ঠোঁট কামড়ে ভুবন ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে রাজশেখরের দিকে তাকিয়ে বলল, ”লক্ষ করলেন বলটা জমি থেকে তিন ইঞ্চির বেশি উঠল না, স্কিড করে এল। বলটা ছেড়ে না দিলে এল বি ডবলু হয়ে যেতুম।”
রাজশেখর গম্ভীর মুখে বললেন, ”তিন ইঞ্চি কী, আমার তো মনে হল দেড় ইঞ্চি উঠেছিল। এরকম বলে ব্র্যাডম্যানও ড্রাইভ করতে পারতেন না, ছেড়ে দিয়ে ঠিক করেছেন।”
অফ স্টাম্পটা ব্যাটের হ্যান্ডেল দিয়ে ঠুকে বসিয়ে ভুবন ডাক্তার আবার স্টান্স নিল। এবার বল করল আর একটি ছেলে। ডেলিভারিটা কিঞ্চিৎ ওভারপিচ। ভুবন ডাক্তার যথারীতি পা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বলটা কোথায় পড়ছে, না দেখেই সে সপাটে ব্যাট চালাল। বাটের কানায় লেগে লাট্টুর মতো ঘুরতে ঘুরতে বলটা ডাক্তারের মাথার উপর দিয়ে আট ফুট উঁচু নেট টপকে পিছনদিকে চলে গিয়ে দেওয়ালে খটাস করে লাগল।
”চার, ডাক্তারবাবু এটা নির্ঘাত চার।” কলাবতী হাততালি দিয়ে বলে উঠল।
রাজশেখর বললেন, ”অফ ড্রাইভ করে ব্যাডম্যানও তো চার রানই পেতেন, আপনিও তাই পেলেন। রান পাওয়ার জন্যই তো ব্যাট করা, আপনি বরং এই ব্যাক ড্রাইভটাই প্র্যাকটিস করুন। এটা অবশ্য এই বইয়ে নেই, তাতে কী হয়েছে। এটা তো নতুন জিনিস, আবিষ্কারও বলতে পারেন।”
খুশিতে ঝলমল করে উঠল ডাক্তারের মুখ, বলল, ”বলছেন নতুন জিনিস? এটা তা হলে এবার ম্যাচে ছাড়ব।”
”ছাড়ুন, তবে অল্প করে।” রাজশেখর গম্ভীর মুখে বললেন।
ডিসেম্বর মাসে বেলা তাড়াতাড়ি পড়ে আসে। সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছে। নন্তু বলল, ”জ্যাঠামশাই, আরও কি দেখবেন?”
”না নন্তু, আর কিছু দেখার নেই। চারটে ছেলেকে তো দেখলুম, খুবই অল্প বয়স, তবে ফিল্ডিংটা উৎসাহ নিয়ে করে, ক্যাচট্যাচও মন্দ ধরল না। আর তো এগারো দিন বাকি রয়েছে, এর মধ্যে কতটুকু আর উন্নতি করবে! পটলকে বললুম তোমার সভা মিছিল পোস্টার পথ অবরোধ এসব বন্ধ করো। এই ম্যাচটা সংগ্রাম নয়—বাৎসরিক মিলনোৎসব, এই ভেবে তৈরি করো প্রীতির পরিবেশ। শুনে বেচারা কেমন যেন মনমরা হয়ে গেল। তবে দুটো স্তম্ভ গড়ার জেদ কিন্তু ছাড়ল না। একটা সতুর সেঞ্চুরির জন্য, অন্যটা আমাদের তিন পুরুষের একই ম্যাচ খেলার জন্য। এটা ছেলেমানুষি না পাগলামি, বুঝে উঠতে পারছি না। আচ্ছা নন্তু, এসব করে কি ও পঞ্চায়েত ইলেকশনে জিততে পারবে?”
নন্তু বলল, ”জ্যাঠামশাই, গ্রামের লোকের জীবনে রেষারেষি একটা গুরুতর ব্যাপার। আটঘরা বকদিঘির মধ্যে আকচাআকচি তো আমার ঠাকুর্দা বলতেন তাঁর জন্ম থেকে দেখে এসেছেন। এবার তো মিলেনিয়াম ম্যাচ, এই প্রথম উইনারকে ট্রফি দেওয়া হবে। বুঝতেই পারছেন, টেম্পারেচার চড়ে গেছে। ট্রেনে দুই গ্রামের ডেইলি প্যাসেঞ্জারদের মধ্যে হাতাহাতিও হয়ে গেছে। পটলদা এখন থামাতে গেলেও থামাতে পারবে না।”
এই সময় সত্যশেখর এসে হাজির হল।
”বাবা, দেখলে অ্যাকাডেমি? কালু কেমন দেখলি, ট্যালেন্ট আছে বলে মনে হল?”
”ট্যালেন্ট!” কলাবতী চোখ কপালে তুলল। ”ব্র্যাডম্যানকে কি তুমি ট্যালেন্টেড বলবে?”
”জিনিয়াস বলব।”
”তা হলে আজ জিনিয়াসকে দেখলুম, তুমিও তাকে দেখবে ম্যাচের দিন।”
রাজশেখর বললেন, ”সতু, এতক্ষণ কোথায় ছিলিস?”
”এই কাছেই, বকদিঘিতে গেছলুম, ননী ঘোষের মাখা সন্দেশ, ছানা আর নলেন গুড় দিয়ে তৈরি, সেই ছোটবেলায় মুখুজ্যেদের বাড়িতে খেয়েছিলুম তারপর আর খাইনি। এদিকে এসেছি যখন, ভাবলুম যাই একবার মহামায়া মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। ওরাই তো এর ইনভেন্টর।”
”সতু, তুই বকদিঘি গিয়ে মিষ্টি কিনলি? এ—খবর হরির কানে ঠিক পৌঁছে যাবে। তারপর প্রচার হবে আটঘরার সিংঘিরা নিজেদের ময়রার বাসি গন্ধওলা মিষ্টি না খেয়ে বকদিঘি থেকে টাটকা জিনিস কিনে খায়। এতে ইলেকশনে পটলের কত ক্ষতি হবে জানিস?” রাজশেখর রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে ধমক দিলেন ছেলেকে।
সত্যশেখর দু’হাত তুলে শান্ত হওয়ার জন্য আবেদনের ভঙ্গি করে বলল, ”আমাকে কেউ কিনতে দেখেনি। দোকানের অন্তত আড়াইশো গজ আগে গাড়ি রেখে টাকা দিয়ে সচিনকে কিনতে পাঠিয়েছি। সচিন তো আর সিংঘি নয়।”
কাছের এক চায়ের দোকান থেকে একটি ছেলে একটি কেটলি আর তিনটে কাপ হাতে নিয়ে হাজির হল। নন্তু কুণ্ঠিত স্বরে বলল, ”জ্যাঠামশাই, চা।”
”না, না, আমি খাব না। ওদের দাও।”
সত্যশেখর চায়ে চুমুক দিয়ে ভাইঝিকে নিচু গলায় বলল, ”এটা কী খাচ্ছি বল তো? তুই বলবি চা। আসলে একটা নতুন পানীয়।”
ফেরার জন্য মোটরে উঠেই রাজশেখর জিজ্ঞেস করলেন, ”কালু, তুই তো ভাল করে বললি না অপুর মা’র খবর। কলকাতায় আসবে কবে? ছেলের পা কি এখনও ঠিক হয়নি?”
”বলছি, বলছি, ভুবন ডাক্তারের ব্যাটিং দেখে কেমন যেন গুবলেট হয়ে গেল সবকিছু। পিসির ম্যালোরি হয়েছে। এখানকার ধন্বন্তরি ভুবন ডাক্তারের চিকিৎসায় রয়েছে, জ্বর কমেছে। শকুন্তলা নামের টনিক দিয়েছি, এবার হু হু করে জ্বর নেমে যাবে। বলেছি, ম্যাচের দিন তৈরি থেকো, নিয়ে যাব। অপু এখনও অল্প খোঁড়াচ্ছে, হাড় ভাঙেনি।”
সত্যশেখর বলল, ”ব্ল্যাড টেস্ট করিয়েছে?”
কলাবতী বলল, ”মনে তো হয় না এখানে ওসব টেস্ট করার ব্যবস্থা আছে, তা ছাড়া হুগলি জেলার সবাই জানে কম্প দিয়ে জ্বর এলে সেটা কী অসুখ। ভাল কথা, পিসি দাদুকে বলতে বলেছে অপুকে তারকনাথের চন্নামেত্তর খাওয়ায়নি, পুজোর ফুল শুধু কপালে ছুঁইয়েছে।”
