সত্যশেখর বলল, ”মনে হচ্ছে চলাফেরায় অপুর হয়তো অসুবিধে হচ্ছে, হয়তো হাড় ঠিকমতো জোড়েনি। ভুবন ডাক্তার জুড়েছে তো।”
ভুবন ডাক্তারের কথায় রাজশেখরের মনে পড়ল স্কুলে অ্যাকাডেমির নেটের কথা। নন্তু বলল, রোববার আসুন না। তিনি একচুমুক জল খেয়ে বললেন, ”সতু রোববার চল একবার আটঘরায় যাই। ওখানে কীরকম তোড়জোড় করে প্র্যাকটিস হচ্ছে সেটা দেখা হবে, পটলের সঙ্গেও দেখা করে শরীরের খবর নেওয়া যাবে আর অপুর মা ফিরতে দেরি করছে কেন সেটাও জেনে নেওয়া যাবে।”
কলাবতী বলল, ”রান্নাঘর শকুন্তলাদির হাতে ছেড়ে দিয়ে পিসি এতদিন যখন বাড়িতে রয়েছে তা হলে নিশ্চয় সিরিয়াস কিছু হয়েছে। কাকা, রোববার তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে রওনা হলে দুপুরেই পৌঁছে যাব।”
ওরা আটঘরায় পৌঁছল দুপুর দেড়টা নাগাদ। প্রথমে গেল নিজেদের বাড়িতে। বাৎসরিক ম্যাচে কলকাতা থেকে বড়কত্তা তাঁর ছেলে আর নাতনি আসবে এই খবর আগেই জেনেছিল সিংহিদের বাড়ি ও সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক শচিন হালদার। ওরা যখন গাড়ি থেকে নামল শচিন তখন মালি ও চাকরকে দিয়ে বাগানের ঝোপঝাড় উপড়ে ফেলার কাজ তদারক করছিল। সে ছুটে গেল গাড়ির দিকে। রাজশেখরকে প্রণাম করে বলল, ”কোনও খবর না দিয়ে হঠাৎ চলে এলেন, স্নান খাওয়ার ব্যবস্থা করি। ওপরের শোয়ার ঘর গোছগাছ করে রাখা আছে।”
”কিছু দরকার নেই।” রাজশেখর হাত তুলে বললেন, ”বাড়িতে ঢুকবও না, খেয়ে এসেছি এখন কিছু খাব না। আমরা দু’—একটা জায়গা ঘুরে কলকাতায় ফিরে যাব। তুমি গাড়িতে ওঠো, পটলের বাড়িটা দেখিয়ে দাও।”
কলাবতী আর সত্যশেখর দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে। কলাবতী বলল, ”এতবড় বাড়ি, এত গাছ। কী শান্ত জায়গাটা। পাখি ডাকছে শুনতে পাচ্ছ কাকা?”
”ঘুঘুপাখি ডাকছে। কলকাতায় আমাদের বাড়ির বাগানে ছোটবেলায় বুলবুলি ঘুঘু আসত। এখন কাক শালিক চড়াই ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না।” সত্যশেখরের স্বরে বিষাদের ছোঁয়া লেগে।
রাজশেখর ডাকলেন, ”সতু, কালু আয়, আগে পটলকে দেখে আসি।”
কলাবতী বলল, ”দাদু, তোমরা যাও, আমি এখন পিসির বাড়ি যাব। সেখান থেকে স্কুলে অ্যাকাডেমির নেটে চলে যাব।”
আটঘরার ভুগোল কলাবতীর জানা। সে হাঁটতে শুরু করল। সিংহিবাড়ির গা ঘেঁষে সরু গলি দিয়ে বেরিয়ে সে কয়েকটা একতলা পাকাবাড়ি, ফণিমনসা আর আশশ্যাওড়া গাছে ভরা ছোট একটা পোড়ো জমি পেরিয়ে বিশাল অশ্বত্থ গাছের গুঁড়ির পাশে বিসর্জন দেওয়া রং ধুয়ে যাওয়া দুটি শীতলা মূর্তির সামনে দাঁড়াল। শীতলা গাধার পিঠে বসে। জন্তুজানোয়ার পাখি আমাদের দেবদেবীর বাহন কেন যে হল এটা তার কাছে হেঁয়ালির মতো লাগে। যমের বাহন মহিষ, শিবের ষাঁড়, গণেশের ইঁদুর, নিশ্চয় এর কারণ আছে। দাদুর কাছে জেনে নিতে হবে। আবার সে হাঁটতে শুরু করল, লালচে পানায় ঢাকা পুকুরের পাশ দিয়ে পথটা ঢালু হয়ে নেমে বেগুন খেতের ধার ঘেঁষে ঢুকেছে ময়রাপাড়ায়। পাঁচ—ছটা কলাগাছ গোছা হয়ে প্রথম মাটির বাড়ির বেড়ার ধারে, আর একটু এগিয়ে ছোট একটা বাঁশঝাড়, তার পাশ দিয়ে ভিতরদিকে ঢুকে গেছে একটা পথ। পথের শেষে অপুর মা’র ঘর। তার দু’পাশে ওর দাদাদের ঘর। ঘরগুলোর মাঝে মাটির উঠোন, উঠোনে দাঁড়িয়ে কলাবতী ডাকল, ”পিসি…পিসি।”
ঘরের দরজা খোলাই ছিল। হাতচারেক লম্বা সরু একটা বাঁশ দু’হাতে ধরে লাফ দিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল তারই বয়সি কালোরঙের ছিপছিপে একটি ছেলে। বাঁ পায়ের গোছে ব্যান্ডেজ এবং চোখে বিস্ময়। কলাবতী একে আগে দেখেছে, বলল, ”অপু, তোমার মা কোথায়?”
”ঘরে শুয়ে, ম্যালেরিয়া হয়েছে, আজ নিয়ে পাঁচদিন।”
কলাবতী লাফিয়ে দাওয়ায় উঠে জুতো খুলে ঘরে ঢুকল। তক্তাপোশে কাঁথা মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে অপুর মা। বিছানায় বসে ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কলাবতী বলল, ”পিসি, আমি কালু।”
অপুর মা সাড়া দিল না। কলাবতী এবার গলা চড়িয়ে বলল, ”তোমার কালুদিদি।”
কলাবতীর কথা যেন অসুস্থ মাথার মধ্যে একটু একটু করে ঢুকছে। সামান্য নড়ে উঠল অপুর মা’র দশাসই দেহটা। তারপর হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসল, ”কে কালুদিদি, তুমি এখানে।”
দু’হাতে অপুর মাকে জড়িয়ে ধরে কলাবতী বলল, ”আমাদের ফেলে রেখে এসেছ একমাসের ওপর, বেঁচে আছি কি না সে খোঁজটাও নাও না।”
”বালাই ষাট। এই তো ম্যালোরি ধরার আগে পরমেশ ঘোষের বাড়ি থেকে কত্তাবাবাকে ফোন করলুম। শকুন্তলা ঠিকঠাক রাঁধছে কি না, ছোটকত্তা পেটভরে খাচ্ছে কি না খোঁজ নিলুম। তুমি ইস্কুলে টিপিন নিয়ে রোজ যাচ্ছ কি না তাও জিজ্ঞেস করলুম। তারপরই কম্প দিয়ে জ্বর এল।”
”জ্বর এখন কত? ডাক্তার দেখাচ্ছ?” কলাবতী অপুর মা’র কপালে আঙুল রেখে তাপ বোঝার চেষ্টা করে বলল, ”জ্বর তো বেশি নয় দেখছি।”
অপু বলল, ”সকালে দেখেছি একশো ছিল।”
”কাকে দেখিয়েছ, ভুবন ডাক্তার?”
”হ্যাঁ। উনি ম্যালেরিয়া আর পেটের রোগের চিকিৎসায় ধন্বন্তরি।”
অপু বলল, ”ওনার ডাক্তারখানায় দূর—দূর থেকে আসা রুগির ভিড় লেগেই আছে। ওনার ওষুধ খেয়েই তো মা’র জ্বর পরশু একশো তিন থেকে একশোয় নেমে আসে। তারপর অবশ্য আর নামেনি।”
”তোমার পা কি উনি সেট করেছেন?”
”না, না, ভুবন ডাক্তার হাড়গোড়ের কিচ্ছু জানে না।” অপুর মা’র শ্রান্ত মন ও শরীর হঠাৎই যেন তেজ ফিরে পেল। ”বকদিঘির ছোকরা ডাক্তার অমল বিশ্বাসের কাছে নিয়ে যাই সাইকেল রিসকা করে। তিনি পায়ের ছবি তোলাতে বললেন, সেই তারকেশ্বরে নিয়ে গিয়ে ছবি তোলালুম। হ্যাঁ রে অপু, কী যেন ছবির নাম?”
