”আমারও। টেবলে পড়ে আছে লুচি আর কলা। শেষে কি রোল আর চাউমিন খেতে হবে।”
”কাকা, দাদু তো বলেই দিলেন আজ থেকে এটা মিলনের ম্যাচ হল। তা হলে আমরাই প্রথম শুরু করি। বকদিঘির কি লাঞ্চ হয়েছে দেখে আসব?”
”শিগগির যা। যদি কিছু বেঁচে থাকে তা হলে মিলন ভোজ দিয়ে ওপেন করা যাবে।”
কলাবতী ছুটে বেরিয়ে গেল। দু’মিনিট পর ছুটে ফিরে এল প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে। ”কাকা, বড়দি বললেন, এখনও আছে, পাউরুটি, ডিমের কালিয়া, কমলালেবু। তবে ডিম একটাও নেই, ঝোল আর আলু পড়ে আছে। দই শেষ।”
”হবে, ওতেই হবে।”
দু’জনে বকদিঘির প্যাভিলিয়নে এল। একটা বড় ডেকচি টেবলে বসানো, সঙ্গে চারটে পাউরুটির প্যাকেট। দুটো শূন্য দইয়ের হাঁড়ি সাজিয়ে মলয়া অপেক্ষা করছে, সামনে গোটা আষ্টেক কমলালেবু।
”কালু, পাউরুটি দিয়ে কালিয়ার ঝোল অনেকেরই খেতে দারুণ লাগে। আর দইয়ের চাঁছি অনবদ্য জিনিস। বসে পড়।”
কাকা—ভাইঝি মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চেয়ারে বসল। সত্যশেখর ফিসফিস করে বলল, ”ওই অনেকেরটা হলুম আমি। ঠিক আছে ডেকচিটা এদিকে ঠেলে দে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।”
.
চারজনে গাড়িতে কলকাতা ফিরছে। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা চালাক সত্যশেখরের পাশে রাজশেখর, পেছনের সিটে কলাবতী ও অপুর মা।
অপুর মা বলল, ”ছোটকত্তার আজ অনেক ধকল গেল। খাওয়াও তো কিছু হয়নি। আমি গিয়েই নুচি ভেজে দেব। ফিজে কাঁচামাংস থাকলে ভাল, নয়তো ডিমের কালিয়া করে দেব। হবে তো।”
”খুব হবে, সঙ্গে বেগুন ভাজাও করে দিয়ো।”
”কাকা, ন’শো গ্রাম পাউরুটি আর আটটা আলু দিয়ে ঝোল একটু আগে খেলে, তারপরও—”
”কালু, খাওয়ার কথা থাক, ক’টা ছয় মেরেছি সেটাই বল।”
”ষোলোটা ছয় আর তিনটে চার। উনিশটা হিটে একশো আট রান।”
”ব্র্যাডম্যানও পারেনি। তুই কাউকে এটা বলে দ্যাখ বলবে গুল মারছে। খবরের কাগজে দিলে ছাপবে না। বাবু বলেছিল মলয়ার কাছ থেকে জেনে নেবে। দেখবি ষোলো ছয়কে ছ’টা ছয় করে দেবে। আর মাথায় বল লাগাটাকে বাড়িয়ে বলবে।”
”কাকা, একটা কথা মনে রেখো, বড়দির আচার খেয়েছিলে বলেই এভাবে ব্যাট করতে পেরেছ।”
কলাবতী, অপুর মা ও পঞ্চু (২০০২)
কলাবতী, অপুর মা ও পঞ্চু (২০০২) – মতি নন্দী / প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ২০০২ / আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা ৯ পৃ. ১১২। মূল্য ৭০.০০। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: অনুপ রায় / উৎসর্গ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় গুণীজনেষু
সিংহিবাড়িতে গুলতির প্রবেশে বড়ির ভূমিকা
স্কুল থেকে ফিরে কলাবতী স্কুলের ব্যাগটা—যেটাকে দাদু রাজশেখর মাঝে মাঝে বলেন ‘গন্ধমাদন’ এবং কলাবতীকে ‘হনুমান’—টেবলে নামিয়ে রেখে চেয়ারে ধপ করে বসে মুখ তুলে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বলল, ”উফফ কী গরম রে বাবা!…পাখাটা একটু বাড়িয়ে দেবে পিসি?”
অপুর মা রেগুলেটর বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ”একটু জিরিয়ে হাত—মুখ ধুয়ে নাও, ততক্ষণে পেঁপেটা কেটে আনি।”
”পেঁপে!” কলাবতী সিধে হয়ে বসল। এই ফলটি তার খেতে একদমই ভাল লাগে না।
”আটঘরা থেকে দিয়ে গেছে। পেঁপে, সজনে ডাঁটা, চালতা, কচু, মত্তোমান কলা, পটল আরও কত কী।”
”এতো জিনিস খাবে কে?”
অপুর মা ঠোঁট মুচড়ে বলল, ”খাওয়ার লোকের অভাব? একা মুরারিদাই তোমার কাকার সঙ্গে তিনদিনে শেষ করে দেবে।”
”আমার খিদে নেই।” গম্ভীর মুখে কলাবতী বলল।
”খিদে নেই? রোজ এই এক কথা। কী খেয়েছ টিপিনে? হজমি, চাটনি আচার, আলুকাবলি, ঝালমুড়ি?”
”একটাও না। ধুপুকে আজ ওর মা সঙ্গে দিয়েছিল খিচুড়ি। কাদা কাদা নয়, শক্ত শক্ত বেশ ঝরঝরে অনেকটা পোলাওয়ের মতো, বলল ভূনি খিচুড়ি। হটপট থেকে চামচে তুলে তুলে খাচ্ছে—”
”আর তুমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলে।” অপুর মা’র চোখে দপদপ করল ধিক্কার। সেটা অগ্রাহ্য করে কলাবতী বলল, ”দেখছিলুমই তো। দেখব না? কী জিনিস।”
”কেন তুমি কি কখনও খাওনি? এই তো ক’দিন আগে ভাদ্দর মাসে ছোটবাবু বললেন বিষ্টি হচ্ছে আজ খিচুড়ি খাব। করে দিলুম, বেগুনিও করলুম।”
”সে তো গত বছর অগাস্ট মাসে। সেটা ছিল বাংলা খিচুড়ি কিন্তু এই ভূনি খিচুড়ি? ধুপু যখন এক চামচ মুখে ঢোকাচ্ছে আর একটা করে বড়িভাজা মুখে নিয়ে মড়মড় করে চিবোচ্ছে, কী বলব পিসি ওর চোয়ালদুটো কী বিউটিফুলি নড়াচড়া করছিল আর মড়মড় সাউন্ডটা!” কলাবতী বড়ি চিবোনোর শব্দ চোখ বন্ধ করে শুনে বলল, ”আমি আর থাকতে পারলুম না।”
”তুমি অমনি চেয়ে বসলে।”
”চাইবই তো। আমার প্রাণ যে চাইছিল। কাকা তো আমাকে বলেই দিয়েছে, ‘কালু আত্মাকে কখনও কষ্ট দিবি না, দিলে ভগবানও তোকে কষ্ট দেবেন। ফুচকা চিকেন রোল খেতে যখনই চাইবে তখুনি খাবি। চকোলেট, আইসক্রিমের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। এসব খাওয়ার অপকারিতা নিয়ে যদি মাথা ঘামাতে চাস তা হলে বুড়ো বয়সে মাথা ঘামাবি, এখন যা পারিস সাঁটিয়ে যা।’ পিসি আমি কিন্তু ধুপুর কাছে চাইনি। ও আমার মুখ দেখে নিজেই বলল, কালু একটু খেয়ে দেখবি? তখন যেসব কথা ভদ্রতা করে বলতে হয়, বললুম। ধুপু আমার থেকেও এককাঠি, দ্বিতীয়বার অনুরোধ না করে বলল, ঠিক আছে খেতে হবে না। পড়লুম বিপদে। তাড়াতাড়ি বললুম, মাসিমার হাতের তৈরি বড়ির কি অমর্যাদা করা যায়? বলব কী পিসি, সে কী বড়িভাজা! মোহন্তর পকৌড়িও সেই বড়ির ধারেকাছে আসে না।” কথাগুলো বলার সঙ্গে কলাবতী জিভ দিয়ে টাকরায় চকাত চকাত শব্দ তৈরি করল।
