ডাক্তার সাতজন ফিল্ডার রাখল নতুন ব্যাটসম্যান পতু মুখুজ্যেকে ঘিরে। উত্তেজনায় মাঠের দর্শকরা দাঁড়িয়ে উঠেছে। রতুর মুখ শুকনো, জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল। এত লোক তার দিকে তাকিয়ে, এমন অভিজ্ঞতা তার জীবনে এই প্রথম। চণ্ডী শর্টলেগ থেকে কাছে এসে কানে কানে বলল, ”আর একটা ফুলটস দে অফ স্টাম্পের বাইরে।” শুনে রতু ঘাড় নাড়ল।
অধিনায়ক সিলি পয়েন্ট থেকে এগিয়ে গেল রতুর দিকে। ওর কানে মুখ রেখে বলল, ”লেগ স্টাম্পের দু’ ইঞ্চি বাইরে থ্রি কোয়ার্টার লেংথে।” শুনে রতু মাথা কাত করল।
মেজোবাবু সিলি মিড অন থেকে ছুটে গেল রতুর কাছে। আঙুল তুলে বলল, ”কিছু করতে হবে না, শুধু একটা ইয়র্কারি দাও।” রতু ঢোক গিলে মাথা নাড়ল।
সবাই তৈরি। পতু মুখুজ্যে স্টান্স নিয়ে ভ্রূ কুঁচকে কী দেখে তিন পা বেরিয়ে গিয়ে ঝুঁকে পিচ থেকে একটা বালির কণা খুঁটে তুলে ছুড়ে ফেলে দিল। ক্রিজে ফিরে আবার স্টান্স নিল। রতু বল করতে দৌড় শুরুর সঙ্গে সঙ্গে মাঠের চারধার থেকে ”হা আ আ আ” চিৎকার উঠল।
ডেলিভারিটা রতুর হাত থেকে বেরিয়ে পতুর মাথার ওপর দিয়ে কলাবতীর লাফিয়ে ওঠা গ্লাভস টপকে, ব্যাক স্টপার সত্যশেখরের দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে বাউন্ডারিতে পৌঁছল। আম্পায়ার ওয়াইড সঙ্কেত জানালেন। রতু মাথা নামিয়ে রইল। পতুর সামনের দাঁত বেরিয়ে এল। সে হাসছে।
”ইডিয়ট গবেট।” ভুবন ডাক্তার দাঁত চেপে গজরাল।
পতু বাকি তিনটে বল ব্যাটে খেলে আটকাল। ইনিংস এখন ১৩৭—৪। ষোলো ওভার হয়ে গেছে। পতুর পর আর রান করার মতো কেউ নেই। রান তোলার দায়িত্ব এবার নিল খোকন, পলাশ আর অনিন্দ্যর বল থেকে তিরিশ বলে তুলল তিরিশ রান। তার ব্যক্তিগত রান দাঁড়িয়েছে একানব্বই। পতুর দশ। বকদিঘির স্কোর ১৭৭—৪। এতকাল পর্যন্ত বাৎসরিক ম্যাচে বকদিঘির কেউ সেঞ্চুরি করেনি। এবার একজন করবে।
এই সময় কলাবতীর মনে পড়ল কয়েকদিন আগে পড়া ব্র্যাডম্যানের ”ফেয়ারওয়েল টু ক্রিকেট’—এর একটা ঘটনা। ব্র্যাডম্যান ব্যাট করছেন ৯৯—এ। আর একটা রান করলেই তাঁর জীবনের একশোটা সেঞ্চুরি পূর্ণ হবে। খুব সাবধানি তখন। মনেও উদ্বেগ। সেটা বুঝে বিপক্ষ অধিনায়ক ভারতের লালা অমরনাথ একটা কূট চাল চাললেন। বাউণ্ডারির ধারে ফিল্ড করছিলেন কিষেণচাঁদ। তাঁকে ডেকে হাতে বল তুলে দিলেন। কিষেণচাঁদ বল করেন না, ব্যাটসম্যান। ব্র্যাডম্যান কখনও তার বল খেলেননি। বেশ অবাক হলেন একটু অস্বস্তিতেও পড়লেন। একদম অজানা বোলার ঠকিয়ে দিতে পারে। অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তিনি কিষেণচাঁদের তিনটি বল হুঁশিয়ার হয়ে খেলে অবশেষে মিড অন থেকে একটি রান নিয়ে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন।
কলাবতী, মনে হল ডাক্তারবাবু তো এখন অমরনাথের চালটা চালতে পারেন। মেজো দারোগাবাবু এখনও ম্যাচে বল করেননি। কী বল করেন কেউ তা জানে না, কলাবতীও জানে না। এমন এক বোলারের সামনে পড়লে খোকন ব্যানার্জি বিভ্রান্ত বোধ করে আউট হয়েও হতে পারে। পৃথিবীর কত বড় বড় ব্যাটসম্যান বাজে বলে আউট হয়েছে তার ঠিক—ঠিকানা নেই।
কলাবতী অধিনায়ককে গিয়ে বলল, ”ডাক্তারবাবু, যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলব? এবার মেজোবাবুকে দিয়ে একটা ওভার বল করান।”
”বলো কী।” ভুবন ডাক্তার যেন এই প্রথম ম্যালেরিয়ার রুগি দেখল।” একানব্বই করে সেট হয়ে গেছে, এখন তো ও মেজোবাবুকে রসগোল্লার মতো গিলে খাবে।”
”নাও খেতে পারে, একটি ফাটকা খেলে দেখুন না!”
”হুমমম। ফাটকা?” ডাক্তার চোখ বন্ধ করে কপালে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল, ”ঠিক আছে।”
মেজোবাবুকে ডেকে অধিনায়ক প্রথমেই বললেন, ”আপনি কী বল করবেন, শুনেছি স্পিন করান, লেগ না অফ?”
”দুটোই করতুম?”
”কবে করেছেন?”
”স্কুলে পড়ার সময়।”
”তা হলেই হবে, ফিল্ড কী সাজাব?”
”এগারোজনকেই বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দিন।”
”উইকেটকিপারকেও?”
”ইচ্ছে হলে তাও দিতে পারেন।”
অধিনায়ক আটজনকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে নিজে দাঁড়াল স্লিপে। খোকন অবাক হয়ে ফিল্ড সাজানো রেখে কলাবতীকে বলল, ”বোলারটা কী বল করে?”
”আমি ওকে আগে দেখিনি।” সংক্ষিপ্ত জবাব কলাবতীর।
সে স্টাম্প থেকে চার গজ পিছিয়ে দাঁড়াল। মেজোবাবু চার পা হেঁটে এসে যে বলটা করল সেটা শূন্যে উঠতে উঠতে খোকনের মাথার আট হাত ওপরে উঠে নামতে লাগল ঠিক মাথা লক্ষ্য করে। মুখ আকাশে তুলে বলে চোখ রেখে খোকন পিছোচ্ছিল। ডান পা, বাঁ পা, ডান পা, এবার গোড়ালিটা অফ স্টাম্পে লাগল এবং তাতেই একটা বেল পড়ে গেল। সবাই মুখে তুলে বল দেখছিল, কেউ লক্ষ করেনি ব্যাপারটা, শুধু কলাবতী আর লেগ আম্পায়ার ছাড়া।
”হাউজ দ্যাট।”
মেয়ে গলার সুতীক্ষ্ন চিকন স্বর শুনে মাঠের সবাই চমকে তাকাল কলাবতীর দিকে। সে দৌড়ে স্টাম্পের কাছে এসে বেলটা তুলে ধরে স্কোয়্যার লেগ আম্পায়ারকে দেখিয়ে আবার আবেদন জানাল, ”হাউজ দ্যাট।”
আম্পায়ার আঙুল তুললেন।
”ইসস।” মুখ বিকৃত করে খোকন জিভ কাটল। কলাবতীর দিকে তাকিয়ে অপ্রতিভ হাসল।
”ব্যাড লাক।” বলল কলাবতী।
হইচই পড়ে গেল মাঠ ঘিরে। হিট উইকেট আউট আটঘরা আগে কখনও দেখেনি। অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল, ”কী হল? আউট কেন? এ কেমন আউট?”
ডাক্তারবাবু ছুটে এসে মেজোবাবুর পিঠ চাপড়ে বলল, ”ফ্যান্টাস্টিক মাই বয়, ফ্যান্টাস্টিক। চণ্ডী, দেখলে তো, বোলিং চেঞ্জটা কেমন করলুম। প্রথমে ভেবেছিলুম তোমাকে বল দেব, তারপর কী মনে হল—থাক মেজোবাবুকেই দিই।”
