গ্যালারিতে গর্জন ওঠার আগেই পটল হালদার ছুটে গেল মাঠের মধ্যে। চিৎকার করে সে কী বলছে কেউ শুনতে না পেলেও রাজশেখরের মনে হল তিনি যেন ‘স্তম্ভ’ আর ”মিলেনিয়াম’ শব্দ দুটি শুনতে পেলেন। প্রবল হইচইয়ের মধ্যে মলয়া চুপি চুপি ফিরে গেল বকদিঘি প্যাভিলিয়নে, পটল দু’হাত ছড়িয়ে ছুটে কাছে আসার আগেই সত্যশেখর দু’হাত তুলে থামাল।
”পটলবাবু, এখনও আঠারো রান বাকি। খেলাটা আগে শেষ হতে দিন, প্লিজ।”
পটল হালদার ফিরে যাওয়ার সময় পতু মুখুজ্যের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই পতু মুখ ঘুরিয়ে নিল। পটল বলল, ”আর দুটো ওভার।”
দুটো ওভারই লাগল। খোকন তার দ্বিতীয় বলেই রতুকে এল বি ডবলু করায় ব্যাট হাতে নামল কলাবতী। তাকে ক্রিজের দিকে এগোতে দেখামাত্র তুমুল হাততালি আর কলরোল উঠল গ্যালারিতে। একটি মেয়ে পুরুষদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে খেলছে এটা গ্রামের মানুষ আগে কখনও দেখেনি। তারা কৌতূহলী তো বটেই অভিভূতও।
নন স্ট্রাইকার যে তার কাকা, কলাবতী তা বুঝতে দিল না। ক্রিজে এসে, সত্যশেখর কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কলাবতী তাকে আঙুল তুলে থামিয়ে দিয়ে গার্ড নিল। একটি মেয়েকে বল করতে হবে খোকন ব্যানার্জি এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় কখনও পড়েনি। ব্যাপারটা হালকা করে দেখাতে সে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ফ্লাইট করিয়ে ডেলিভারি দিল। পা বাড়িয়ে কলাবতী নিখুঁত কভার ড্রাইভ করল। বল বাউন্ডারিতে গেল। খোকন কাঁধ ঝাঁকাল তাচ্ছিল্য দেখিয়ে। পরের বলটাও সে একই ভাবে করল একটু ওভারপিচ লেগ স্টাম্প বরাবর। কলাবতী পা বাড়িয়ে হাঁটু ভেঙে সুইপ করল। বল স্কোয়ার লেগ বাউন্ডারি পার হল।
খোকন এবার সন্ত্রস্ত। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নয়, এবার সে চারকদম ছুটে এসে জোরে বল করল পিচে ঠুকে দিয়ে। বল উঠল কলাবতীর বুকের কাছে। বিদ্যুৎগতিতে পুল করল জোরে ব্যাট চালিয়ে। বল আগের জায়গা দিয়েই বাউন্ডারি পার হল। আর ছয় রান বাকি। খোকন এবার তার পুরনো বোলিং মার্কে ফিরে গিয়ে পূর্ণগতিতে বল করল। লেগস্টাম্পে হাফভলি। কলাবতী গ্লান্স করল। বল উইকেটকিপারের বাঁ দিক ঘেঁষে বাউন্ডারিতে পৌঁছল। ডিপ ফাইন লেগ ছুটেছিল কিন্তু সে পৌঁছবার আগেই আটঘরার স্কোর ১৯০—এ পৌঁছে যায়। খোকন পরের বল ইচ্ছে করেই ওয়াইড দিল। একটা রান পেল আটঘরা। ম্যাচ এখন টাই। খোকন এবার ছুটে এসে জোরে বল করার ভান করে আস্তে ডেলিভারি দিল। কলাবতী ঠকে গিয়ে পিছিয়ে খেলতে গিয়ে বোল্ড।
মাঠ ঘিরে ”হায় হায়”—এর মতো শোকধ্বনি উঠল। কিন্তু আম্পায়ারের ডান হাতটা যে পাশে প্রসারিত হয়ে রয়েছে ”নো বল” সঙ্কেত জানিয়ে, সেটা কেউ লক্ষ করেনি। একটা রান যোগ হল অতিরিক্ত ঘরে। প্রথম মিলেনিয়াম ট্রফি জিতল আটঘরা।
সত্যশেখর এই প্রথম আজ ছুটল ভাইঝির দিকে। কলাবতীও ছুটে গিয়ে কাকাকে জড়িয়ে ধরল।
”উইনিং স্ট্রোকটা দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল রে কালু। হতচ্ছাড়া নিতে দিল না।”
”থাকগে না দিল তো নাই দিল। আমরা তো জিতেছি, দাদুর মুখরক্ষা হয়েছে, সেটাই বড় কথা।”
ফেরার সময় সত্যশেখর বলল, ”বাবা এবার কী বলবে সেটা জানতে ইচ্ছে করছে। ওরে দ্যাখ দ্যাখ, তোর বড়দির চোখে ক্যামেরা। ভাল করে হেসে তাকা।” এই বলে সত্যশেখর জিভ বার করে দেখাল। ”দেখবি ঠিক এই ছবিটা আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে।”
রাজশেখরের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামছে। অপুর মা অবাক হয়ে তাকিয়ে। কত্তাবাবার চোখে জল! সে এই প্রথম দেখল। ব্যাকুলস্বরে সে বলল, ”কত্তাবাবা হয়েছে কী, আমরা কি হেরে গেছি? আপনার চোখে জল কেন?”
”ও তুমি বুঝবে না। আমরা জিতেছি।” রাজশেখর উঠে এগিয়ে গেলেন ছেলে আর নাতনির দিকে।
মিলেনিয়াম ট্রফি বিজয়ী অধিনায়ক ডাক্তার ভুবন রায়ের হাতে কে তুলে দেবে? রাজশেখর সিংহ না হরিশঙ্কর মুখুজ্যে? শুরু হল বাকবিতণ্ডা। অবশেষে কলাবতী প্রস্তাব দিল, ”টস হোক, যে জিতবে তার পছন্দের লোক ট্রফি দেবে।” প্রস্তাব সমর্থন করল মলয়া।
মাঠের ধারে টেবলের উপর ঝকঝকে ট্রফি বসানো। পতু ও পটল ট্রফির সামনে দাঁড়াল। সারা মাঠের দর্শক ভেঙে পড়েছে ট্রফির সামনে। ঠেলাঠেলি, চিৎকার সমানে চলেছে। পতু একটা টাকা নিয়ে টস করল। পটল হালদার ডাকল ”হেড।”
দু’জনেই ঝুঁকে পড়ল জমিতে পড়া টাকার উপর। পটল হালদার হঠাৎ ”আঁ” বলেই মাথা ঘুরে ধড়াস করে জমিতে পড়ে গেল। তাকে ধরাধরি করে তুলে সোফায় এনে শোয়ানো হল। পরমেশ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ”হল কী, পটলদা অমন করে পড়ে গেলেন কেন।”
”হেড পড়েছে, পতুটা হেরেছে।” বলেই পটল হালদার আরামে চোখ বুজল।
ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে রাজশেখর ডেকে নিলেন হরিশঙ্করকে। ”হরি আয়, দু’জনে মিলে ট্রফিটা তুলে দিই।”
ডাক্তার ভুবন রায়ের হাতে ট্রফি ওঠার আগে রাজশেখর মাইকে বললেন দুটো কথা।
”এই মিলেনিয়াম ম্যাচ এবার থেকে হোক আমাদের মিলনের ম্যাচ। এই ট্রফি হোক মিলন ট্রফি। বকদিঘি আটঘরার মানুষজন এই বাৎসরিক ম্যাচকে প্রীতি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে মজা আর ফূর্তির ম্যাচ করে তুলুক। বছরে বছরে একবার আমরা মিলিত হব মিলনের জন্য। সামনের বছর আবার আমরা মিলব আটঘরায়।”
প্যাভিলিয়নে খেলার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে নিতে কলাবতী বলল, ”কাকা, লাঞ্চ তো কিছুই খাওয়া হল না, এখন ভীষণ খিদে পাচ্ছে।”
