খোকন শর্ট লেংথে অল্প আউটসুইং করিয়ে প্রথম ডেলিভারিটি দিল। লেগ স্টাম্প বরাবর পিচ পড়ে বলটা আচমকা লাফিয়ে উঠে যেন আরও গতি সঞ্চয় করে ফেলল। সত্যশেখর মাথাটা সরিয়ে নিতে দেরি করায় বলটা তার কপালের ডান দিকে লেগে ‘খটাস’ শব্দ তুলে স্লিপে ফিল্ডারদের মধ্য দিয়ে বাউন্ডারিতে পৌঁছে গেল। চশমাটা ছিটকে পড়েছে ক্রিজের ওপর।
সারা মাঠ বিস্ময়ে বিমূঢ়। সত্যশেখরের কপাল থেকে ঝরঝরিয়ে রক্ত ঝরছে। সাদা শার্টটার বুক কাঁধ লাল হয়ে গেল। ছুটে এসে একজন রুমাল দিয়ে আঘাতের জায়গাটা চেপে ধরল।
”চশমায় লাগলে চোখটা যেত।” একজন ভীতস্বরে বলল।
রুমালটা কপালে চেপে ধরে সত্যশেখর ফিরে এল। দু’জন ফিল্ডার তার দুই বাহু ধরে পৌঁছে দিল মাঠের সীমানা পর্যন্ত। অপুর মা প্রথম ছুটে গেল, সঙ্গে কলাবতী। রাজশেখর সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ”ডাক্তারবাবু দেখুন তো। খুব লেগে থাকলে এখুনি কলকাতায় নিয়ে যাব।”
সত্যশেখর হাত তুলে বলল, ”ব্যস্ত হোয়ো না। কিছু হয়নি।”
সোফায় বসে চোখ বন্ধ করল সত্যশেখর। ভুবন ডাক্তার রুমাল সরিয়ে ক্ষতস্থান দেখে ব্যস্ত হয়ে পটলকে বলল, ”তুলো দিন তুলো, আগে রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে।” পটল ভিতরে ছুটল হন্তদন্ত হয়ে।
পাশের প্যাভিলিয়ন থেকে ছুটে এসেছে মলয়া আর হরিশঙ্কর। নিচুগলায় রাজশেখর বললেন, ”বলটা ভালই করেছিল। সতু ডাক করতে পারল না। কী আর করা যাবে।”
একই স্বরে হরিশঙ্কর বললেন, ”তাই বলে অমন করে লাফিয়ে উঠবে! নিশ্চয় জলটল দিয়ে, ঠিকমতো রোল করা হয়নি। পিচ তৈরির ব্যাপারটা তোর ক্রিকেট জানা ভাল কোনও লোকের হাতে দেওয়া উচিত ছিল।”
”আটঘরায় রোলার নেই, রোল করবে কোত্থেকে?” রাজশেখর অসহায় মুখে বললেন।
”বকদিঘিতে আছে, পরের বার বলিস পাঠিয়ে দোব।”
পটল একটা জুতোর বাক্স হাতে নিয়ে এল। লাল কালি দিয়ে তার ঢাকনায় ক্রস চিহ্ন আঁকা, এটাই মেডিক্যাল বক্স। তুলো, ব্যান্ডেজ, বেঞ্জিন, ডেটল, মলমের টিউব, লিউকো প্লাস্টার তার মধ্যে।
সত্যশেখর আহত হয়ে ফিরে আসায় তার জায়গায় নেমেছে কম্পাউণ্ডার চণ্ডীচরণ রায়। মাঠের দিকে কারুর নজর নেই, সব চোখ সত্যশেখরে নিবদ্ধ। মলয়া তুলো, ডেটল দিয়ে কপাল গাল গলা থেকে রক্ত মুছিয়ে দিয়ে দিতে মৃদু স্বরে অনুযোগ করে বলল, ”কী দরকার ছিল গোঁয়ারের মতো এই ম্যাচে খেলতে নামার!”
বন্ধ চোখের একটা খুলে সত্যশেখর বলল, ”ভাড়াটে প্লেয়ার দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না, এটা তা হলে প্রমাণ করব কী করে?”
দর্শকদের হতাশ ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল মাঠ ঘিরে। ডাক্তারবাবু চণ্ডীকে ফিরে আসতে দেখে বলল, ”বিশু, এবার নেমে পড়ো।”
বিশু একপায়ে প্যাড পরে ব্যাট হাতে শ্যাডো করছিল। অবাক হয়ে বলল, ”ডাক্তারবাবু, আমি তো পাঁচ নম্বরে।”
ডাক্তার গম্ভীর স্বরে বলল, ”দেখছ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি। আমার জায়গায় তুমি এবার যাও।” তারপর মাঠের ওপাশের স্কোর বোর্ডের দিকে তাকিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলল, ”এগারো রান দু’ উইকেটে। চণ্ডীর সাত রান।”
সত্যশেখর সোফায় হেলান দিয়ে ছিল, সিধে হয়ে বসল, ”দু’ উইকেট নয় এক উইকেট। আমি এখনও আউট হইনি।”
মলয়া অবাক চোখে বলল, ”হওনি মানে। আবার ব্যাট করবে?”
”অফ কোর্স। এখনও প্যাড খুলিনি। ডাক্তারবাবু ব্যান্ডেজ জম্পেশ করে বাঁধুন তো।”
ডাক্তার কপালের উপর দিয়ে মাথা ঘিরে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে ব্যান্ডেজের শেষ প্রান্তটা হাতে ধরে রেখে বললেন, ”দুটো সেফটিপিন দেখি।”
সবাই মুখ চাওয়া—চাওয়ি শুরু করল। পটল জুতোর বাক্স ঘাঁটাঘাঁটি করে মাথা নাড়ল। কলাবতী ছুটে ভেতরে গিয়ে তার ছোট কিটব্যাগটা নিয়ে এল। এর মধ্যে সে বাবুদার পরামর্শ মতো টুকটাক দরকারি জিনিস— ব্লেড কাঁচি সূচ সুতো বোতাম সেফটিপিন প্লাস্টার ইত্যাদি—রাখে। খেলার সময় হঠাৎ কখন কী দরকার পড়ে কে জানে!
ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে হাতড়াতে হাতড়াতে তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। এটা কী? জিনিসটা বার করল। মলয়ার দেওয়া ঝাল আমের আচারের সেই ছোট শিশিটা। কাকার হাত বা জিভের থেকে বাঁচাবার জন্য সে এই খেলার ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। এই ভেবে, কাকা যেখানেই খুঁজুক না কেন, খেলার ব্যাগের মধ্যে হাত ঢোকাবে না।
শিশিটা সে বাঁ হাতে ধরে ডান হাতটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আবার সেফটিপিন খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেল। সত্যশেখর তখন একদৃষ্টে কলাবতীর বাঁ হাতের দিকে তাকিয়ে। ডাক্তারবাবু ব্যান্ডেজে সেফটিপিন লাগিয়ে দিল।
”কালু, তোর হাতে ওটা কী রে, দেখি।” সত্যশেখর হাত বাড়াল।
কলাবতী হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, সত্যশেখর খপ করে হাতটা ধরে ফেলে শিশিটা ছিনিয়ে নিয়েই প্যাঁচ ঘুরিয়ে ঢাকনা খুলল। গন্ধটা শুঁকেই একটা আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে যতটা আচার তোলা যায় তুলে মুখে পুরে দিল। চোখ বুজে চুষতে চুষতে আবার আঙুল ঢোকাল।
”আহহহ এটা আগের থেকেও ঝাল। আ হ হ হ। কালু, ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলছে রে। উ হু হু হু।” সত্যশেখর জিভ বার করে মুখে বাতাস ঢোকাতে লাগল।
আতঙ্কিত কলাবতী বলল, ”কাকা, এখানে বরফ নেই!”
”না থাক, কিছু আসে যায় না।” বলেই সত্যশেখর দাঁড়িয়ে উঠে বলল, ”ডাক্তারবাবু এবার আপনি নন, আমি নামব।”
