মেজোবাবুর পরের বলেই নবাগত মুকুন্দ মালখণ্ডি তিন রান পেল ওভার থ্রো থেকে। অনিন্দ্য মিড উইকেট থেকে বল ছুড়েছিল, মেজোবাবু ধরতে পারেনি। পতু এখন স্ট্রাইকার। মেজোবাবু আবার তাঁর আকাশচুম্বী বল করলেন। পিচের মাঝামাঝি পড়ছে বলটা। পতু ঠিক করতে পারছে না কী করবে। ক্রিজ থেকে বেরোবে কি বেরোবে না, মন স্থির করতে করতেই বল পড়ল জমিতে তারপর একটা ড্রপ খেয়ে এল কলাবতীর হাতে।
একটা ওভার বাউণ্ডারি মারার বল নষ্ট হল। পতু সখেদে মাথা নেড়ে তৈরি হল ব্যাট হাতে। এবারের বলটা আগেরটার মতোই। পতু স্থির করেই রেখেছিল ছ’টা রান এবার নেবেই। ব্যাট তুলে সে প্রায় হেঁটেই বেরোল ক্রিজ থেকে বলের পিচের কাছে পৌঁছবার জন্য। ব্যাটটা প্রচণ্ড বেগে নেমে এল। কিন্তু বলে লাগল না, একটা খোদলে পড়ে বল সরে যেতেই সে ফসকে গেল। ক্রিজে ফিরে আসার চেষ্টায় সে ঘুরে ঝাঁপ দিল ব্যাটটা বাড়িয়ে দিয়ে। কিন্তু ততক্ষণে কলাবতী স্টাম্পিংয়ের কাজটা সেরে ফেলেছে।
বকদিঘির ইনিংস সাতাশ ওভার এক বলে শেষ হল ১৯১ রানে। মাঠ ছেড়ে প্যাভিলিয়নে ফেরার সময় সত্যশেখর জিজ্ঞেস করল, ”কালু, কী বুঝলি?”
”বুঝলুম, এতকাল ক্রিকেট সম্পর্কে কিছুই জানতুম না, দিব্যজ্ঞান হল।”
নিয়মানুযায়ী যে যার নিজের লাঞ্চ। আটঘরার লাঞ্চ স্পনসর করেছে কালীমাতা কোল্ড স্টোরেজ। সারা মাঠ ঘিরে কোল্ড স্টোরেজের সাতটা ফেস্টুন। লাঞ্চ রান্নার দায়িত্ব নিয়েছে বকু বোস। এই নিয়ে অফিশিয়াল কেটারার হাবু মোদক বিস্তর ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে, ”আর আমি ফ্রিতে দই মিষ্টি দেব না, তাতে বিশু টিমে চান্স পাক বা নাই পাক।” বিশু হাবুর ছেলে।
টেবলে প্লেট সাজানো। সকালে ভাজা লুচি দিস্তা করে রয়েছে একটা ঝুড়িতে । ছোট স্টিলের বালতিতে রুইমাছের কালিয়া, গামলায় টমাটোর চাটনি, কাগজের বাক্সে সন্দেশ, মাটির হাঁড়িতে রাজভোগ, স্তূপাকার সিঙ্গাপুরি কলা টেবলের একধারে। পরিবেশনে ব্যস্ত ভলান্টিয়াররা।
পাশাপাশি বসেছে সত্যশেখর ও কলাবতী।
”কালু, লুচির অবস্থা দেখেছিস, মনে হচ্ছে ম্যালেরিয়া হয়েছে।”
”বেশি খেয়ো না, তুমি তো ওপেন করবে। মিষ্টির বোধ হয় জন্ডিস হয়নি।”
”দেখলুম মলয়ার হাতে ক্যামেরা, খুব ছবি তুলছে। আমার ক্যাচ ধরাটাও নিশ্চয় তুলেছে।”
”বলতে পারব না। তবে মাথায় বল পড়াটা তুলেছেন, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।”
”আমিও। এমন সুযোগ বকদিঘির মেয়ে ছাড়বে না। তুই দেখিস ছবিটার একটা কপি আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে।”
লাঞ্চ শেষে ওরা দু’জন প্যাভিলিয়ন থেকে বেরিয়ে এসে দেখল রাজশেখর আর অপুর মা কোথাও নেই!
”গেল কোথায় ওরা।” কলাবতী বলল।
”যাবে আর কোথায়, হয়তো চাওমিন কি রোল খেতে গেছে। টিমে না থাকলে প্লেয়ারদের সঙ্গে লাঞ্চ করা বাবা একদম পছন্দ করেন না।”
তক্ষুনি রাজশেখর আর অপুর মা এসে হাজির, সেইসঙ্গে অপুও।
”অপু বলল, চনমন খাব। কত্তাবাবা ওকে টাকা দিয়ে বললেন, যা খেয়ে আয়, আমাকে বললেন, তুমিও খাবে নাকি? বললুম, আগে চোখে দেখি।” অপুর মা’র কথার বাঁধ ভেঙে গেছে। বন্যার মতো কথা বেরিয়ে আসছে। ভেসে যাওয়ার আগেই সত্যশেখর বলল, ”তোমরা কথা বলো, আমি তৈরি হই। কালু, তুই কত নম্বরে?”
”ছয় না সাত, দেখে নিতে হবে। কাকা, মনে রেখো জিততে হলে একশো বিরানব্বই করতে হবে একশো আশি বলে।”
গম্ভীর মুখে সত্যশেখর ভিতরে ঢুকে গেল। অপুর মা তারপর শুরু করল, ”কী ভিড় কী ভিড় চনমনের দোকানে! কাছে যেতে পারি না। একটা মেয়ে দেখি ডিশে করে খাচ্ছে নাড়িভুঁড়ির মতো কী যেন, তাতে দুটো গাজর কুচি বাঁধাকপি পাতা, পেঁয়াজ আর বলল তো কুচো চিংড়িও নাকি রয়েছে, আমি তো বাপু দেখতে পেলুম না। কাদার মতো কী একটা মাখিয়ে গপ গপ করে ছেলেমেয়ে বুড়োবুড়ি কী আনন্দ করে যে খাচ্ছে! দেখে গা গুলিয়ে উঠল। অপুকে বললুম খেতে হয় তো তুই খা, বলামাত্র ছেলে ছুটল কেনার জন্য। কত্তাবাবা বললেন, আর দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে, চলো আমরা হাবুর মিষ্টির দোকানে যাই।
”হাবুর দোকানে গিয়ে দেখি মাছি তাড়াচ্ছে। কাচের আলমারি ভর্তি সন্দেশ রাজভোগ ল্যাংচা পড়ে রয়েছে। বলল, একশো গ্রাম দইও বিক্রি হয়নি সকাল থেকে, ভটচাজবাড়িতে জামাই আসবে তাই আটটা ল্যাংচা আর রাজভোগ বিক্রি হয়েছে। কালুদি, তোমার খাওয়া হয়েছে? আমি গুনেছি তুমি তিনজনকে মোর করেছ।”
অপুর মা’র কথার বন্যা রুখতে কলাবতী বোল্ডার ফেলল। ”পিসি দেখি গিয়ে, কাকা কেমন তৈরি হচ্ছে। তুমি বোসো।”
ঝড়ের মতো পটল হালদার প্যাভিলিয়নে ঢুকল। ”হারিআপ হারিআপ, আম্পায়াররা নেমে পড়েছে। এই যে শঙ্কর, তোমার পার্টনার সতুবাবু কোথায়?” প্লেয়ার্স রুমে সে উঁকি দিয়ে দেখল সত্যশেখর চেয়ারে বসে প্যাডের স্ট্র্যাপ আঁটার জন্য নিচু হওয়ার চেষ্টা করছে।
তাকে দেখে সত্যশেখর বলল, ”লাগিয়ে দিন তো।”
শঙ্কর আর সত্যশেখর যখন মাঠে নামছে, ভুবন ডাক্তার এগিয়ে এসে বলল, ”বেস্ট অফ লাক। ফার্স্ট তিনটে ওভার উইকেটের পেস আর বাউন্স বুঝে নিয়ে তারপর চালিয়ে খেলবেন, শঙ্কর একদিক ধরে থাকবে।”
বকদিঘির ইনিংসে প্রথম বলেই ছিল নাটক, আটঘরার ইনিংসেও তাই হল। খোকন ব্যানার্জি কদম মেপে বোলিং মার্কে গিয়ে বুট দিয়ে জমিতে আঁচড় কাটল, আম্পায়ারের কাছ থেকে গার্ড নেওয়ার তোয়াক্কা না করে সত্যশেখর ব্যাটটা জমি থেকে একহাত তুলে রেখে উদ্ধত ভঙ্গিতে বোলারের দিকে তাকিয়ে রইল।
