”আমি আর খেতে পারব না।” কলাবতী হাত গুটিয়ে নিল।
মলয়া বলল, ”সতু এখনও রান্নাকরা দুটো মাছ আছে। লুচিগুলোর সদগতি করে দাও।”
”মুখ মেরে দিয়েছে আর মাছ নয়, চিনি দাও। গরম লুচি চিনি দিয়ে খেতে দারুণ লাগে।”
প্রভা তখন মলয়াকে বলল, ”দিদিমণি, বকদিঘির নলেন গুড় তো রয়েছে। দাদাবাবু চিনি খাবেন কেন?”
”নলেন গুড়!” সত্যশেখর সোফা থেকে ছয় ইঞ্চি উঠে বসে পড়ল।
কলাবতী বলল, ”কাকা আঠারোটা হয়ে গেছে কিন্তু।”
তাই শুনে হরিশঙ্কর দু’হাত তুলে বললেন, ”দুটো এখনও বাকি তবু তার আগেই সব শর্ত প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। মেনে নিচ্ছি নাম হবে মিলেনিয়াম ট্রফি, তার গায়ে খোদাই থাকবে বকদিঘি ও আটঘরার, না কি আটঘরার ও বকদিঘির, কাদের গ্রামের নাম আগে থাকবে তাই নিয়ে তো পতু আর পটলের মধ্যে গজকচ্ছপের যুদ্ধ বেধে যাবে।”
”দাদু, একটা কাজ করলে তো হয়। যুদ্ধু করার বদলে দুই গ্রামের বয়স্কদের সাক্ষী রেখে ওরা টস করে ঠিক করে নিক।”
”খুব ভাল সিদ্ধান্ত।” নলেন গুড়ের বাটিটা টেবলে নামিয়ে রাখার আগেই প্রভার হাত থেকে সত্যশেখর প্রায় ছোঁ মেরে তুলে নিতে নিতে বলল।
”দেখলে বাবা, কী ক্লিয়ার হেডেড মেয়ে কেমন প্রম্পট ডিসিশন নিল।” মলয়ার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেই সরু হয়ে গেল, ”সতু চুমুক দিয়ে খেয়ো না, লুচি দিয়ে খাও।”
”সব তো ঠিক হয়ে গেল, খরচটা আমি আর রাজু ভাগাভাগি করেই দোব।” হরিশঙ্কর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ”কালকেই পতুকে ফোন করে বলছি পটলের সঙ্গে কথা বলুক।”
মিনিট কুড়ি পর ওরা যখন গাড়িতে উঠছে, মলয়া কলাবতীকে ডেকে চুপিচুপি একটা শিশি তার হাতে দিয়ে বলল, ”এটায় ঝাল আরও বেশি।”
কলাবতী চটপট শিশিটা তার জিনসের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। গাড়িতে যেতে যেতে সত্যশেখর বলল, ”গুনেছিলিস?”
”আঠাশটা।”
”আরও পারতুম। মুখুজ্যেদের দেখিয়ে দিতুম সিংহের আহার কাকে বলে! আসলে গুড়টা তো বকদিঘি থেকে পাঠিয়েছে। চেয়ে গেলে হরিকাকা রটাবে আটঘরার লোক চেয়ে চেয়ে বকদিঘির গুড় খেয়েছে। আমাদের খেজুর গাছ অনেক ভাল আটঘরার থেকে।”
”বড়দি দারুণ রান্না করে। ভেবেছিলুম তুমি চিংড়িটা আরও খাবে।”
”না, না, না, সব খেয়ে নিলে মলু আর হরিকাকা খাবে কী? অতবড় চিংড়ি বাড়িতে ক’টা আর রান্না হয়। আমরা তো আর নেমন্তন্ন খেতে যাইনি।”
বাড়ি পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমেই সত্যশেখর বলল, ”কালু, তোর প্যান্টের পকেটে উঁচুমতো ওটা কী রে? শিশি মনে হচ্ছে।”
”বড়দি টোম্যাটোর জেলি করেছেন, খানিকটা খেতে দিলেন। বললেন, মিষ্টিটা বেশি হয়ে গেছে।”
.
মোহিনী কালীমাতা আটঘরা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি
দিনচারেক পর রাজশেখর টেলিফোন করলেন নন্তুকে। বাৎসরিক ম্যাচের জন্য যে সংগঠক সমিতি হয় নন্তু তার আহ্বায়ক, প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাজশেখর, কার্যনিবাহী সভাপতি পটল হালদার এবং সচিব পরমেশ।
ফোন ধরেই নন্তুর প্রথম কথা, ”জ্যাঠামশাই, এইমাত্র আপনাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলুম। পটলদা মাথা ঘুরে পড়ে গেছে, ডাক্তারবাবু দেখছেন, বলেছেন ভয়ের কিছু নেই। রাতটা রেস্ট পেলে ঠিক হয়ে যাবে, ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন।”
রাজশেখর উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, ”হল কী পটলের?”
”টসে হেরে গিয়ে প্রচণ্ড শক পেয়েছেন। ‘বকদিঘির নাম আগে থাকবে!’ এই বলেই ধড়াস করে পড়ে গেলেন।”
”টসটা হল কোথায়? কে টস করল?”
”আটঘরা—বকদিঘি গ্রামের সীমানায় কালভার্টের ওপর। দুই গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টারের সামনে একটা টাকা নিয়ে পটলদা টস করে, পতু মুখুজ্যে ডাকে হেড, আমাদের হেডমাস্টার জমি থেকে টাকা তুলে নিয়ে বললেন ‘হেড পড়েছে।’ আর শোনামাত্রই কথাটা বলে পটলদার মাথা ঘুরে গেল।
”যাক, ডাক্তার বলেছে ভয়ের কিছু নেই, এইটাই রক্ষে। আমাদের প্রিপারেশন কেমন হচ্ছে?”
”দারুণ উৎসাহ জ্যাঠামশাই। একদিন এসে দেখে যান না। আটঘরা স্কুলে অ্যাকাডেমির নেটে রোজ প্র্যাকটিস চলছে। ডাক্তারবাবু সঙ্গে নিয়ে আসেন ব্র্যাডম্যানের আর্ট অব ক্রিকেট বইটা, নেটের পাশে ওঁর চাকর বইয়ের পাতা খুলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। উনি একটা বল খেলেন আর নেটের ধারে গিয়ে বইয়ের ছবি দেখেন, ছবি দেখে এসে আবার ব্যাট করেন। একদিন আমায় বললেন, ”তোমাকে ব্র্যাডম্যানের অফ ড্রাইভ দেখাব, রোববার বিকেলে এসো। এখন লেট কাটটা ধরেছি, দিন তিনেক লাগবে, খুবই রিস্কি ডেলিকেট শট। পৃথিবীতে এখন তিনচারজন মাত্র কনফিডেন্টলি লেটকাট করতে পারে। আমি জানতে চাইলুম সেই তিন—চারজন কে? উনি বললেন, সচিন, শ্রীনাথ, লারা। জ্যাঠামশাই রোববার আসুন না, লেটকাটের সঙ্গে অ্যাকাডেমির ছেলেদেরও দেখবেন।”
”পারি তো যাব।” রাজশেখর ফোন রাখলেন। রাতে খাওয়ার টেবলে তিনি পটলের টস করার ও মাথা ঘুরে পড়ার কথা বললেন। সত্যশেখর বলল, ”স্ট্রোক হয়নি এই যা রক্ষে।” কলাবতী বলল, ”মিলেনিয়াম ম্যাচে আটঘরা যদি হেরে যায় তা হলে অবধারিত স্ট্রোক হবে। কাকা, পটল হালদারকে বাঁচাতে মাচটা আমাদের জিততেই হবে। তুমি ফিটনেসটা বাড়াও।”
রাজশেখর বললেন, ”অপুর মা’র কী হল বল তো? দশদিন আগে ফোন করে বলল, অপুর পায়ের প্লাস্টার দু’দিন আগে কাটা হয়েছে। ছেলে চলাফেরা করতে শুরু করলেই ফিরে আসবে। প্লাস্টার নিশ্চয় কাটা হয়েছে, চলাফেরায় অসুবিধে হচ্ছে কি না কে জানে।” চিন্তিত মুখে তিনি রুটি ছিঁড়ে বাঁধাকপির তরকারি দিয়ে আবার খাওয়া শুরু করলেন।
