শুনতে শুনতে কালো হয়ে এল অপুর মা’র মুখ। গম্ভীর থমথমে মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল, ”পেঁপেটা, নিশ্চয় মুখে রুচবে, ওটা আমার রান্না করা নয়।”
কলাবতী বুঝে গেল পিসি দারুণ চটেছে, কারও রান্নার প্রশংসা সহ্য করতে পারে না। ও চায় সবাই ওর রান্নারই গুণগান করুক। আর সত্যি—সত্যিই অপুর মা’র রান্নার হাতটা ভাল, বিশেষ করে নিরামিষ রান্নার। সেজন্য রাজশেখরের চাপা একটা গর্বও আছে। হাজার হোক অপুর মা তারই গ্রামের মেয়ে।
আটঘরায় সিংহদের জমিদারি সেরেস্তায় অপুর মা’র ঠাকুর্দা কানাই মোদক ছিল লেঠেলদের সর্দার। বকদিঘির মুখুজ্জেদের সঙ্গে জমি দখল নিয়ে একবার লাঠালাঠি করতে গিয়ে হাঁটু ভেঙে খোঁড়া হয়ে যায়। তখন তাকে করা হয় রাজশেখরের বাবার খাস ভৃত্য।
অপুর মা’র বাবা সাতকড়ি তখন এগারো বছরের। সমবয়সি সাতকড়ির কাছেই রাজশেখর গুপিসায়রে সাঁতার শেখেন। তার সাইকেল চালানোর শিক্ষাতেও সাতকড়ির হাত ছিল। একদিন কামরাঙা পাড়তে গাছে ওঠেন। ডালে জড়িয়ে ছিল একটা গোখরো সাপ। ফণা তুলে স্থির হয়ে তিন হাত দূর থেকে রাজশেখরকে লক্ষ্য করতে থাকে। সেই সময় ধাক্কা দিয়ে সাতকড়ি ফেলে না দিলে কী যে হত, তাই ভেবে এখনও শিউরে ওঠেন। গাছে চড়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল, তাই ব্যাপারটা দু’জনেই চেপে যায়। সাতকড়ি যুবক হয়ে উঠতেই কানাই তাকে তারকেশ্বরে ডাল—মাছ—ভাতের একটা ছোট্ট পাইস হোটেল করে দেয়। অপূর্ব রান্নার হাত ছিল সাতকড়ির। একবার যে ধোঁকার ডালনা কি চালতা দিয়ে টকের ডাল খেয়েছে তাকে আবার করুণাময়ী হোটেলে খেতে আসতে হবেই। এই করুণাময়ীই অপুর মা।
সাতকড়ি নিজের হাতে মেয়েকে রান্না শেখায়, বিয়ে দেয় তিন ক্রোশ দূরের এক পাঠশালার শিক্ষকের সঙ্গে, কিছু জমিজমা যৌতুক দিয়ে। তারকেশ্বরের হোটেলটি মৃত্যুর আগে সাতকড়ি দিয়ে যায় তিন ছেলেকে। দু’ বছরের মধ্যেই রান্নার সুনাম হারিয়ে হোটেলের লোকসান শুরু হয়, তৃতীয় বছরেই ছেলেরা হোটেল বিক্রি করে নিজেদের মধ্যে টাকা ভাগ করে নিয়ে তারকেশ্বর বাজারে মাছ আর আলু বেচতে বসে যায়, তৃতীয়জন চায়ের দোকান দেয় বাজারেই।
ইতিমধ্যে করুণাময়ী বিধবা হয়ে আটঘরায় ফিরে এসেছে। তিন ভাইয়ের ভিন্ন সংসার। বোনকে তারা একটা ঘর ছেড়ে দিল থাকার জন্য, কিন্তু খাওয়া—পরার দায়িত্ব নিল না। যেটুকু নিজস্ব জমিজমা করুণাময়ীর ছিল তাই দিয়ে সারা বছরের খরচ চালিয়ে অপুকে স্কুলে পড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না, তখন সে খুঁজতে শুরু করে ভদ্রগোছের কোনও কাজ।
রাজশেখর বছরে একবার আটঘরায় আসেন জমি পুকুর বাগানের বিলি বন্দোবস্তের জন্য। আগের মতো বিশাল জমিদারি আর নেই তাই নেই নায়েব, পাইক, গোমস্তাদের বাহিনী। এখন শচীন হালদার নামে একজন কর্মচারী সম্পত্তির তদারক আর দু’জন ভৃত্য আর মালি বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করে। বছরে একবার দু’বার আনাজ সবজি মাছ ফল ইত্যাদি তারা কলকাতায় পৌঁছে দিয়ে আসে।
চারদিনের জন্য রাজশেখর আটঘরায় আসবেন খবর পাঠিয়েছেন। সিংহিবাড়িতে ধুম পড়ে গেল ঝাড়পোঁছের, বাগানের ঝোপজঙ্গল সাফ হল। কিন্তু রাজশেখরকে রান্না করে খাওয়াবে কে? গত বছর অস্থায়ী রাঁধুনির কাজ করেছিল মিষ্টির দোকানের যতীন। এখন সে মিষ্টি বানানোর চাকরি নিয়ে শ্রীরামপুর চলে গেছে। শচীন হালদার দু’দিন হন্যে হয়ে খুঁজে না পেয়ে খোঁজার দায়িত্বটা দিলেন স্ত্রীকে। তিনি আধঘণ্টার মধ্যে হাজির করলেন করুণাময়ীকে।
আটঘরা পৌঁছোনোর পর দুপুরে দোতলার দালানে ভাত খেতে বসে রাজশেখর চোখ কপালে তুললেন। মুহূর্তে মনে পড়ে যায় তাঁর ছোটবেলার কথা। এই বগি থালায় ঠিক এই জায়গায় মায়ের হাতে তৈরি পশমের রঙিন ফুল—তোলা আসনে বসে তার বাবা ভাত খেতেন। থালার মাঝখানে স্তূপ করে থাকত জুঁইফুলের মতো ভাত, ভাতের পাশে দু—তিনরকমের ভাজা, থালা ঘিরে চার—পাঁচটা বাটি।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন শচীন। রাজশেখর জিজ্ঞেস করলেন, ”এই আসনটা পেলে কোথায় আর থালাবাটিগুলো?”
শচীনও জানতেন না আসন আর থালাবাটিগুলো এল কোথা থেকে। মাথা চুলকে আন্দাজেই বললেন, ”ভাঁড়ারের কাঠের সিন্দুকে তোলা ছিল, বার করে মাজালুম।” কথাটা বলে আড়চোখে তিনি পাশে তাকালেন। দরজার আড়ালে সাদা থান কাপড় পরা বিশাল এক ঘোমটায় মুখ ঢাকা দশাসই এক নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে। ফিসফিস করে সেই মূর্তি তখন বলল, ”ভাঁড়ার ঘরে নয়, রান্নাঘরের ওপরের তাকে ছিল থালাটা আর আসনটা ছিল শোবার খাটে গদির নীচে।”
ফিসফিসিয়ে বললেও অপুর মার কণ্ঠস্বর দশ—বারো হাত বৃত্তের মধ্যে পরিষ্কার শোনা যায়। সুতরাং রাজশেখর শুনতে পেলেন।
মধ্যহ্নভোজনের মাঝপথে রাজশেখর শচীনকে বললেন, ”থোড় ছেঁচকিটা আর একটু দিতে বলো তো।”
আড়াল থেকে বাটি হাতে বেরিয়ে এল অপুর মা। সিংহিবাড়িতে খাওয়ার সময় দ্বিতীয় পরিবেশন হাতায় করে পাতে দেওয়া হয় না। বাটিটা মেঝেয় রেখে মুখের সামনে কাপড় টেনে অপুর মা বলল, ”আর একটু কচুবাটা আর পোস্তর বড়া কি আনব?”
রাজশেখরের মুখে হাসি খেলে গেল। বুঝলেন খাওয়ার সময় তাঁর মুখের ভাব এই রাঁধুনিটি বেশ ভালভাবেই লক্ষ করেছে। বললেন, ”নিয়ে এসো।”
