ভুবন ডাক্তারের চেয়ারের পাশে জমিতে একটা আড়াই হাত লম্বা ক্যানভাসের ব্যাগ পড়ে ছিল। একটু দূরে ধুতি—শার্ট পরা শীর্ণ একটা লোককে ”ছিরু” বলে ডেকে হাতের বই চেয়ারে রেখে ডাক্তার আঙুল দিয়ে ব্যাগটা দেখিয়ে হাঁটতে শুরু করল। ছিরু ব্যাগটা তুলে নিয়ে অনুসরণ করল তার মনিবের। দু’জনে ঢুকে গেল স্কুলের এক তলার ঘরে। এটাই অ্যাকাডেমির ড্রেসিংরুম।
কলাবতী বলল, ”দাদু, কাকাকে দেখছি না যে?”
”আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে বলল, আসছি। বলেই শচিনকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে কোথায় যে গেল।” রাজশেখর বিভ্রান্ত মুখে নাতনির দিকে তাকালেন।
নন্তু বলল, ”জ্যাঠামশাই, ছেলেদের উৎসাহটা দেখছেন। ওই যে ঢ্যাঙা ফরসা ছেলেটা রত্নাকর, রতু, ওকে টিমে নিয়েছি। ওয়ান ডাউন ব্যাট, আর বলটাও ভাল করে। ওর পাশে দাঁড়িয়ে অনিন্দ্য, ভাল ব্যাট। দু’জনেই ভাল ফিল্ড করে। আরও দু’জন নেব, তবে সেটা ভানুবাবুর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করব। আপনি রতুর ব্যাট দেখবেন?”
”থাক এখন, তোমরা যখন বেছে নিয়েছ তখন নিশ্চয়ই ভাল। পুরনো লোকেরা কে কীরকম ফর্মে রয়েছে সেটা দেখব বলেই এসেছি। আমাদের উইকেটকিপার তো বকু বোস, তাকে তো দেখছি না, চণ্ডী তো রয়েছে দেখছি, ওকে একটু বলটা করতে বলো। থানার মেজোবাবুও তো নেই।”
”বকুদা ডাইভ দিয়ে কাল একটা ক্যাচ ধরতে গিয়ে কাঁধে চোট পেয়েছে। আজ সকালে দেখলুম সেঁক দিচ্ছে। বড়বাবু চুঁচড়োয় গেছেন, এস পি ডেকে পাঠিয়েছেন। থানা ফেলে রেখে মেজোবাবু আসতে পারছেন না। কালও এসেছিলেন, কিছুক্ষণ বলও করলেন।”
রাজশেখর জানতে চাইলেন, ”কেমন বল করে? তুমি তো বলেছিলে লেগস্পিনার।”
ঢোক গিলল নন্তু। এধার—ওধার তাকিয়ে মুখ নামিয়ে এনে বলল, ”অনিল কুম্বলের বল ওর থেকে বেশি ঘোরে।”
”তাতে কী হয়েছে। বলটা ঠিক জায়গায় রাখতে পারে তো?”
”যে কটা বল করলেন তার অর্ধেক পিচের মাঝখানে পড়ল। রতু সবক’টা পুল করল। বাকি অর্ধেক ফুলটস।”
রাজশেখর মাছি তাড়াবার মতো করে হাতটা নেড়ে বললেন, ”বাদ দিয়ে দাও।”
নন্তু সিঁটিয়ে গিয়ে বললে, ”মেজোবাবুকে? বড়বাবু হলে নয় কিছু একটা বলে বাদ দেওয়া যেত, মেজো সেজোবাবুদের বাদ দেওয়া যায় না, উনি বরং থাকুন। ধরে নিন আমরা দশজনে খেলছি। বকদিঘির টিমেও তো মেজোবাবুর মতো প্লেয়ার থাকবে।”
”খবর নিয়েছ?”
”নিয়েছি। বকদিঘি স্কুলের হেডমাস্টারের ছেলে রাহুল, লেখাপড়ায় খুব ভাল। মাধ্যমিকে ঊনচল্লিশ প্লেস পেয়েছিল, চশমার পাওয়ার মাইনাস নাইন, প্রায় অন্ধ। স্টেশনারি দোকানের অরুণাভ মিডিয়াম পেসার, পায়ের বুড়ো আঙুলে চোট, জুতো পরলে ব্যথা লাগে। খেলবে বলে সেটা চেপে রয়েছে। গদাই জানা ওর সঙ্গে পতু মুখুজ্যের ঝগড়া একটা নালা কাটা নিয়ে। গদাই ওদের একমাত্র উইকেটকিপার। ওকে তাতালে দু’—চারটে কাচ ছেড়ে দেবে।” নন্তু ফর্দ পড়ার মতো গড়গড়িয়ে বলে যাচ্ছিল। রাজশেখর হাত তুলে থামালেন।
স্কুলের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে ভুবন ডাক্তার। কালো ট্রাউজার্স পরেছিলেন, এখন সেটা সাদা। নীল—কালো ডোরা দেওয়া বুশশার্ট পরেছিলেন, এখন সেটা সাদা। দু’পায়ে প্যাড, দু’হাতে গ্লাভস, হাতে ব্যাট। পাক্কা ক্রিকেটারের মতো দেখাচ্ছে।
চেয়ার থেকে বইটা তুলে রাজশেখরের হাতে দিয়ে ভুবন ডাক্তার বলল, ”শেখার কি কোনও বয়স আছে, চল্লিশ চলছে, দেখুন এখনও শিখে যাচ্ছি। ব্র্যাডম্যানের কভার না অফ কোন ড্রাইভটা দেখবেন? আচ্ছা আগে অফটা দেখুন, খুলুন, অফ ড্রাইভের পাতাটা খুলুন, ব্র্যাডম্যান ড্রাইভ করছে ছবিটা দেখুন আর আমারটা দেখুন, মিলিয়ে নেবেন।”
ভুবন ডাক্তার গম্ভীর মুখে নেটের দিকে এগোল। রাজশেখর হতভম্ব চোখে কলাবতীর দিকে তাকালেন। ঢোক গিলল কলাবতী। নন্তু মিটমিটিয়ে হাসছে। ডাক্তার ভানু ঘোষালের কাছে গিয়ে বলল, ”অফ ড্রাইভ করব।” তাই শুনে ভানু একট সাড়ে চার ফুট উচ্চচতার ছেলেকে ডেকে তার হাতে বল দিল। নেটে ব্যাট করছিল একটি ছেলে, সে নেট থেকে বেরিয়ে এল। ভুবন ডাক্তার গুড লেংথের কাছে গিয়ে ব্যাট দিয়ে মাটি কয়েকবার ঠুকে ক্রিজে এসে গার্ড নিতে ব্যাটটা লেগ স্ট্যাম্পের সামনে ধরে একটা আঙুল তুলে দেখাল ভানুকে। ঝুঁকে গভীর মনোযোগে দশ সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ভানু আঙুল তুলে বলল, ”ইওর লেগ স্টাম্প।”
ভুবন ডাক্তার বলল, ”থ্যাঙ্ক ইউ।”
পুরো ব্যাপারটা দমবন্ধ করে কলাবতী দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিল, আটঘরার ডাক্তার এসব শিখল কোত্থেকে। সাড়ে চার ফুটের ছেলেটি ছুটে এসে কোনওক্রমে বল ডেলিভারি করল। বলটা উঁচু হয়ে জমিতে পড়ার আগেই ভুবন ডাক্তার বাঁ পা এক গজ বাড়িয়ে ব্যাট তুলে ড্রাইভের জন্য তৈরি। বলটা পিচের মাঝামাঝি পড়ে তার বুকের কাছে উঠে আসছে দেখে ডাক্তার চাপড়ে বলটা জমিতে ফেলে দিয়ে বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ”ভানু, চেঞ্জ বোলার।”
পরের বোলার তার কম্পাউন্ডার চণ্ডী। এবারও ডাক্তার বল ডেলিভারির আগেই এক পা বাড়িয়ে ব্যাট পিছনে তুলে ড্রাইভের জন্য তৈরি। চণ্ডী একটু জোরে বল করে, বল প্রায়শই লেংথে পড়ে এবং উইকেট থেকে উইকেটে সোজা থাকে। তার এই বলটা পিচ পড়ে ডাক্তারের ব্র্যাডম্যানীয় অফ ড্রাইভ করতে যাওয়া ব্যাটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে এসে অফ স্টাম্প ফেলে দিল।
