রাজশেখর স্নেহের হাসি হেসে বললেন, ”মেয়েটা বড় ভাল। ছোটবেলায় ওর বাবা সাতকড়ি মোদক আটঘরায় ছিল আমার খেলার সঙ্গী।” কিছুক্ষণ পর রাজশেখর বললেন, ”সতু, মিলেনিয়াম কাপের নকশাটা হরিকে দেখিয়ে অ্যাপ্রুভ করিয়ে নিস, নইলে পরে ঝামেলা পাকাতে পারে।”
”আমি যাব না, কালুকে দিয়ে পাঠিয়ে দোব। ও কথাবার্তায় খুব ম্যাচিওরড, বুদ্ধিমতী, ক্লিয়ার হেডেড, আর যেন কী—কী বলল তোর বড়দি?” সত্যশেখর মুখ টিপে হেসে বলল। ”হরিদাদু পর্যন্ত যেতে হবে না, বড়দিকে দিয়ে অ্যাপ্রুভ করালেই হবে।”
বাড়ি পৌঁছে মহামায়া মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কাগজের বাক্স থেকে বেরোল এক কিলোগ্রাম মাখা সন্দেশ। রাজশেখর ও কলাবতী তার এক—তৃতীয়াংশ খেয়ে আর পারল না।
”কাকা, তোমার ছোটবেলার মাখা সন্দেশ আর এই জিনিসটা কি এক?”
”এক কী করে হবে! ননী ঘোষ তো কবেই মারা গেছে। এখন তো ওর ছেলে দোকান চালাচ্ছে। গ্রামের লোক বেশি মিষ্টি পছন্দ করে, তাই বেশি গুড় ঢেলেছে। সত্যিই রে বড্ড মিষ্টি, আমিও আর পারছি না।” সত্যশেখর প্রায় আধ কেজি খাওয়ার পর সন্দেশের বাক্সটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল, ”মুরারির জন্য রইল।”
অঘ্রানের শেষ। সন্ধে থেকেই চেপে ঠাণ্ডা পড়েছে, উত্তুরে বাতাস বইছে। সত্যশেখর শীতকাতুরে। ফুলহাতা সোয়েটার পরে গরম কফির কাপ হাতে নিয়ে সে কলাবতীর ঘরের দরজায় টোকা দিল, ”কালু, আসতে পারি?”
”এসো!” বিছানায় কাত হয়ে কলাবতী বই পড়ছিল, উঠে বসল।
”কী বই পড়ছিস?” কলাবতীর খাটে বসে কফিতে চুমুক দিয়ে সত্যশেখর বলল।
”দাদুর কাছ থেকে আনলুম ব্র্যাডম্যানের আত্মজীবনী ফেয়ারওয়েল টু ক্রিকেট। পড়েছ।”
”কব্বে পড়েছি, তুই এখন পড়ছিস। ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা না থাকলে অমন ব্যাটিং সম্ভব নয়।”
”এটা যদি ভুবন ডাক্তার বুঝত!” কলাবতী আক্ষেপের স্বরে বলে মাথা নাড়ল।
”কালু, বড্ড শীত করছে রে। মলু সেদিন তোকে যে ঝাল আচারটা দিল সেটা কি শেষ করে ফেলেছিস? থাকলে একটু দিবি? বকদিঘির মিষ্টিটা খেয়ে কেমন গা গুলোচ্ছে।” করুণ স্বরে সত্যশেখর বলল।
”এক মিনিট বোসো,” কাকাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে কলাবতী, পড়ার টেবলের ড্রয়ার থেকে আচারের শিশি বার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দু’ মিনিট পর সে এক হাতে চামচে মশলামাখা আমের আচারের টুকরো, অন্য হাতে প্লেটে বরফের কিউব নিয়ে ফিরে এল।
সত্যশেখর আচার মুখে ঢুকিয়ে চোখ কুঁচকে চুষতে চুষতে বলল, ”জানিস কালু, এই ঝাল আচারটা খেলেই আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ইচ্ছে করে পেটাই, যে সামনে পড়বে তাকেই আচ্ছাসে পেটাই।” বলতে বলতে সত্যশেখর ছুটল বেসিনের দিকে। মুখ ধুয়ে ফিরে এসে বরফের টুকরো জিভে রেখে বলল, ”আটঘরায় ব্যাট করতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু সন্দেশ কিনতে গিয়ে এত দেরি করে ফেললাম। তোর ব্যাটটা কোথায় রে?” সে ঘরের চারধারে চোখ বোলাল।
”ব্যাট দিয়ে কী করবে!” অবাক কলাবতী বলল।
”শ্যাডো প্র্যাকটিস করব।”
আলমারির পাশ থেকে ব্যাট এনে দিল কলাবতী। ব্যাট নিয়ে সত্যশেখর বেরিয়ে গাড়িবারান্দায় গেল। কিছুক্ষণ পর কলাবতীর কানে এল, ”হাই”, ”হুশশ,” ”ইয়া”, ”ওহহ” শব্দগুলো। কৌতূহলী হয়ে সে অন্ধকার বসার ঘরে এল। সেখান থেকে আলো—জ্বলা গাড়িবারান্দা দেখা যায়। দেখল কাকা একজায়গায় দাঁড়িয়ে মুখের সামনে থেকে মশা তাড়াবার মতো করে ব্যাট চালিয়ে বলে উঠল ”কড়াক ছয়।” আবার স্টান্স নিল। একটু ভেবে নিয়ে বাঁ পা বাড়িয়ে ব্যাট যতদূর সাধ্য পিছনে তুলে সবেগে নামিয়ে এনে সামনে তুলে বলে উঠল, ”আবার ছয়।” সত্যশেখর স্টান্স নিল আবার। এবার মারল স্কোয়্যার কাট ”কড়াক চার।” এবার সে একহাঁটু ভেঙে বসে সুইপ করতে গেল। টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে মেঝেয় গড়িয়ে পড়ল। কলাবতী তাই দেখে নিঃশব্দে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
.
তিনদিন পর টিফিনের সময় কলাবতী হেডমিস্ট্রেসের ঘরে গেল মিলেনিয়াম ট্রফির নকশা নিয়ে। ”বড়দি, কাকা পাঠিয়ে দিল। আপনি অ্যাপ্রুভ করে দিন।”
”আমি কেন, বাবাকে গিয়ে দেখাও।”
”কাকা বলল, আপনি ঠিক আছে বললে হরিদাদু সেটা মেনে নেবেন।”
হেসে মলয়া নকশার নীচে ”অনুমোদিত” লিখে নাম সই করে বলল, ”রবিবার তোমরা আটঘরা গেছলে? তোমার কাকা বকদিঘিতে গিয়ে এক কিলো মাখা সন্দেশ কিনেছে, কেমন লাগল খেতে?”
কলাবতী অবাক হয়ে বলল, ”আপনি জানলেন কী করে?”
”রবিবার রাতেই পতু মুখুজ্যে বাবাকে ফোন করেছিল। এক সময় ভাল করত, এখন বিশ্রী সন্দেশ তৈরি করে মহামায়া। তোমার কাকা নিশ্চয় সিংহভাগটা খেয়েছে।” মলয়া টেবলে রাখা একটা চিঠির উপর ঝুঁকে পড়ল। কলাবতী বড়দির কথার জবাব না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মিলেনিয়াম ম্যাচের দিনে আটঘরা
বড়দিনের দু’দিন আগে/সত্যশেখর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল একটা পেস্টবোর্ডের বড় কার্টন মহাত্মা গান্ধি রোডের দোকান থেকে ডেলিভারি নিয়ে। দু’হাতে সেটা ধরে দোতলায় বসার ঘরে এসে টেবলে রেখে বলল, ”এই হল মিলেনিয়াম ট্রফি, কেমন হয়েছে দেখো।”
রাজশেখর টিভি—তে খবর শুনছিলেন, পাশে মেঝেয় বসে মুরারি। কলাবতীকে অঙ্ক করাতে ক্ষুদিরামবাবু আজ আসবেন না, তাই সে নিজের ঘরে টেবলে বসে হোমটাস্ক করছিল। সত্যশেখর কার্টনের ঢাকনা খুলতে খুলতে ”কালু, কালু” বলে ডাকল। ভিতরে রাখা কুচো কাগজের মধ্য থেকে দু’হাতে ট্রফিটা বার করে সে টেবলে রেখে বিজয়ীর মতো হাসিতে মুখ ভরিয়ে বাবার দিকে তাকাল।
