”পিসি, তুমি গুলতি ছুড়তে পার?”
অপুর মা ভ্রূ তুলে কলাবতীর মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ”পারি মানে? জেঠিমার গুলতি দিয়ে মাঠের ইঁদুর মেরেছি, সাপ মেরেছি, কোলা ব্যাং মেরেছি, ডাকাতও তাড়িয়েছি।”
”ডাকাত! কী করে?” বিস্ময়ে কলাবতীর চোখ কপালে উঠল।
”কী করে আবার, অন্ধকার রাতে চুপিচুপি গুলতি মেরে।”
”কোথায় ডাকাত পড়েছিল? তোমাদের বাড়িতে?”
”পাশের ভুলুকাকাদের বাড়িতে। বেশ পয়সাওলা। কলকাতায় মিষ্টির দোকান, এখন আরও একটা করেছে চন্দননগরে, ডাকাত পড়ল রাত এগারোটা নাগাদ। এখনকার মতো ইলেকট্রিক আলো তো ছিল না। ঘুটঘুটে অন্ধকার, ডাকাতদের সঙ্গে কেরোসিনের মশাল আর চার ব্যাটারির টর্চ। পাড়ার সবাই দরজা জানলা এঁটে ঠকঠক করে ঘরের মধ্যে কাঁপছে। জেঠিমা বলল, কোরু, গুলতিটা আর গুলি নে কোঁচড় ভরে। চল আমার সঙ্গে, দেখি মুখপোড়াদের মুরোদ কত। গুলতি তো নিলুম। গুলি দেখি দুটোমাত্তর রয়েছে। জেঠিমা বলল, ঠিক আছে। আমার তক্তপোশের নীচে কৌটোয় খোলা ছাড়ানো আস্ত সুপুরি আছে, তাই নিয়ে আয়। এক—একটা সুপুরি গুলির সাইজের, কৌটোটাই হাতে তুলে নিলুম। জেঠিমা আর আমি বেরিয়ে অন্ধকারে আদাড়ের কচুবনের বড় বড় পাতার আড়াল দিয়ে,” অপুর মা গলা নামিয়ে ফিসফিস করে এমনভাবে বলল, এই ভরদুপুরে কলাবতীর গা ছমছম করে উঠল। ঢোক গিলে সে বলল, ”তারপর পিসি?”
”তারপর আমরা কাদা মাড়িয়ে ফণিমনসা গাছ ঠেলে পৌঁছোলুম ভুলুকাকাদের কলাবাগানে। তখন দরজা ভাঙার আওয়াজ, ঘরের মধ্যে চিৎকার কান্না ‘ওরে বাবা রে, মেরে ফেললে রে, কে আছ বাঁচাও গো’ চলছে আর ডাকাতদের দাবড়ানি শুনতে পাচ্ছি ‘দরজা খোল, দা দিয়ে কেটে কুচি কুচি করে রেখে যাব।’ দেখলুম হাত তিরিশেক দূরে উঠোনে মশাল হাতে খালি গায়ে পেল্লায় চেহারার একটা ডাকাত দাঁড়িয়ে রয়েছে।”
কলাবতী তাড়াতাড়ি বলল, ”মাথায় লাল ফেট্টি বাঁধা?”
অপুর মা থমকে গেল, ”তুমি জানলে কী করে?”
”পড়েছি। বিশে ডাকাত কপালে লাল ফেট্টি বাঁধত।”
”বিশে ডাকাত কে?” অপুর মা বিভ্রান্ত মুখে জানতে চাইল।
”সে একজন ছিল দেড়শো—দুশো বছর আগে। রনপায়ে চড়ে এক ঘণ্টায় দশ ক্রোশ চলে গিয়ে ডাকাতি করে রাত থাকতে—থাকতেই ফিরে আসত। যাকগে সে—কথা, তোমরা তারপর কী করলে?”
”তারপর আবার কী করব। জেঠিমা আমাকে বলল, ‘কলাগাছের গা ঘেঁষে থির হয়ে কলাগাছের মতো দাঁড়া, একদম নড়বি না, গুলতিটা হাতে নে, সুপুরি লাগা, তারপর টিপ করে ডাকাতটার কপালে মার।’ দুটো কলাগাছের মধ্যিখানে দাঁড়ালুম গুলতিতে সুপুরি লাগিয়ে, রবাটটা এই নাক পর্যন্ত টেনে এক চোখ বন্ধ করে টিপ করে রবারটা ছাড়তে যাব আর তখুনি ডাকাতটা মাথা নিচু করে পা চুলকোতে লাগল। চুলকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে আমি আর দেরি করলুম না। দিলুম রবাটের ছিলেটা ছেড়ে, কী বলব কালুদি, একেবারে বন্দুকের গুলির মতো সুপুরিটা ওর রগে গিয়ে খটাস করে লাগল। ‘বাবা গো’ বলে ডাকাতটা কপালে হাত চেপে উবু হয়ে বসে পড়ল। দেখি কপাল ফেটে রক্ত বেরোল। ‘কী হল কী হল’ বলে ছুটে এল দুটো ডাকাত।
”জেঠিমা আমার হাতে আর একটা সুপুরি দিয়ে বলল, ‘আবার মার।’ যেটা রোগা ঢ্যাঙা সেটার মাথা তাক করে ছুড়লুম। এটাও ‘উরিব্বাস’ বলে মাথায় হাত দিয়ে এধার—ওধার তাকাতে লাগল। জেঠিমা আর একটা সুপুরি হাতে দিল। এবার মশাল হাতে করা লম্বা নেকো ডাকাতটার নাক লক্ষ্য করে ছুড়লুম, লাগল গিয়ে নাকের এক আঙুল পাশে, ব্যস, ধপাস, মশাল পড়ে গেল হাত থেকে। একজনের টর্চের আলো এধার—ওধার করে খুঁজতে শুরু করল। আমরা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লুম। মাথার ওপর দিয়ে আলো ঘুরে যাওয়ার পর উঠে দাঁড়িয়ে ডাকাতটার কান লক্ষ্য করে আর একটা ছুড়লুম, কান চেপে ধরে সে লাফিয়ে উঠে টর্চ ফেলে দৌড় লাগাল। ডাকাতরা ততক্ষণে বুঝে গেছে—আড়াল থেকে কেউ তাদের মারছে। ওরা তখন ভাবল, গ্রামের লোক বোধ হয় ওদের ঘিরে ফেলেছে। বাড়ির মধ্যে যারা দরজা ভাঙছিল, শিস দিয়ে তাদের ডেকে নিয়ে চম্পট দিল।”
”তোমরা তারপর কী করলে?”
”যেভাবে এসেছিলুম ঠিক সেইভাবে চুপিসাড়ে বাড়িতে চলে এলুম। জেঠিমা কানে কানে বলল, ‘খবরদার, কোরু কাউকে গপ্পো করবি না। পাঁচকান হতে হতে ঠিক ডাকাতদের কানে পৌঁছে যাবে। ওদের বাড়াভাতে ছাই দিয়েছি আমরা, এর শোধ ওরা নেবেই। জানতে পারলে কেটে কুচি কুচি করে করে রেখে দেবে।’ শুনেই তো ভয়ে হাত—পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল, কাঠের গুলতিটা পুড়িয়ে ফেললুম। চল্লিশ বছর পর আজ এই প্রথম তোমার কাছে মুখ খুললুম। তুমি কিন্তু কাউকে কিছু বোলো না।”
অপুর মা’র মুখ দেখে কলাবতী আর হাসি চাপতে পারল না। খুক খুক করে হেসে উঠল। ”চল্লিশ বছর পরও তোমার ভয় গেল না পিসি। ওসব ডাকাতরা তো এতদিনে মরে ভূত হয়ে গেছে।”
”ভয় তো ওই ভূতকে নিয়েই। ওদের মধ্যে দু’জন, রাম বাগদি আর ভজা দুলে আর এক জায়গায় ডাকাতি করতে গিয়ে গ্রামের লোকের হাতে ধরা পড়ে। তখন তো ডাকাত ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলার চল ছিল না। পুলিশের হাতে তুলে দিত। ওদেরও পুলিশে দেয়। কোটে বিচার হয়, দশ বছর জেল খাটে। রাম মরে গেছে, গজা বেঁচে আছে। ওটাকেই ভয়। …তার থেকেও এখন ভয় ওই ওটাকে।” এই বলে অপুর মা ছাদের পাঁচিলের দিকে আঙল তুলল। একটা কাক বসে রয়েছে।
