বড়দির কাছ থেকে এমন প্রশংসা শুনে কলাবতী প্রজাপতির মতো উড়ে ভিতরে গিয়ে বেসিনে কাকার পাশে দাঁড়াল।
”কালু, এটা খুব অন্যায় করলি। কাল রাতে বাবাই খাবার টেবলে বলেছিলেন, ব্যাপারটা শোভন হয় যদি দুটো গ্রামের মানুষ মিলিতভাবে এই ট্রফি দান করে। আর তুই কিনা কথাটা নিজের নামে চালিয়ে মলয়ার প্রশংসা নিলি।” ক্ষুব্ধ স্বরে সত্যশেখর ভাইঝিকে মৃদু ভর্ৎসনা করল।
”কাকা, হরিদাদুকে যদি বলতুম এটা রাজশেখর সিংহের মাথা থেকে বেরিয়েছে, তা হলে কি হরিদাদু প্রস্তাবটা এককথায় বাতিল করে দিতেন না?”
”কোথায় বাতিল করেছেন, এখনও তো এই নিয়ে কথাই বলেননি।”
”বড়দি যে বললেন ঠিক বলেছে।” কলাবতী অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, ”আর বড়দি ঠিক বললে হরিদাদুর সাধ্যি আছে সেটাকে বেঠিক করার?”
”তা বটে। এখন কুড়িটা লুচি খেয়ে হরিকাকাকে শর্ত বদলাতে রাজি করাতে হবে।”
”জলজিরা কাজ করেনি?” উদ্বিগ্নস্বরে বলল কলাবতী। ”আমার তো বেশ খিদে খিদে লাগছে।”
”আমারও লাগছে, দেখি কতটা পারি। গলদা একটাই দিয়েছে না রে?” তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে বলল সত্যশেখর।
ওরা ঘরে ফিরে আসতেই হরিশঙ্কর বলে উঠলেন, ”সতু, একটা তো ঠিক হয়েই গেল। কালুমার কথা তো ফেলে দিতে পারব না। কিন্তু ট্রফি তৈরির খরচ আমি দোব। তবে এই শর্ত প্রত্যাহার করব কি না সেটা নির্ভর করছে—” তিনি মলয়ার দিকে তাকালেন। ”ভাজতে শুরু করেছে?”
”আগে এগুলো শেষ করুক। প্রভা নজর রাখছে।” মলয়া চেয়ারে বসল।
কলাবতী লুচি ছিঁড়ে বেগুনভাজা থেকে খানিকটা নিয়ে মুখে দিল। সত্যশেখর একটা লুচির উপর একটা আস্ত ভাজা রেখে পাটিসাপটার মতো ভাঁজ করে আধখানা মুখে ঢুকিয়ে ছিঁড়ে চিবোতে চিবোতে বাকি আধখানাও ঢুকিয়ে দিল। চারটে বেগুনভাজা ও লুচি সে প্রায় তিন মিনিটে শেষ করল। কলাবতীকে দুটো বেগুনভাজা দেওয়া হয়েছে। সে দুটো লুচি দিয়ে একটা ভাজা খাওয়া শেষ করে বলল, ”বড়দি, বেগুনভাজা দিয়ে লুচি খেতে বেশ লাগে।”
”তাই বলে আর কিন্তু পাবে না।” হেডমিস্ট্রেস মলয়া বলল। ”ভাজাভুজি বেশি খেলে মোটা হয়ে যাবে।”
”আমারও কিন্তু খুব ভাল লাগে। স্কুল থেকে ফিরে বেগুনভাজা পরোটা না পেলে পেট তো ভরতই না, মনও ভরত না।” হরিশঙ্কর উৎসাহভরে বললেন, ”সতু, তোমার কেমন লাগে বেগুনভাজা?”
সত্যশেখর গলদা চিংড়িটা বাটি থেকে থালায় নামিয়ে মুড়োটা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে করতে বলল, ”একটা কাঁচলঙ্কা পেলে আরও ভাল লাগত।” বলে সে মলয়ার দিকে তাকাল।
”বুঝেছি।” বলেই মলয়া চেয়ার থেকে উঠে ভিতরে চলে গেল। চিংড়ি দিয়ে সত্যশেখর ফুলকপি সহযোগে ছ’টা লুচি শেষ করেছে তখন মলয়া আরও চারটি বেগুনভাজা কড়াই থেকে নামিয়ে এনে ঘরে ঢুকল, সঙ্গে দুটি কড়ে আঙুলের মাপের কাঁচালঙ্কা।
”সতু ভীষণ গরম, একটু ঠাণ্ডা হতে দাও। ওমা! তোমার পাতে তো লুচি নেই! প্রভা, প্রভা।” ব্যস্ত হয়ে মলয়া ডাকাডাকি শুরু করতেই সঙ্গে সঙ্গে প্রভা গামলা হাতে ঢুকল। ততে স্তূপাকার লুচি।
মলয়া বলল, ”ওটা টেবলে রাখ, সতু তুমি লুচি নিজের হাতে তুলে নাও। ক’টা দিয়েছ?”
প্রভা বলল, ”তেরোটা। আর ভাজব?”
”নিশ্চয় ভাজবে।” হরিশঙ্কর বললেন, ”শুধু সতু নাকি, কালুও তো রয়েছে। সিংহের আহার কি এই ক’টা লুচি দিয়ে সারা হয়?”
গম্ভীর হয়ে গেল সত্যশেখর। লুচির উপর বেগুনভাজা রেখে মুড়ল এবং মুখে তোলার আগে বলল, ”ঠিক বলেছেন হরিকাকা, সিংহিরা একটু বেশিই খায়, যদি পরিবেশনটা একটু দরাজ হয়। মলু, চিংড়ি কি একটাই রান্না হয়েছে?”
”সে কী, একটা হবে কেন!” মলয়া ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। সে আর কিছু বলার আগেই প্রভা ঘরে এল হাতে একটা জামবাটি নিয়ে। তাতে আলু—কপির মধ্যে শুয়ে আছে দুটি গলদা।
”হরিকাকা কুড়িটা লুচি খেলে শর্ত বদলাবেন বলেছেন। কুড়িটা যদি খাই তা হলে শর্ত তুলে নিতে হবে, মানে প্রত্যাহার করতে হবে। এই কথা না পেলে আমি আর লুচি ছোঁব না।” বলেই সত্যশেখর থালা থেকে হাত তুলে নিল।
”এ আবার কী কথা।” মলয়া বিপন্ন মুখে বলল, ”আমি নিজে বাজারে গিয়ে মাছ কিনেছি, নিজে হাতে রেঁধেছি। আর এখন বলছ খাব না!” বাষ্পরুদ্ধ গলায় কথাগুলো বলে সে করুণ চোখে বাবার দিকে তাকাল।
হরিশঙ্করের মুখ থমথমে হয়ে গেল। ”সতু এটা কিন্তু ব্ল্যাকমেলিং। ঠিক আছে, ট্রফির গায়ে আমার নাম থাকবে না আর—।”
কলাবতী বলল, ”আর ট্রফি তৈরির খরচটা দুই দাদু ভাগাভাগি করে দেবেন।”
মলয়ার চোখ উজ্বল হয়ে উঠল। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ”দেখলে বাবা কালু কত বুদ্ধিমতী। কী সুন্দর সমাধান করে দিল। সতু এবার কিন্তু ছোঁব না বললে সত্যিসত্যিই থালাবাটি সব তুলে নিয়ে যাব। শুরু করো।” মলয়ার আঙুল বেগুনভাজার দিকে তোলা।
”থালাবাটি তুলে নেওয়ার হুমকিটাও ব্ল্যাকমেইলিং।” বলেই সত্যশেখর বেগুনভাজার লুচিসাপটা মুখে ঢুকিয়ে কাঁচালঙ্কা দাঁতে কাটল।
অতঃপর ঘরের সবাই অবাক চোখে দেখল, গামলার লুচির সঙ্গে বেগুনভাজা কপি আলু কড়াইশুঁটি এবং দুটি গলদার দ্রুত অদৃশ্য হওয়া। প্রভা একটি থালায় আর একপ্রস্থ লুচি এনে গামলায় ঢেলে দিয়ে গেল।”
”কাকা, পারবে?” কলাবতী ভীতস্বরে বলল।
সত্যশেখর ভাইঝির দিকে তাকিয়ে বলল, ”হরিকাকাকে সিংহের আহার দেখাতে হবে না? তুই হাত চালা।”
