সবাই হতভম্ব। ফ্যালফ্যাল চোখে দেখল সত্যশেখর আহত সিংহের মতো পায়চারি করছে আর বারবার অধৈর্য দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকাচ্ছে। পারলে এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে যেন।
বিশুর মারা ওভার বাউন্ডারি আটঘরা প্যাভিলিয়নের সামনে পড়ল। অতুল মুখুজ্যের এই ওভারে এটি তার তৃতীয় ছয়। তার নিজের রান এখন সাতাশ, শঙ্করের চোদ্দো। সে ছোটখাট দুর্বল গড়নের ছেলে। তুলে বল মারে না। এক—দুই রান নিয়ে খেলে, সাত ওভারে আটঘরার স্কোর এগারো বাই রান ও দুই ওয়াইড সহ একষট্টি রান। খোকনকে তুলে রেখেছিল পতু প্রথম ওভার শেষ হতেই। দর্শকদের ধিক্কার ও আপত্তি প্রবলভাবে মাঠে আছড়ে পড়তে শুরু করেছিল সত্যশেখরের মাথায় বল লেগে রক্ত পড়া দেখে।
অতুলের ওভার শেষ হতেই পতু বল করা জন্য ডাকল খোকনকে। মাঠ ঘিরে আপত্তির ঝড় উঠলেও পতু তা গ্রাহ্য করল না। খোকনের প্রথম বলেই বোল্ড হল শঙ্কর। সত্যশেখর আম্পায়ারের তোলা আঙুল দেখেই ব্যাটটা তুলে নিয়ে হাঁ করে জিভ জুড়িয়ে নিতে নিতে মাঠে ঢুকে পড়ল।
কলাবতী চেঁচিয়ে বলল, ”কাকা, গ্লাভস নাও।”
”দরকার নেই।” মুখ ফিরিয়ে বলল সত্যশেখর।
শঙ্কর তখনও আউট হওয়ার শোকে মুহ্যমান। ক্রিজে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। এর আগে এই পর্যায়ের বোলারের বল সে খেলেনি। ক্রিজ থেকে সে প্যাভিলিয়নের দিকে রওনা হচ্ছে তখন পৌছে গেল সত্যশেখর। গার্ড নেওয়ার বালাই নেই। ব্যাটটা তুলে রেখে সে তাকাল বোলারের দিকে। সে মাঠে নামামাত্র তার ব্যান্ডেজে মোড়া মাথা দেখে দর্শকরা কয়েক সেকেন্ড হতবাক থেকে উল্লাসে উচ্ছ্বাসে হাততালি দিয়ে সংবর্ধিত করেছিল। খোকন যখন ডেলিভারি দেওয়ার জন্য দৌড় শুরু করল তখনও হাততালির উতরোল চলছে।
সত্যশেখরকে দেওয়া খোকনের প্রথম বল সোজা উড়ে গেল ব্যাটের তাড়া খেয়ে শালিখ পাখির মতো সাদা চাদরের স্ক্রিনের উপর দিয়ে। আম্পায়ার দু’হাত তুললেন। দ্বিতীয় বল ঠিক/একই ভাবে খোকনের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। তৃতীয় বল পালাল মিড উইকেট বাউন্ডারির উপর দিয়ে। চতুর্থ বল পড়ল স্কোয়ার লেগে বকদিঘি প্যাভিলিয়নের চালের উপর। পঞ্চম বল ছিল ইয়র্কার এবং হল নোবল। এই প্রথম দেখা গেল সত্যশেখরের ফুট ওয়ার্ক। ডান পা একহাত পিছিয়ে বলটা হাফভলি করে নিয়ে লং অফের উপর দিয়ে বাউন্ডারির বাইরে ফেলে দিয়ে পেল সাতরান। খোকন অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে থেকে হাততালি দিতেই পতু বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকাল। খোকন বলল, ”সোবার্স ছাড়া এমন মার আর কেউ মেরেছে বলে শুনিনি।” ষষ্ঠ বলটি একটা শর্ট পিচ অফস্টাম্পের বাইরে। সেটার গতি হল একস্ট্রা কভারের পিছনে বসা দর্শকদের মধ্যে। ছয় নোবলসহ সাত বলে সাঁইত্রিশ রান। তুমুল কলরোলে আটঘরার আকাশবাতাস ভরে গেল।
ওভার শেষ হতে সত্যশেখর ডাকল বিশুকে। ”এক দুই তিন একদম নয় পার তো চার ছয় নাও। আমাকে দৌড় করালে রান আউট করে দেব।”
মুগ্ধ স্তম্ভিত বিশু ঘাড় নেড়ে ক্রিজে ফিরে গেল এবং অতুল মুখুজ্যেকে মেডেন দিল। পতু খোকনকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, ”আর বল করবেন?” মুখ লাল করে ত্রিপুরার এগারো উইকেট নেওয়া বোলার বলল, ”নিশ্চয় করব।”
খোকন বুঝে গেছে, লেগ স্টাম্পে বা তার বাইরে বল ফেললে এই ব্যাটসম্যান তাকে খুন করে ফেলবে। অফ স্টাম্পের বাইরে সে প্রথম বলটা রাখল। বলটা লেগের দিকে ঘোরাতে গেল সত্যশেখর। ব্যাটে ঠিকমতো লাগল না। বলটা প্রায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে নির্জন লং অফ বাউন্ডারি পেরোল। মাঠ ঘিরে হতাশা ছয় দেখতে না পাওয়ায়, তবে হাততালি পড়ল স্কোরবোর্ড দেখে আটঘরার রান একশোয় পৌঁছনোর জন্য।
পটল ঝুঁকে রাজশেখরকে বলল, ”বড়বাবু নয় ওভারে একশো এক, তা হলে আঠারো ওভারে দুশো দুই। টার্গেট একশো বিরানব্বুই, তার মানে কুড়ি ওভারের আগেই জিতছি। সতুবাবু যদি একটা সেঞ্চুরি এবারও করেন—।”
”পটল খবরদার স্তম্ভটম্ভর কথা একদম তুলবে না। যদি ওইসব চিন্তা মাথা থেকে বার করে না দাও তা হলে এখুনি সতুকে খবর পাঠাব আউট হয়ে চলে আসার জন্য, তুমি কি সেটাই চাও?”
জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে মাথা নেড়ে পটল বলল, ”একদম না, একদম না।”
তখন কলাবতী চুপি চুপি মলয়াকে—বকদিঘি প্যাভিলিয়নে বাবা ফিরে গেলেও মলয়া যায়নি—বলল, ”কাকার এই পাগলের মতো ব্যাটিং কেন সেটা আমি জানি।” মলয়া কৌতূহলী চোখে তাকাতে কলাবতী বলল, ”আপনার ওই একস্ট্রা ঝাল আচার খেয়ে, এর আগেও দেখেছি কাকার ইচ্ছে হয় বোলার ঠ্যাঙাতে। বড়দি বকদিঘি যদি আজ হারে, মনে হচ্ছে হারবে তবে সেটা হবে আপনারই জন্য।”
খোকনের দ্বিতীয় বল অফ স্টাম্পের এত বাইরে দিয়ে গেল যে আম্পায়ার দু’হাত ছড়িয়ে ওয়াইড দেখালেন। সত্যশেখর মুচকি হাসল। মনে মনে বলল, ভয় পেয়েছে। পরের বলটা সে ব্যাট চালিয়ে ফসকাল। প্যাডে লাগল, খোকন তো বটেই, থার্ডম্যানও বাউন্ডারি ধার থেকে দু’হাত তুলে বিকট স্বরে চিৎকার করল, ”হাউজ্যাট।” আম্পায়ার মাথা নেড়ে আবেদন নাকচ করে দিলেন।
তখন পটল গদগদ স্বরে রাজশেখরকে বলল, ”বড়বাবু, নিরপেক্ষ আম্পায়ার রাখার কথা আপনিই একমাত্র বলেছিলেন। এখন বুঝছি তাতে কত উপকার হয়েছে। যদি বকদিঘির আম্পায়ার হত তা হলে তো সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে দিত!”
