খাওয়া শেষ করে রাজশেখর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ইজিচেয়ারে। রুপোর রেকাবিতে (এটাও রাজশেখর প্রায় চল্লিশ বছর পর দেখলেন) ছোট্ট ছোট্ট খিলির চারটি পান নিয়ে অপুর মা এল। খিলিগুলো আঁটা লবঙ্গ দিয়ে।
”বাড়ি কোথায় তোমার?” রাজশেখর হালকা চালে প্রশ্ন করলেন।
”ময়রাপাড়ায়।”
ভ্রূ কুঁচকে উঠল রাজশেখরের। ময়রাপাড়া এবং সেখানকার লোকেদের তিনি চেনেন। ”তোমার নাম কী? বাবার কী নাম?”
”বাবার নাম সাতকড়ি মোদক। আমার নাম করুণাময়ী।”
রাজশেখর বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সোজা হয়ে গেলেন, ”তুমি সাতুর মেয়ে! …কানাই মোদকের নাতনি! …তাই বলো। সিংহিবাড়ির আদবকায়দা কোথা থেকে জানলে, এবার আমি বুঝতে পারছি।”
”ঠাকুরদাকে আমার মনে নেই। এ বাড়িতে ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে অনেকবার এসেছি!”
”তোমার ঠাকুরদাকে আমার মনে আছে। তোমাকে দেখে এখন আরও মনে পড়ছে।” রাজশেখর কৌতুকের ছলে বললেন। শুনে করুণাময়ী তার কৃষ্ণবর্ণ বিশাল চেহারাটাকে কুঁকড়ে যতটা সম্ভব ছোট করে নেওয়ার চেষ্টা করল, এরপর রাজশেখর খুঁটিয়ে জেনে নিলেন করুণাময়ীর বর্তমান অবস্থা, শেষে বললেন, ”কলকাতায় যাবে আমার সঙ্গে?” করুণাময়ী একটুও না ভেবে বলল, ”যাব।”
চারদিন পর রাজশেখর মোটরে কলকাতা রওনা হলেন। পেছনের সিটে একটা পুঁটলি কোলে নিয়ে বসে অপুর মা। গাড়ি তারকেশ্বরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে তারকনাথের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে আঁচল দিয়ে চোখের জল মোছে। রাজশেখর তখন সামনের সিট থেকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, ”তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। অপুর সব ভার আজ থেকে আমার। শচীনকে বলে এসেছি, ওর খাওয়াপরা, বইপত্তর, জামাজুতোর জন্য যা টাকা লাগবে সব দিয়ে আসবে।”
.
কলাবতী যেদিন বলল, ”বলব কী পিসি সে কী বড়িভাজা!” পরের শনিবারই অপুর মা নিজে থলি হাতে পাড়ার মুদির দোকানে গিয়ে দু—তিনরকমের ডাল, কালোজিরে, পোস্ত আর হিং কিনে আনল। ডাল ভিজিয়ে রাখল গামলায়। পরদিন সকালে রান্নাঘরের কাজের বউ শকুন্তলাকে বলল, ”আজ আর তোকে অন্য কাজ করতে হবে না, ডালগুলো বাট।” শীর্ণ দুর্বল চেহারার শকুন্তলা ডাল বাটছে রান্নাঘরের এক কোণে, আর অপুর মা গ্যাসের উনুনে বসানো কড়াইয়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তে মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছে। একসময় সে বলল, ”ও কী বাটনা হচ্ছে, নোড়াটা ভাল করে চেপে ধরে বাট। গতরে কি জোর নেই? ক্ষীরের মতো মিহি না হলে কি বড়ি হয়?”
তারপর গজগজ করতে করতে বলল, ”ধুপুর মা’র ভাজাবড়ি খেয়ে কালুদিদি মুচ্ছো গেছে! অমন বড়ি নাকি পিথিবিতে আর কেউ তৈরি করতে পারে না। …অ্যাই, তখন থেকে তুই চন্দন কাঠ বুলোবার মতো শিলে নোড়া ঘষছিস। ওঠ, ওঠ।” শকুন্তলাকে তুলে দিয়ে অপুর মা বসল ডাল বাটতে। পনেরো মিনিটের মধ্যে তিন কেজি মটর, বিউলি আর মুসুর ডাল কাদার মতো করে দিয়ে শকুন্তলাকে বলল, ”হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? গামলাটা নিয়ে আয়, ফ্যাটাতে হবে।”
তিনতলার ছাদে শুরু হল বড়ি দেওয়ার অনুষ্ঠান। বড় একটা শীতলপাটির ওপর রাজশেখরের পুরনো একটা লন্ড্রিতে কাচানো ধুতি বিছিয়ে রাখা। সারি দেওয়া থালায় স্তূপ করে রাখা নানান রকমের বাটা ডাল। তার কোনওটা ভাজা বড়ির জন্য, কোনওটা মশলা বড়ির, কোনওটা পলতা বড়ির, কোনওটা লাউ দিয়ে বাটা, কোনওটা শুধুই পোস্তর। এক—একটা স্তূপের এক—এক রং। অপুর মা স্নান করে পাটভাঙা থান পরে একটা রেকাবিতে ধান, দূর্বা আর সিঁদুর নিয়ে বসল। পাশে উবু হয়ে বসে কলাবতী, তার পাশে দাঁড়িয়ে শাঁখ হাতে শকুন্তলা, একটু দূরে সিঁড়িঘরের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রাজশেখর তাঁর পাশে মুরারি।
অপুর মা হিং দেওয়া মশলা বড়ির জন্য বাটা ডালের স্তূপ থেকে খানিকটা তুলে বিছানো কাপড়ের মাঝামাঝি জায়গায় বসিয়ে আঙুল দিয়ে টিপে টিপে মন্দিরের চূড়ার মতো করল, সাইজটা হল একটা বড় জামরুলের মতো।
”এটা হল বুড়ো।” অপুর মা ফিসফিস করে কলাবতীকে জানিয়ে দিল, ”এবার ওর পাশে বসবে বুড়ি।”
অপুর মা বুড়োর পাশে আর একদলা ডালবাটা বসাল। তারপর বুড়োবুড়ির মাথায় ধান—দূর্বা চড়াবার সময় শকুন্তলার দিকে তাকাল। শকুন্তলা তাড়াতাড়ি শাঁখে ফুঁ দিল। বুড়োবুড়ির ওপরে সিঁদুরের টিপ পরিয়ে অপুর মার জোড়হাতে প্রণাম জানাল।
”কালুদি প্রণাম করো।” একটু জোরে ফিসফিস করল অপুর মা এবং সবাই শুনতে পেল।
কলাবতী তাড়াতাড়ি দু’হাত কপালে তুলল, শকুন্তলাও। তাই দেখে রাজশেখর এবং তাঁকে দেখে মুরারি হাত জোড় করে কপালে ঠেকাল।
”পিসি, বুড়োবুড়িদুটো খাওয়া যাবে?”
”যাবে।”
”কে খাবে?”
”বাড়ির কত্তা আর গিন্নি। তোমার দাদু আর তুমি খাবে।”
”এত ডালবাটা! সব বড়ি আজকেই দেবে?” কলাবতী অবাক হয়ে বলল।
অপুর মা বড়ি দেওয়া শুরু করেছে। মাথা নেড়ে বলল, ”একদিনে এত দেওয়া যায় নাকি। আজ যতটা পারি দেব, বাকিটা কাল।” তারপর শকুন্তলাকে বলল, ”এই ডালবাটা থালাগুলো সব রান্নাঘরে বড় ফিজে ঢুকিয়ে দে।”
অপুর মা আর কলাবতী বাদে ছাদ থেকে সবাই নেমে যাওয়ার পর দু’জনে সিঁড়িঘরের দেওয়ালের ছায়ায় বসে রইল বড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য। তখন কথায় কথায় অপুর মা বলল, ”এই এক ঝকমারির কাজ, বসে থাকো বড়ি আগলে। কাজকম্মো শিকেয় তুলে বসে থাকার লোক তখন পাওয়া যেত, সব সংসারে একটা করে বুড়ি থাকত। এখন না আছে ডালবাটার লোক, না আছে বড়ি দেওয়ার ছাদ, বড়ি পাহারা দেওয়ার বুড়িরাই বা কোথায়! আমার ছিল জেঠিমা, বাড়ির উঠোনে বড়ি দিয়ে ঘরের দাওয়ায় সারা দুপুর বসে থাকত একটা গুলতি আর ছোট ছোট পোড়া মাটির গুলি নিয়ে, কাকপক্ষী বড়ির কাছে এলেই গুলতি দিয়ে পটাং করে গুলি ছুড়ত, আর ধারেকাছে কেউ আসত না।”
