাবার টেবল থেকে রাজশেখর, সত্যশেখর ও কলাবতী ছুটে বারান্দায় এসে রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়ল।
”কী হল অপুর মা, অমন করে চেঁচালে কেন?” রাজশেখর উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন।
‘উফফ, কী গলা রে বাবা, ডাকাতদেরও পিলে চমকে যাবে।” সত্যশেখর এঁটো হাত চাটতে চাটতে বলল।
”কী হয়েছে, কী হয়েছে” বলতে বলতে মুরারি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে রকের দিকে তাকিয়েই থমকে গেল, ”কাণ্ড যে এদিকে হয়ে গেল অপুর মা, শিগগির এসে দেখে যাও।”
