”ওরে এ হল সিংহের থাবা। না ধরলে তো পেট ফুটো হয়ে যেত। ছেলেটা মেরেছে কিন্তু বেশ জোরে। চেটো দুটো জ্বলছে।”
অপুর মা বিভ্রান্ত। মাঠে ছোটকত্তাকে ডাক্তারবাবু জড়িয়ে ধরল। সবাই হাত ধরে ঝাঁকুনি দিল, কিছু একটা নিশ্চয় হয়েছে। ”কত্তাবাবা, হল কী?”
”সতু বল ধরে নিয়ে একজনকে মোর করে দিয়েছে। এবার আর একজন যাবে তার জায়গায়।” অপুর মা যাতে বুঝতে পারে রাজশেখর সেই ভাষায় বললেন।
এবার ব্যাট হাতে নামল রাহুল। মাইনাস নয় পাওয়ারের চশমা, মাধ্যমিকে উনচল্লিশ স্থান পেয়েছে। প্রথম বলেই তাদের একমাত্র ব্যাটিং ভরসার প্রত্যাবর্তনে যেন তার ঘাড়ে বিপর্যয় রোখার দায়িত্ব পড়েছে, এটা তার মুখ দেখে কলাবতীর মনে হল। সে রাহুলকে শুনিয়ে সত্যশেখরকে বলল, ”কাকা একটু এগিয়ে এসো, বল লাফিয়ে উঠলে তুমি ক্যাচ পাবে।”
সত্যশেখর এক পা এগিয়ে, ভুঁড়ি যতটা ঝুঁকতে দেয় ততটা ঝুঁকে দু’ হাত জড়ো করে ব্যাটসম্যানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রাহুলের কপালে ভাঁজ পড়ল। চণ্ডী বল করল। অফ স্টাম্পের বাইরে শটপিচ। রাহুল ব্যাট চালাল, বল কানায় লেগে লাট্টুর মতো ঘুরতে ঘুরতে ডাক্তারের কাঁধের পাশ দিয়ে থার্ডম্যান বাউন্ডারির দিকে গেল। রান নিতে দৌড়েছে রাহুল। নন স্ট্রাইকার গদাই জানা ”নো, নো” বলে চিৎকার করছে। পিচের মাঝ বরাবর থেকে রাহুল যখন ফিরে আসার জন্য ছুটল তখন ডিপ থার্ডম্যান পলাশের ছোড়া বল কলাবতীর হাতে জমা পড়তে চলেছে।
রানআউট হয়ে ফিরে আসার আগে রাহুল এগিয়ে গেল গদাইয়ের দিকে। ”এটা কী হল?”
”রান ছিল না, দৌড়লে কেন?” গদাই খিঁচিয়ে উঠল।
”আলবাত রান ছিল। ইচ্ছে করে আমাকে আউট করলেন।” গজগজ করতে করতে রাহুল মাঠ ছাড়ল। নামল রঞ্জি ট্রফি খেলা বোলার ইস্টবেঙ্গলের খোকন ব্যানার্জি। হাঁটা, ক্রিজে দাঁড়ানো, গার্ড নেওয়া সবকিছুই বুঝিয়ে দিচ্ছিল সে সত্যিকারের ক্রিকেটার, কলাবতীর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ”বাবুদার কাছে তোমার কথা শুনেছি। রান আউটটা ভালই করেছ।”
”ওর কাছে আমিও আপনার কথা শুনেছি।”
ওভারের বাকি বলগুলো খোকন ছেড়ে দিল। প্রথম দুই বলেই দু’জন আউট, স্কোর বোর্ডে রান নেই। সে উইকেটে থিতু হতে মন দিল। আটঘরার দ্বিতীয় বোলার রত্নাকর বা রতু। এটা তার জীবনের প্রথম বড় ম্যাচ। ঘরের লোকের চোখে পড়ার জন্য সে উৎসাহিত হয়ে সাধ্যের অতিরিক্ত জোরে বল করতে শুরু করল, ফলে একটি বলও ঠিক জায়গায় পড়ল না। গদাই তিনটি বাউন্ডারি সংগ্রহ করে নিল মিড উইকেট থেকে।
ওভার শেষে অধিনায়ক সত্যশেখরকে বলল, ”আপনি আর এখান থেকে কী করবেন, বল তো সব যাচ্ছে ওইদিকে, আপনি বরং ওইদিকের বাউন্ডারির কাছে গিয়ে দাঁড়ান। ছোটাছুটি করতে না পারেন ক্যাচ তো ধরতে পারবেন।”
ভুবন ডাক্তারের দেখানো আঙুলের নির্দেশ সত্যশেখর ‘ওইদিকের’ অর্থাৎ স্কোয়্যার লেগ বাউন্ডারির ধারে গিয়ে দাঁড়াল। চণ্ডীর বল গ্লান্স করে ফাইন লেগ বাউন্ডারিতে পাঠাল খোকন। সত্যশেখর ছোটার মতো একটা চেষ্টা করে দাঁড়িয়ে পড়ল। গ্যালারিতে বিদ্রূপাত্মক ”ধুসসসস” ধ্বনি উঠল। শুধু একটা তীক্ষ্নস্বর শোনা গেল, ”ওরে এটাকে দড়ি বেঁধে মাঠে চরাতে নিয়ে যা।”
সত্যশেখর শুনল এবং লাল হয়ে উঠল তার মুখ, মনে মনে বলল, বলবেই তো নির্ঘাত বকদিঘির লোক। ঠিক আছে এবার বল এলে দৌড়ব। চণ্ডীর পরের বলে সোজা ড্রাইভ এবং চার, হাঁফ ছাড়ল সত্যশেখর, তার দিকে বল না আসায়। লং অফে আর লং অনে অ্যাকাডেমির দুটো ছেলে, তাদের মাঝ দিয়ে বলটা গেছে।
সত্যশেখর প্রার্থনা করল খোকন সব বল সিধে সিধে কি অফ সাইডে যেন মারে। পরের বল খোকন কাট করল থার্ডম্যানে, দুটো রান পেল। সত্যশেখর আকাশে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ। পরের বল কভারে ঠেলে ”রান” বলেই খোকন সিঙ্গল নিতে দৌড়ল। মেজোবাবু ছুটে গিয়ে বল তুলতে গিয়ে ফসকাল। গ্যালারির দক্ষিণ দিকে ”ধুসসসস” শুনেই মেজোবাবু কটমট করে তাকাতেই দক্ষিণদিক বোবা হয়ে গেল।
চণ্ডীর শেষ বলটা খেলতে তৈরি গদাই জানা। অধিনায়ক হাত নেড়ে সত্যশেখরকে পিছিয়ে বাউন্ডারি লাইনের ধার ঘেঁষে দাঁড়াতে নির্দেশ দিল। সবাই জানে বাঁ দিকে ছাড়া গদাই বল মারে না বা মারতে পারে না। চণ্ডীর বলটার লেংথ ও লাইন নিখুঁত ছিল, গদাই বাঁ হাঁটু মুড়ে নিচু হয়ে ঝুঁকে ঝাঁটা চালাবার মতো ব্যাট চালাল। আশ্চর্যের ব্যাপার, ব্যাটটা বলের সঙ্গে লেগেও গেল।
উঁচু হয়ে রামধনুর মতো উঠে বাঁকা হয়ে বলটা নামছে। সত্যশেখর প্রথমে ভাবল বলটা তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যাবে। তারপরই মনে হল যাবে না। গ্যালারি থেকে রব উঠল, ”ক্যাচ ক্যাচ, ধরুন ধরুন, ”বলের অবতরণ পথ দেখে তার বুক হিম হয়ে গেল—সোজা তার মাথা লক্ষ্য করে নামছে। ভাবল, এক পা এগিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেব না ধরার জন্য হাত পাতব! ভাবা শেষ করার আগেই তাকে মাথার ওপর দুটি তালু রেখে মাথাটাকে বাঁচানোর নির্দেশ পাঠাল মস্তিষ্ক।
বল তালুর ওপর পড়ে ছিটকে বাউণ্ডারি লাইন টপকে গেল। গ্যালারিতে উঠল হাহাকার। সত্যশেখর বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে। চণ্ডী এগিয়ে এসে বলল, ”আপনার বোধ হয় আঙুলে লেগেছে, ভেঙেও যেতে পারে।”
সত্যশেখর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আপনি বলছেন ভেঙেছে?”
