খোকনের পরের বল সত্যশেখর আর ফসকাল না। টেনিসের ফোরহ্যান্ড শর্টের মতো প্রচণ্ড জোরে অফস্টাম্পের বাইরের বলটা মারল। খোকন দ্রুত মাথা না সরালে হয়তো মুণ্ডুটা উড়ে যেত। মাঠটা একবার ছুঁয়ে বল বাউন্ডারি পেরিয়ে গেল। ওভারের বাকি বলগুলোয় রান হল না, কেন না ডিপ ফাইনলেগ, লং অন এবং থার্ডম্যান ফিল্ডারেরা বল থামিয়ে দেওয়ায় সত্যশেখর আর দৌড়য়নি এবং রান দিতে ছুটে গিয়েও বিশু ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
স্কোরবোর্ড দেখে প্যাড পরে তৈরি থাকা ভুবন ডাক্তার বলল, ”আর ছিয়াশি রান দরকার, কুড়ি ওভার এখনও হাতে আছে। মনে হচ্ছে হয়ে যাবে, কী বল পরমেশ।”
পরমেশ বিজ্ঞের মতো বলল, ”এটা ক্রিকেট ডাক্তারবাবু, আগে থেকে কিছু বলা যায় না।”
বলা যে যায় না, সেটা দেখা গেল অতুল মুখুজ্যের ওভারে। নিরীহ একটা শর্ট পিচ বল বিশু, সম্ভবত তার পার্টনারের ব্যাটিং দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে ব্যাট চালাল সোজা ছয় মারার জন্য। ব্যাটের উপরের দিকে লেগে বলটা উঠে গেল বোলারের মাথার উপর। ক্যাচ ধরতে তৈরি অতুলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পতু বলের নীচে দাঁড়াল এবং লুফল। তারপর বলল, ”গত বছর তুমি ক্যাচ ফেলেছিলে নিজের বলে, মনে আছে? এবার আর ফেলতে দিলুম না।”
অধিনায়ক মাঠে নেমে প্রথমে গেল নন স্ট্রাইকার সত্যশেখরের কাছে, চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করতে। ব্যান্ডেজের বাঁধন ঠিক আছে কি না চোখ দিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করল, ”যন্ত্রণা হচ্ছে।” আপনার চোখ দেখছি লাল হয়ে উঠেছে। আপনি এই ওভারটা চোখ বুজিয়ে থাকুন, বিশ্রাম পাবে চোখ। আর ছয়টয়গুলো মারার সময় চোখে যাতে স্ট্রেন না হয় সেদিকে লক্ষ রাখবেন। এই ডিসেম্বরে দেখছি আপনি ঘামছেন!” বলেই ডাক্তার ভুবন রায় সত্যশেখরের কবজি দু’আঙুলে টিপে ধরে নাড়ির স্পন্দন অনুভব করতে শুরু করলেন।
দুই আম্পায়ার, মাঠের খেলোয়াড়রা ততক্ষণে ওদের কাছে চলে এসেছে। এক আম্পায়ার বললেন, ”খেলা বন্ধ রেখে মাঠে চিকিৎসা না করে ওকে বাইরে নিয়ে যান।”
ডাক্তার ভ্রূ কুঁচকে বলল, ”নাড়ির গতি অস্বাভাবিক, ঘাম, চোখ লাল, মনে হচ্ছে এখুনি বেড রেস্ট দরকার, সতুবাবু আপনি রিটায়ার করুন।”
”কভি নেহি।” গর্জন করে উঠল সত্যশেখর। ”আরও ছিয়াশি রান দরকার। সেটা তুলে দিয়ে তবেই ফিরব। নিন, খেলা শুরু করুন।”
অধিনায়ক ক্রিজে ফিরে গার্ড নিয়ে ব্যাট হাতে তৈরি হয়ে অতুলের বলের অপেক্ষায় রইল। বল ডেলিভারি হওয়ার আগেই ভুবন ডাক্তার ড্রাইভের জন্য কেতাবি ঢঙে বাঁ পা বাড়িয়ে ব্যাট পিছনে তুলে নিল। অতুলের বলটা বাড়ানো বাঁ পায়ের একহাত দূরে পড়তেই ডাক্তার সজোরে ব্যাট চালাল। বল উঠে গেল এবং অতুলের বাড়ানো হাতের আঙুলে লেগে কাছে দাঁড়ানো এক ফিল্ডারের কাছে গেল। ডাক্তার ততক্ষণে রান নেওয়ার জন্য ছুটেছে। প্রায় পনেরো গজ আসার পর দেখল নন স্ট্রাইকার তার ক্রিজ থেকে এক ইঞ্চিও বেরোয়নি। ফিরে যাওয়ার আগেই ফিল্ডার বল ছুড়ে দিয়েছে উইকেটকিপারকে। অধিনায়ক কাঁপিয়ে পড়েও নিজেকে রান আউট থেকে বাঁচাতে পারল না।
ফিরে যাওয়ার সময় ভুবন ডাক্তার ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, ”দৌড়বেন না সেটা আগে আমায় বলবেন তো।”
এর পর ব্যাট হাতে এল রতু। মুখ শুকনো। প্যাড পরে স্বচ্ছন্দে হাঁটতে পারছে না। অনভ্যাসের জন্য। সত্যশেখর তাকে হাত নেড়ে ডাকল, ”খোকা তোমাকে ডাক্তারবাবু কোনও ইনস্ট্রাকশন দিয়েছেন কী?”
”বললেন পিটিয়ে খেলবি, যা পাবি মারবি।”
”একদম নয়। বল আটকাও, নয় ছেড়ে দাও। পেটানোর কাজটা আমার।”
রতু মাথা নেড়ে ক্রিজে ফিরে গিয়ে একটাও সোজা না আসা অতুলের বাকি বলগুলো ছেড়ে দিল। পতু এবার বোলিং চেঞ্জ করে অরুণাভকে আনল। মোটামুটি জোরে বল করে সে। তার প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ বল উড়ে গেল বাউণ্ডারির উপর দিয়ে, তৃতীয় ও পঞ্চম বল বাউন্ডারি লাইন ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। এক ওভারে বত্রিশ রান নিল সত্যশেখর।
পতু বুঝে গেছে, বাহাত্তর রান করা সত্যশেখরের উইকেট পাওয়ার চেষ্টা না করে অন্যদিকের উইকেটগুলো সরিয়ে দেওয়াই এখন বুদ্ধির কাজ হবে। অ্যাকাডেমির কিশোরের সামনে সে নিয়ে এল খোকনকে। দাঁতে দাঁত চেপে চোখ তীক্ষ্ন করে রতু খোকনের ছ’টা বলই এগিয়ে—পিছিয়ে ব্যাট দিয়ে খেলে দিল। সত্যশেখর শাবাশ জানাতে বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল। রতুর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল গর্বে।
বল হাতে নিয়ে পতু মুখুজ্যে ছুড়ে দিতে যাচ্ছিল অরুণাভকে। সে হাত জোড় করে বলল, ”পতুদা আমাকে ছেড়ে দাও। দোকান চালিয়ে আমাকে খেতে হয়। আমার খদ্দের কমে যাবে আর ছ’টা বল করলে।”
পতু এধার—ওধার তাকাতেই কেউ আকাশ দেখতে শুরু করল, কেউ বাউন্ডারির দিকে এগিয়ে গেল। পতু এবার ঠিক করল নিজেই বল করবে। স্কোরবোর্ডে আটঘরার রান একশো আটত্রিশ চার উইকেটে। আর চুয়ান্ন রান করলেই জিতবে। পতু মনে মনে বলল, এই সতু সিংঘির উইকেটটা নিতে পারলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে, এটাকে চাইই।
সত্যশেখরও তখন মনে মনে বলল, চুয়ান্নটা রান তুলতেই হবে। ভাড়াটে প্লেয়ার দিয়ে জেতা যায় না, এটা বুঝিয়ে ছাড়ব। এখন আর একটু পেতুম যদি আচারটা।
পতু অফস্পিন করায়। তার প্রথম তিনটি বল স্ক্রিনের উপর দিয়ে, চতুর্থটি স্ক্রিনের কাপড়ের উপরে, পঞ্চমটি মিড উইকেট গ্যালারিতে, ষষ্ঠটি বকদিঘির প্যাভিলিয়নের উপর পড়ল। তার পঞ্চম ওভার বাউন্ডারিতেই ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি পূর্ণ হয়ে যায়, তার রান তোলার গতির সঙ্গে স্কোরবোর্ডের গতি তাল রাখতে পারছিল না। ওভার শেষ হতে বোর্ডে দেখা গেল তার রান ১০২।
