মলয়ার গলায় ঝুলছে ক্যামেরা, সে দাঁড়িয়ে উঠে ক্যামেরা চোখে লাগিয়ে বলল, ‘সতু, তুমি ওইভাবে বাবার দিকে ধরে থাকো…হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। আর একটা।”
পটল হালদার তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সত্যশেখরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ট্রফির কাঠের নীচে হাত বাড়িয়ে দিল। মলয়ার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ”আপনি সরে দাঁড়ান তো আমাকে ছবি তুলতে দিন।”
”বাঃ বেশ হয়েছে।” হরিশঙ্কর মাথা নাড়লেন। ”এবার এটা চারধারে ঘুরিয়ে সবাইকে দেখাও। পতু কোথায়? এই যে পতু, তুমি আর পটল ট্রফিটার দু’দিক ধরে একচক্কর ঘুরিয়ে আনো।”
সেই সময় মাঠের ওধার থেকে ভেসে এল নারীকণ্ঠের তীব্র স্বর, ”ছোটকত্তা, আমি এখানে।”
সত্যশেখর সচকিত হয়ে তাকাল এবং দেখল মাথায় ঘোমটা, সাদা থান পরা অপুর মা গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে হাত তুলে নাড়ছে। সত্যশেখর হাতছানি দিয়ে ডাকতেই অপুর মা প্রায় হুড়মুড় করে ভূকম্পে ভেঙেপড়া বাড়ির মতো গ্যালারি থেকে মাঠে নেমে পিচের ওপর দিয়ে হেঁটে এপারে চলে এল। হাতে একটা পেটমোটা পলিথিনের থলি।
”ম্যালেরিয়া সেরে গেছে?” সত্যশেখর দ্রুত এগিয়ে জিজ্ঞেস করল।
অপুর মা মাথা নাড়ল, ”একদম। ডাক্তারবাবু ধন্বন্তরী।”
”অপুর পা?”
”সে তো ওই মাচায় বসে রয়েছে খেলা দেখবে বলে। হেঁটেই তো এল।”
পরমেশকে ডেকে সত্যশেখর একটা চেয়ার আনিয়ে সোফার ধারে পেতে অপুর মাকে বলল, ”এটায় বোসো।”
টস করতে গেল ভুবন ডাক্তার আর পতু মুখুজ্যে। ফিরে এসে হাসিমুখে ডাক্তার বলল, ”জিতেছি, পতুবাবুকে বললুম আমরা আপনাদের রান তাড়া করব। কলাবতী রেডি হও। রতু, পলাশ অনির্বাণ, মেজোবাবু ঠিক আমার পেছনে লাইন দিয়ে মাঠে নামবেন।”
সত্যশেখর গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, ”ডাক্তারবাবু, ব্র্যাডম্যানের বইটা এনেছেন?”
”কেন, কেন, আনব কেন? ওটা তো শেখার সময় দরকার হয়।” ভুবন ডাক্তার বলল, ”এখন শেখা নয়, খেলতে যাচ্ছি। আসুন, নামা যাক।”
দুই আম্পায়ার একজন প্রশান্ত রায় ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, অন্যজন নন্দ ভটচাজ রোগা ছ’ফুট, সি এ বি—র প্রাক্তন আম্পায়ার, অবসর নিয়েছেন চার বছর আগে। দু’জনের দাবি, তাঁদের ক্লাবক্রিকেট খেলানোর মিলিত সংখ্যা আড়াই হাজার। ক্রিকেট আইন গুলে খেয়েছেন দু’জনেই।
”প্লে।”
ঘোরকৃষ্ণবর্ণ খেলা আরম্ভের অনুমতি দিলেন। বোলিং মার্কে চণ্ডী কম্পাউণ্ডার। মালকোঁচা দিয়ে ধুতিপরা নয়। মিলেনিয়ামের মান রাখতে কলকাতা থেকে রেডিমেড সাদা ট্রাউজার্স কিনে এনেছে। কোমরটা ঢলঢল করায় ছেলের বেল্ট দিয়ে টাইট করে নিয়েছে। নতুন বলটা ঊরুতে ঘষা বন্ধ করে ডেলিভারি দিতে ছুটল।
স্ট্রাইকার মোহনবাগানের মদন গুহ। বকদিঘিতে দিদির শ্বশুরবাড়ি। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে ছিপ নিয়ে আসে মাছ ধরতে। পতু মুখুজ্যে বলে রেখেছে গত বছর এ এন ঘোষ, পি সেন ট্রফিতে আর লিগে মদন গুহর পাঁচটা সেঞ্চুরি হয়েছে, আটঘরার বোলিং ছিঁড়ে খাবে। ওর দিদির শ্বশুর ও শাশুড়িকে সোফায় বসিয়েছে পতু বিশেষ খাতির জানাতে।
উইকেটের পিছনে কলাবতী। চণ্ডীর বোলিং সে দেখেছে অ্যাকাডেমির নেটে। চার গজ পিছিয়ে দাঁড়াল। আটঘরার একমাত্র জোরে বেলার চণ্ডী। সারা মাঠ কৌতূহলে তাকিয়ে মেয়ে উইকেটকিপারের দিকে। পটল হালদার পোস্টার মেরে জানিয়েছে : ”আসুন? দেখুন!! পুরুষদের ম্যাচে মহিলা উইকেটকিপার। বিশ্বে এই প্রথম।” ভেঙে পড়েছে মেয়েদের ভিড় আটঘরার নাতনিকে দেখতে এবং কিছুটা হতাশ তার চুল দেখে, একদম ছেলেদের মতো করে কাটা!
চণ্ডী ছুটে আসছে। স্লিপে ভুবন ডাক্তার, মেজো দারোগা, বিশু পা ফাঁক করে ঝুঁকে পড়ল। সত্যশেখর বলেছিল, ”এমন জায়গায় রাখুন যেখানে আমাকে ছুটতে না হয়। ”অধিনায়ক তাকে ব্যাটের সামনে সিলি মিড অফের জায়গা থেকে তিন গজ পিছনে দাঁড়াতে বলে জানায়, ‘এই উইকেটে বল লাফিয়ে উঠবেই, মুখের কাছে ব্যাট তুলবেই, আপনি লোপ্পাই ক্যাচ পেয়ে যাবেন।”
বল ডেলিভারি দিল চণ্ডী। অফ স্টাম্পের ওপর একটু শর্ট পিচ বল। মদন গুহ ব্যাট তুলল পিছনে। কলাবতী উবু হয়ে বসা থেকে উঠতে উঠতে ধরে নিল প্রচণ্ড একটা ড্রাইভে বল লং অফে এবার যাচ্ছে। মদন গুহ ড্রাইভ করল, নিখুঁত ফলো থ্রু। চণ্ডীর বল পিচ পড়ে একটু উঠে যাওয়ায় ড্রাইভটাও একটু উঠে গেল। বিদ্যুৎগতিতে বলটা সোজা সত্যশেখরের তলপেট লক্ষ্য করে যাচ্ছে। কলাবতী চোখ বন্ধ করে ফেলল আতঙ্কে। সত্যশেখর দেখল গোলার মতো বলটা তার পেটের দিকে আসছে, আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তিবশে সে চোখ বুজে দু’হাত পাতল পেটের সামনে। ফুটো হয়ে গেল বোধ হয়।
অবিশ্বাসে বিস্ফারিত চোখ মদন গুহর, কলাবতীর। সারা মাঠ নিস্তব্ধ, আম্পায়ারের আঙুল তোলা আকাশের দিকে।
”মিলেনিয়ামের সেরা ক্যাচ। ফ্যান্টাস্টিক…ফ্যান্টাস্টিক।” ঘোষণা করে ডাক্তারবাবু ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল সত্যশেখরকে। পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, ”ঠিক জায়গায় দাঁড় করিয়েছিলুম কি না।”
মাথা নাড়তে নাড়তে মদন গুহ ফিরল। পটল হালদার পাঞ্জাবি খুলে মাঠে ঢুকে বনবন করে মাথার উপর ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করছে, ”ছিঁড়ে খাবে? কে কাকে ছেঁড়ে সেটা তো দেখাই গেল।”
”পটল, এটা ফুটবল মাঠ নয়।” রাজশেখরের জলদমন্দ্র স্বর হুঁশ ফেরাল পটল হালদারের।
কলাবতী এগিয়ে এসে বলল, ”কাকা, ধরলে কী করে? হাত দুটো ঠিক আছে তো?”
