”হ্যাঁ, যেভাবে বলটা হাতের ওপর পড়ল তাতে তো আঙুল ভাঙারই কথা। ডাক্তারবাবুকে একবার দেখান।”
ভুবন ডাক্তার এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ”চণ্ডী কিছু হয়েছে? কীরকম দেখলে?”
নতুন ওভার শুরু বন্ধ রইল। আম্পায়াররা ওদের কাছে এসে বললেন, খেলা বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসার দরকার হলে মাঠের বাইরে যান, সময় নষ্ট হচ্ছে।
”ডাক্তারবাবু আপনি একটু দেখুন তো, মনে হচ্ছে হাড় ভেঙেছে।”
”আমি আবার দেখব কী, আমি হাড়ের ডাক্তার নই। বকদিঘির প্যাভিলিয়নে আছে অমল বিশ্বাস, হাড়ের ডাক্তার। সতুবাবু, আপনি ওর কাছে যান।”
সত্যশেখর দু’ হাতের আঙুল বারবার মুঠো করে, আঙুল মটকে বলল, ”বকদিঘির ডাক্তারকে দিয়ে দেখালে আপনার চেম্বার কিন্তু পটল হালদার আস্ত রাখবে না, সেটাই কি চান?”
চমকে উঠে ডাক্তার ভুবন রায় বলল, ”না না না, আপনার হাত ঠিক আছে, কাউকে দেখাতে হবে না, বরং উইকেটকিপারের পিছনে চলে যান। আপনার ভাইঝি তো বলটল ফসকাচ্ছে না, আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।”
পনেরো ওভার সম্পূর্ণ হতে হল জলপান বিরতি। পনেরো ওভারে বকদিঘি দুই উইকেটে ১৩৭। ওভার পিছু রান গড়ে নয় দশমিক এক চার। খোকন একষট্টি, গদাই পঁয়তাল্লিশ। বাই শূন্য, ওয়াইড ষোলো, নো বল পনেরো।
স্কোরবোর্ড দেখে অধিনায়ক তার কম্পাউণ্ডারকে বললেন, ”চণ্ডী, মনে হচ্ছে রানরেটটা ঠিকই আছে। গতবার পনেরো ওভারে কত ছিল মনে আছে?”
”এগারো পয়েন্ট টোয়েন্টি।”
”তিরিশ ওভারে কত হবে মনে হয়?”
চণ্ডী চোখ বন্ধ করে ভেবে বলল, ”এই খোকন ব্যানার্জি আউট না হলে ত্রিশ ওভারে তিনশোও হতে পারে।”
”আউট হলে?”
”দেড়শোও হতে পারে, একশো সত্তরও হতে পারে।”
”তোমার এখনও দুটো ওভার বাকি, স্লগ ওভারের জন্য।”
সত্যশেখর তখন কলাবতীকে বলছে, ”কালু, একটা ক্যাচ ধরে হাততালি পেলুম, আর একটা ক্যাচ ফেলে গালাগালি। প্রথমটার কথা কয়েক মিনিটেই বেমালুম ভুলে গেল!”
কাকার চোখে বিস্ময় দেখে কলাবতী বলল, ”তুমি তিনটে সিক্সার মারো, দেখবে হাততালি পড়বে। গালাগালি আর হাততালি দেওয়ার জন্যই এরা মাঠে আসে।”
”তা তো বুঝলাম কিন্তু এই খোকন তো বোলার, এত ভাল ব্যাট করছে কী করে বল তো?”
”ওকে ইন্ডিয়া টিমে ঢুকিয়ে দাও, দেখবে ব্যাট করতে ভুলে গেছে।”
জলপানের পরই বকদিঘি ১৩৭—৩ হয়ে গেল। গদাই পুল করল রতুর ফুলটস, ব্যাটের কানায় লেগে শর্ট থার্ডম্যানে ক্যাচ উঠল। সেখানে লোক নেই। কলাবতী তীরবেগে প্রায় কুড়ি মিটার ছুটে দু’ হাত বাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর বল ধরা একটা হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল ”হাউজাট।”
বাকরহিত হয়ে রইল অবাক মাঠ। কত বছর ধরে এই বাৎসরিক ম্যাচ হচ্ছে, কোনও উইকেটকিপার এই মাঠে এইভাবে ক্যাচ ধরেনি। একটা বাই রানও স্কোরবোর্ডে ওঠেনি। বকদিঘির আম্পায়ার বোলার প্রান্তে। দর্শকরা রুদ্ধশ্বাস।
ক্যাচটা ঠিক ধরেছে তো? জমিতে পড়ার পর তুলে নেয়নি তো? বকদিঘির আম্পায়ার ঠিকঠাক বিচার করবে তো? আটঘরার সমর্থকদের মনে অজস্র প্রশ্ন। গদাই একদৃষ্টে আম্পায়ারের দিকে তাকিয়ে। কলাবতী হাতে বলটা নিয়ে লোফালুফি করছে নির্বিকার মুখে, সে নিশ্চিত পরিচ্ছন্নভাবেই ক্যাচটা নিয়েছে।
মাথা ঝাঁকিয়ে আম্পায়ার আঙুল তুললেন।
উল্লাসে ফেটে পড়ল মাঠের অর্ধেক দর্শক। প্রথমেই ছুটে এল অধিনায়ক। কলাবতীর পিঠ চাপড়ে বলল, ”ফ্যান্টাস্টিক ক্যাচ মাই বয়, অসাধারণ।”
চণ্ডী বলল, ”ডাক্তারবাবু, বয় না, গার্ল।”
”ইয়েস। ইয়েস গার্ল, মাই গার্ল।”
সত্যশেখর ফিসফিস করে বলল, ”কালু, আমি ইন্সপায়ারড। সিংহিদের মান বাঁচালি।”
”কাকা মনে রেখো, জিতব বলে দাদু চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন।”
রাজশেখর চোখ রেখেছিলেন সোফায় বসা পটল হালদারের দিকে। তাকে লাফিয়ে উঠতে দেখে তিনি চাপা গর্জন করলেন, ”পটল! পাঞ্জাবি খুলবে না।”
পটল হালদার করুণ মুখে বলল, ”বড়বাবু, এমন একটা ক্যাচ। একটু সেলিব্রেট করব না? আটঘরা তো একটা নতুন জিনিস দেখল।”
”নতুন জিনিসটা তোমার ভোটের সময় কাজে লাগিয়ো, তবে এখন নয়।”
অপুর মা পাশে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ”লোকটা চলে এল যে, কালুদিদি কি ওকে মোর করল?”
”করল।”
”হ্যাঁ কত্তাবাবা, ইস্কুল থেকে ফিরলে শকুন্তলা ঠিকঠাক জলখাবার দেয় তো কালুদিকে?”
”দিলে কী হবে, খায় না তো। তুমি থাকলে তবু আচার, হজমি, ফুচকা এসব বন্ধ থাকে।” রাজশেখর আড়চোখে অপুর মা’র মুখের দিকে তাকালেন। মুখটা থমথমে হয়ে যেতে দেখে বললেন, ”তুমি নেই তাই কালু সাপের পাঁচ পা দেখেছে।”
অপুর মা হাতের থলিটা তুলে বলল, ”যাই একবার। সাপের দশ পা দেখাব।”
নতুন ব্যাটসম্যান অতুল মুখুজ্যে মাঠে নেমে খোকনকে দুটো কথা বলে ক্রিজে এসে গার্ড নিল। সাতবার বাৎসরিক ম্যাচ খেলেছে। রীতিমত প্রবীণ। সাতবারে সর্বোচ্চচ রান তেত্রিশ। এবার তারই অধিনায়ক হওযার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম মিলেনিয়াম ট্রফিটা হাতে তুলে নেওয়ার লোভ সংবরণ করতে না পেরে পতু এই বছরের ম্যাচে অধিনায়ক পদ থেকে নিজেকে সরায়নি। রতুর এই বলটাও জোরের ওপর এবং ফুলটস। অতুল প্রথম বলটাই আচমকা পেটের সামনে দেখে ব্যাট পেতে দিল। বল গেল সোজা রতুর হাতে। চটপটে ছেলে, ক্যাচ ধরেই লাফিয়ে উঠল।
দু’হাত তুলে ছুটে গেল ডাক্তার।
”ফ্যান্টাস্টিক মাই বয়, ফান্টাস্টিক।” বলেই চণ্ডীর দিকে তাকাল। চণ্ডী অনুমোদন জানিয়ে মাথা কাত করল। ‘দু’ বলে দুটো উইকেট। এবার একটা হ্যাটট্রিকের বল দাও।”
