গম্ভীর মুখে শুনে সত্যশেখর জিজ্ঞেস করল, ”তোমার নাম কী?”
”হান্নান শেখ। কলকাতায় ছুতোর মিস্তিরির কাজ করি।”
অমর পাড়ুই নামক লোকটি এবার মুখ খুলল, ”হুজুর, শেখ পাড়ার গোরু—ছাগল এসে আমাদের বাগান, খেতের আনাজপাতি ধ্বংস করে যায় নিয়মিত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য আমরা এসব সহ্য করে গেছি। কিন্তু ব্যাপারটা এখন চরমে পৌঁছেছে। আপনি একটা বিহিত করুন।”
”সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি” শুনেই সত্যশেখর বুঝল অমর মিটিং—মিছিল করা লোক। সে বলল, ”এসব ব্যাপারের বিহিত রাস্তায় হয় না। কাল কোর্টে এসো, আমি তো সব দেখলুম মনে হচ্ছে সেকশান ওয়ান ফর্টিফোর জারি করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষ আমার জেলায় আমি হতে দেব না। এখন পথ ছাড়ো। দেখো বাস লরি ট্রেকার রিকশা দাঁড়িয়ে গেছে। কাল অবশ্যই কোর্টে আসবে, আমি নিজে হেয়ারিং করব। যাওও।” হুঙ্কার দিয়ে সত্যশেখর কথা শেষ করে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। ভিড় দু’ভাগ হয়ে সরে রাস্তা ছেড়ে দিল। সত্যশেখর নির্বিঘ্নে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখল অমর ও হান্নান নমস্কার করছে।
”সতু কী বললি অতক্ষণ ধরে, ব্যাপারটা কী?”
সত্যশেখর সংক্ষেপে যা কথাবার্তা হয়েছে বলল, শুনে রাজশেকর অট্টহাস্য করলেন। কলাবতী লেবুর দুটো কোয়া কাকার মুখে ঢুকিয়ে দিল। সত্যশেখর বললে, ”গল্পটা তোর বড়দিকে বলিস, ও তো সবাইকে বলে বেড়ায় আমার বুদ্ধি নেই।”
”আরও বলেন, তোমার নাকি ফিটনেস নেই। আজ দেখিয়ে দিয়ো ফিটনেস কাকে বলে।”
তারকেশ্বর থেকে আটঘরার কাছাকাছি মসৃণভাবে তারা চলে গেল। মাইল দুয়েক আগে তারা সামান্য ভিড় পেল। ভ্যানরিকশায়, সাইকেলে, হেঁটে অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে, প্রৌঢ়, যুবক চলেছে আটঘরার দিকে।
”দাদু, সার বেঁধে এত লোক যাচ্ছে কোথায় বল তো?”
রাজশেখর সামনের সিটে সত্যশেখরের পাশে বসে। আঙুল তুলে রাস্তার উপর আড়াআড়ি টাঙানো একটা ফেস্টুন দেখালেন:
”মিলেনিয়াম ম্যাচ! মিলেনিয়াম ম্যাচ!!
সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট সংগ্রাম
আটঘরা বনাম বকদিঘি, তৎসহ মিলেনিয়াম মেলা
দলে দলে আসুন। আপনার প্রিয় আটঘরাকে সমর্থন করুন।”
রাজশেখর বললে, ”এবার বুঝেছিস।’
”বুঝেছি।” কলাবতী মজা পেয়ে জানলা দিয়ে তাকাল। রাস্তার ধারে একটা তালগাছের গায়ে লাল কালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা বিজ্ঞাপন:
সুলভে রসনার সেরা স্বাদ নিন। এই প্রথম
কলকাতার নামী হোয়াং হো চিনা রেস্টুরেন্ট আটঘরায়
পাবেন নানাবিধ চাউমিন
চিকেন! প্রণ! ভেজিটেবল!
কলাবতী বলল, ”কাকা, খাবে নাকি হোয়াং হো রেস্টুরেন্টের চাউমিন?”
”খাই আর দুঃখের নদীতে ভেসে যাই! রক্ষে করো।”
রাজশেখর বললেন, ”ছোটবেলায় রথের মেলা এখানে দেখেছি। এ তো দেখি সেইরকম ভিড়। সতু একটু দেখেশুনে চালা।”
আটঘরা গ্রামের চৌহদ্দিতে ঢোকামাত্র ঝকঝকে গাড়ি দেখে কিছু কিশোর ও তরুণ গাড়ির সামনে হাত তুলে দাঁড়াল।
সত্যশেখরকে একজন বলল, ”আপনি তো সতু সিংহি। সেবার সেঞ্চুরি করেছিলেন। আজও কিন্তু করা চাই।”
সঙ্গে সঙ্গে এক কিশোর বলল, ”না করলে কিন্তু এই গাড়ি এখানেই জ্বালিয়ে দোব।’
”নিশ্চয় করব, কোনটে চাই, সিঙ্গল না ডাবল?” সত্যশেখর উদার কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি দিল। ছেলেটি থতোমতো হয়ে বলল, ”একদিনের খেলায় ডবল করা শক্ত। সিঙ্গল হলেই চলবে।”
”ঠিক আছে, এখন পথ ছাড়ো।’
.
গাড়ি একটু এগোতেই কলাবতী আতঙ্কিত কথায় বলল, ”কাকা, কী বললে, ছেলেটাকে?”
”না বললে কি রাস্তা ছাড়ত? এরা যা চাইবে তক্ষুনি তাতেই রাজি হয়ে যেতে হয়। এটাও তোর বড়দিকে বলিস।”
মাঠের ধারে গাড়ি পৌঁছতেই বুকে নীল ব্যাজ আঁটা একটি লোক শশব্যস্তে এগিয়ে এল। ”গাড়ি রাখার জায়গা ওদিকটায়।”
তার নির্দেশমতো সত্যশেখর বাঁশ দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায় গাড়ি রেখে দরজায় চাবি দিল। অ্যামপ্লিফায়ারে সানাই বাজছে। রাজশেখর বললেন, ”এরা তো দেখছি এলাহি ব্যাপার করেছে। আগের থেকেও জাঁকজমকটা, বেশি।”
পরমেশ এগিয়ে এল। ”জ্যাঠামশাই, এদিকে প্যাভিলিয়ন। আসুন।”
শুনে তিনজন মুখ চাওয়া—চাওয়ি করল। নীল কাপড়ে ঘেরা একটা হলঘরের মতো জায়গা। একধারে লম্বা একটা টেবল, তাতে সাদা চাদর পাতা। তার উপর দুটো ফুলদানিতে গাঁদাফুল। টেবল ঘিরে গোটা পনেরো লোহার ফোল্ডিং চেয়ার। অন্যধারে কাপড় ঘিরে তৈরি ছোট ছোট খোপ। তার গায়ে ইংরেজিতে লাল কালিতে লেখা কাগজ সেফটিপিন দিয়ে আটকানো। সেগুলোয় লেখা, ”প্লেয়ারস ড্রেসিং রুম।” ”মেডিক্যাল রুম।” ”আম্পায়ারস রুম।” ”কমিটি রুম।” একটিতে লেখা ”টয়লেট” এই হল আটঘরার ”প্যাভিলিয়ন”। জনা দশেক লোক ও ছেলে চেয়ারে বসে।
রাজশেখর চারধারে চোখ বুলিয়ে বললেন, ”বাঃ চমৎকার ব্যবস্থা তো, মিলেনিয়াম ম্যাচের উপযুক্ত বটে। পরমেশ, ট্রফিটা গাড়িতে রয়েছে ওটা নিয়ে এসো। কালু, চাবি নিয়ে সঙ্গে যা।”
নন্তু হাজির হল। রাজশেখর বললেন, ”খেলা শুরুর তো আর পনেরো মিনিট বাকি। টস করবে কখন? আম্পায়াররা এসেছেন? কাকে ক্যাপ্টেন করলে?”
”কাল রাতে তিনজনের নাম নিয়ে আলোচনা করি।” নন্তু গলা নামিয়ে বলল, ”বকু বোস, সত্যশেখর সিংহ আর ডাক্তার ভুবন রায়। বকুদার কাঁধের চোট পুরো সারেনি। খেলতে পারবেন কি না ঠিক নেই। না খেললে কলাবতী উইকেটকিপিং করবে। সতুদা আর ডাক্তারবাবুর মধ্যে ডাক্তারবাবুকেই আমরা বেছেছি। আজ এগারো বছর নিয়মিত খেলছেন, সারা ব্লকের লোক ওঁকে চেনে, ক্রিকেটে ওর পড়াশোনা উৎসাহ প্রচুর। তা ছাড়া ওঁর মনের ইচ্ছাও ক্যাপ্টেন হওয়ার। ওঁকে হতাশ করলে হয়তো রাত আটটার পর বাড়ি গিয়ে রুগি দেখা বন্ধ করে দেবেন, এইসব ভেবেই ওনাকে—”
