”বেশ করেছ। আমাদের আম্পায়ার কই?” রাজশেখর ব্যস্ত হয়ে বললেন।
”উনি বাইরে সোফায় বসে আছেন। কিন্তু মুশকিল হয়েছে বকদিঘির আম্পায়ার এখনও এসে পৌঁছননি। পতু মুখুজ্যে বলল, যদি না এসে পৌঁছয় তা হলে হরিশ কর্মকারকে ওরা নামাবে।”
”হরিশ!” আঁতকে উঠলেন রাজশেখর। ”একটা অশিক্ষিত যাত্রার প্রম্পটার, যে ক্রিকেট আইনের বই পড়েনি, সেবার প্রথম ওভারেই চারটে এল বি ডবলু দিয়েছিল। না না, হরিশ ফরিশ চলবে না, সি এ বি—র পাশ করা আম্পায়ার না হলে আটঘরা মাঠে নামবে না, পতুকে এটা জানিয়ে দাও, আর মাইকে বলে দাও খবরটা।”
এক মিনিট পরে মাইকে নন্তুর গলা শোনা গেল। ”অনুগ্রহ করে শুনুন। বকদিঘির সঙ্গে আটঘরার মৌখিক চুক্তি হয়েছিল মিলেনিয়াম ম্যাচ নিরপেক্ষ সি এ বি আম্পায়ারদের দিয়ে খেলানো হবে। আমরা আনব একজনকে, ওঁরা আনবেন অন্যজনকে। আমাদের আম্পায়ার এসে গেছেন কিন্তু ওঁদের আম্পায়ার আসেননি। আমরা স্থির করেছি দু’জন নিরপেক্ষ আম্পায়ার দিয়ে ম্যাচ না খেলা হলে এই ম্যাচ আমরা খেলব না। আশা করি আপনারা আমাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন। ধন্যবাদ।”
নন্তুর ঘোষণা শেষ হওয়ামাত্র হাজার পাঁচেক কণ্ঠে গর্জন উঠল, ”সমর্থন, সমর্থন।…নিরপেক্ষ আম্পায়ার দু’দিকে চাই, দু’দিকে চাই… শেম শেম বকদিঘি।”
এবার মাইকে ভেসে উঠল পটল হালদারের কণ্ঠস্বর। ”আটঘরার মা—বোন এবং গুরুজনেরা, ভদ্রমহোয়দরা, আটঘরার প্রতি বকদিঘির এই হীন আচরণ, ম্যাচ বানচাল করার এই চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ করুন আপনারা। আপনাদের সঙ্গে থাকবে আটঘরা গ্রাম পঞ্চায়েত এবং আমিও…।”
রাজশেখর ভীত স্বরে বললেন, ”নন্তু, এ তো পটলের গলা, কোথায় ছিল এতক্ষণ?”
”দক্ষিণ দিকে গ্যালারির বাঁশের কাঠামোর বাঁশ আলগা হয়ে তিনটে তক্তা পড়ে গেছল। পটলদা ঘরামি এনে ঠিক করছিল।”
রাজশেখর দ্রুত প্যাভিলিয়ন থেকে বেরোলেন। দশ গজ দূরে মাঠের সীমানা, সেখানে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ধুতি—পাঞ্জাবি পরা পটল হালদার। রাজশেখর গিয়ে পাঞ্জাবির কোনা ধরে টানলেন, ”পটল, ভোটের এখনও অনেক দেরি, হীন আচরণের কথা ভোটের বক্তৃতায় বোলো, এখন নয়। চলে এসো।”
পটলকে নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে এসে রাজশেখর দেখলেন কার্টন থেকে ট্রফিটা বার করে টেবলে রাখা। যারা সেখানে ছিল তারা ঘিরে রয়েছে টেবল। চোখ বিস্ফার করে দেখছে।
”দারুণ জ্যাঠামশাই, দারুণ,” নন্তু বলল, অন্যরা সায় দিয়ে মাথা নাড়ল।
পটল হালদার কুঁজো হয়ে লেখাটা পড়ে ম্লানস্বরে বলল, ”শুধু একটাই খুঁত, বকদিঘির নামটা আগে।”
অধিনায়ক ভুবন ডাক্তার ঢুকল। ”সবাই রেডি তো? টস করতে যাব। পরমেশ প্লেয়ার্স লিস্টটা দাও। বকুর কাঁধ এখনও খচখচ করছে, ও খেলতে পারবে না। তার বদলে কলাবতী কিপ করবে। ভাল কথা, টস জিতলে কী করব?”
ডাক্তারবাবু সবার মুখ নিরীক্ষণ করে কিছু একটা বুঝে নিয়ে বলল, ”ঠিক আছে, ফিল্ড করব। আমাদের ভাল রান চেসার আছে। বোলিং ওপেন করবে কে? চণ্ডী আর রতুই করুক। ওয়ান চেঞ্জ অনিন্দ্য, তারপর মেজোবাবু।”
পরমেশ প্লেয়ার্স লিস্ট ডাক্তারবাবুর হাতে ধরিয়ে দিল। তিনি কলম দিয়ে পরপর বোলারদের নামের পাশে সংখ্যা বসালেন।
”ভাল কথা, পরমেশ, খেলা কত ওভারের বল তো? চল্লিশ না পঞ্চাশ ওভারের?”
”ত্রিশ ওভারের, ছ’ ওভারের বেশি কেউ বল করতে পারবে না।” পরমেশ বলল, ”ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশনস বলে কিছু নেই।”
কলাবতী পাশে দাঁড়ানো কাকাকে ফিসফিসিয়ে বলল, ”দারুণ ক্যাপ্টেন। কোনও খবরই রাখেন না।”
নন্তু হাঁফাতে হাঁফাতে হাজির হল। ”এসে গেছে, ওদের আম্পায়ার এসে গেছে।”
ট্রফিটা পটল হালদার দু’ হাতে তুলে প্যাভিলিয়ন থেকে বেরিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছিল। রাজশেখর বলে উঠলেন, ”ও কী! ওটা নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?”
”মাঠের চারধারে ঘুরিয়ে পাবলিককে দেখাব তারপর একটা টেবলের ওপর রাখব। যতক্ষণ খেলা চলবে, লোকে দেখবে।”
রাজশেখর বললেন, ”হরি এসেছে?”
”হ্যাঁ, এইমাত্র এলেন।” নন্তু বলল, ”উনি আসার সঙ্গে সঙ্গে আম্পায়ারও এলেন।”
”ট্রফিটা প্রথমে হরির কাছে নিয়ে গিয়ে দেখাও। তারপর ঘোরাতে হয় ঘোরাও। সতু, তুই হাতে করে নিয়ে যা।”
সত্যশেখর ট্রফিটা তুলে নিয়ে প্যাভিলিয়ন থেকে বেরোল, সঙ্গে পটল হালদার। আটঘরার পাশেই হলুদ রঙের কাপড়ে ঘেরা বকদিঘির প্যাভিলিয়ন। বাইরে আটঘরার মতো দুটো লম্বা সোফা। তাতে বসে ছিল মলয়া, হরিশঙ্কর এবং বকদিঘির গণ্যমান্য কয়েকজন। তাদের পিছনে চেয়ারে ধোপদুরস্ত পোশাকে কয়েকটি পরিবার। মাঠের চারদিক পাঁচ ফুট উঁচু বাঁশের ওপর তক্তা পেতে গ্যালারি। বাউন্ডারি লাইন ঘিরে দুই গ্রামের বাচ্চচা ছেলেরা এবং কিশোররা বসে। পটল হালদার স্লিপ বিলি করে খেলা দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছে শুধু তাদেরই, যারা তার ভোটার বা সম্ভাব্য ভোটার।
দুই প্যাভিলিয়নের উলটো দিকে স্কোরবোর্ড। উচ্চচতায় ও প্রস্থে আট ফুট করে। গতবার মাপটা ছিল ছ’ফুট। স্কোরবোর্ডের নীচে স্কোরারদের জন্য টেবল। মাঠের গ্যালারি ঘিরে নীল—হলুদ কাগজের শিকলের মালা। সৌহার্দ্যের প্রতীক বন্ধন।
ঝকঝকে সাদা ট্রফি হাতে সত্যশেখরকে দেখামাত্র মাঠের অধৈর্য গুঞ্জন থেমে গেল। সে হরিশঙ্করের সামনে এসে দু’হাত বাড়িয়ে ট্রফিটা সামনে ধরে বলল, ”হরিকাকা দেখুন, কেমন হয়েছে।”
