”চমৎকার নাম।” হরিশঙ্কর কিছু বলার আগে মলয়া তার মত জানিয়ে দিল, উৎফুল্ল কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে সত্যশেখর তাকাল মলয়ার দিকে। একটু আগে মলয়া পৃথিবীর বয়স নিয়ে তাকে অপ্রতিভ করায় যে লজ্জায় পড়েছিল সেটা থেকে যেন উদ্ধার পেল।
”একটা নাম দেবে? বেশ তো, দাও। এতে আমার কোনও আপত্তি নেই। এটা কার মাথা থেকে বেরোল, তোমার?”
প্রসঙ্গটা ঘোরাবার জন্য মলয়া বলে উঠল, ”তোমরা আসবে বলে জলখাবার তৈরি করেছি। যাই, প্রভাকে বলি লুচি ভাজতে।”
মলয়া ঘর থেকে বেরোতেই কাকা—ভাইঝি দৃষ্টি বিনিময় করল।
”নামটা পট—” সত্যশেখর পটল শব্দটা সম্পূর্ণ করার আগেই কোমরে কলাবতীর চিমটি পেয়ে চমকে উঠে চুপ করে গেল।
”কী ব্যাপার, পট বলে থেমে গেলে যে?” হরিশঙ্কর অবাক হয়ে বললেন।
কলাবতী বলল, ”কাল রাতে খাওয়ার সময় কাকার মাথায় পট করে নামটা এসে গেল, সেটাই বলতে যাচ্ছিল। দাদু, আমারও একটা প্রস্তাব আছে।”
”ওরে বাবা, তোমারও একটা আছে? বলে ফেলো।”
”বছর বছর ম্যাচ তো হয়, কিন্তু উইনিং টিম তো কিছু পায় না। এবার থেকে উইনাররা একটা ট্রফি পাবে। তার নাম হবে মিলেনিয়াম ট্রফি।” কলাবতী প্রস্তাব দিয়ে উজ্জ্বল চোখে তাকাল।
”এটা কার মাথা থেকে বেরোল, রাজুর? ওর তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই। এখন এইসব নিয়ে মাথা ঘামায়। ট্রফিটা দেখতে কেমন হবে, কত বড় হবে, কী দিয়ে তৈরি হবে, এর দাম দেবে কে, এসব নিশ্চয় ভেবে ফেলেছে। শুধু একটা শর্তে আমি রাজি হব আর ট্রফি তৈরির পুরো খরচও দেব, যদি ট্রফির গায়ে খোদাই করা থাকে ‘বকদিঘির হরিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় কর্তৃক প্রদত্ত’ এই ক’টি কথা।”
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল প্রভা। দু’হাতে দুটি ঝকঝকে কাঁসার বগি থালা। থালা দুটি সে টেবলে দু’জনের সামনে রাখল। থালায় বড় একটা বাটিতে ফুলকপি আলু কড়াইশুঁটি আর টমাটোর মাঝখানে বিরাজ করছে একটা বৃহৎ গলদা চিংড়ি। বাটির পাশে চাকা করে কাটা বেগুনভাজা। প্রভার পিছনে এসেছে মলয়া। তার হাতে বড় একটা স্টিলের গামলায় পাউডার পাফ—এর মতো ফুলকো লুচির স্তূপ। মলয়া বাটিটা থালা থেকে নামিয়ে টেবলে রেখে সত্যশেখরের থালায় সাজিয়ে রাখল দশটি লুচি আর কলাবতীর থালায় চারটি।
পুরো আয়োজনটা ওরা দু’জন নির্বাক হয়ে বিস্ফারিত চোখে শুধু দেখে যাচ্ছিল। মলয়া নির্বিকার নিশ্চিত গলায় বলল, ”নাও, শুরু করো। ভেতরে গিয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে এসো।”
”বড়দি, এসব কী! এর নাম জলখাবার?” কলাবতী রুদ্ধশ্বাসে বলল। আড়চোখে দেখল কাকার নাকের পাটা ফুলে রয়েছে। সত্যশেখর তখন চোখ বন্ধ করে শুঁকছে গরম মশলা আর গাওয়া ঘিয়ের গন্ধ।
”জলখাবারই তো, সামান্য ক’টা লুচি আর… নাও নাও হাত ধুয়ে এসো।”
হরিশঙ্কর বললেন, ”জলজিরা কী আর এমনি এমনি দিয়েছে মলু। এতক্ষণে সতুর পেটে নিশ্চয় অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। মলু প্রভাকে বল, ডজন দুয়েক বেলে রাখতে।”
কলাবতী পা দিয়ে কাকার পায়ের উপর চাপ দিল, অর্থাৎ এখন কী করব।
”মলু, এত খাবার রাতেও আমরা খাই না।” সত্যশেখর গম্ভীর মুখে বলল, ”বাড়ি গিয়ে তো আমাদের আবার খেতে হবে। তুমি অর্ধেক তুলে নাও।”
বাড়ি গিয়ে আজ নাই বা খেলে! আমি জ্যাঠামশাইকে টেলিফোন করে বলে দিচ্ছি তোমরা আজ রাতে বাড়িতে খাবে না।” বলেই সে দরজার পাশে র্যাকের উপর রাখা টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেল।
সত্যশেখর এবার ভাইঝির পায়ের উপর পা রাখল যার অর্থ ঠিক আছে, মেনে নে। মুখে বিব্রত নিরুপায় ভাব ফুটিয়ে সে বলল, ”হরিকাকা, এ তো মহাবিপদে পড়লুম। আজ একমাস হল খাওয়া কমিয়েছি। রাতে দুটো মাত্র রুটি আলুছেঁচকি দিয়ে, আর দেখুন কীসব দিয়েছে। আমাকে বাঁচান।”
”বলো কী, তোমাকে বাঁচাব আমি! তবে কুড়িটা লুচি যদি খেতে পারো তা হলে আমি শর্ত বদলাব।” হরিশঙ্কর মজা করে বললেন।
”বদলাবেন মাত্র! প্রত্যাহার করবেন না?” সত্যশেখর এবার ঝাঁঝালো স্বরে বলল, ”আপনি কী করে ভাবলেন ট্রফিতে শুধু আপনারই নাম থাকবে আর আমরা সেটা মেনে নেব?”
”মেনো না। আমি তো মাথার দিব্যি দিইনি মানতে হবে বলে। ট্রফির কথা তো তোমরাই তুলেছ। তবে তোমরা একতরফা যদি ট্রফি দেওয়ার চেষ্টা করো তা হলে ম্যাচ জিতলেও সেটা আমরা নেব না।” হরিশঙ্কর দৃঢ় স্বরে বললেন।
কলাবতী উশখুশ করছিল কিছু বলার জন্য। এবার সে বলল, ”আচ্ছা, কারুরই নাম নয় যদি দুটো গ্রামের নাম শুধু লেখা হয়! যেমন আটঘরা ও বকদিঘির বাসিন্দাবৃন্দ কর্তৃক প্রদত্ত।”
”কালু, এ কী বাংলা!” টেলিফোন সেরে ফিরে এসেই মলয়া শুনল কলাবতীর বলা শেষ বাক্যটি। ”তুমি কি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ো যে বাসিন্দাবৃন্দ বলছ? বাসিন্দাদের দ্বারা বা অধিবাসীবৃন্দ কর্তৃক প্রদত্ত বলতে পারতে। তুমি এখনও কিন্তু হাত ধোওনি। এই খারাপ অভ্যাসটা কালু তোমার কাছ থেকে অন্তত আশা করি না।”
ধড়মড় করে প্রথমেই উঠে পড়ল সত্যশেখর। বেসিনের দিকে যেতে যেতে মলয়াকে শুনিয়ে গজগজ করল, ”হাত ধুই না তোমায় কে বলল?”
”কে আবার বলবে, বরাবরই দেখেছি নোংরা হাতে খাও।” চাপা গলার বলেই মলয়া হরিশঙ্করের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, শুনলে বাবা কালুর কথা! এই বয়সেই কি ম্যাচিওরড ওর চিন্তা, কোনও ব্যক্তির নামে নয়, দুটো গ্রামের লোককে সম্মান দিতে এই ট্রফি। ঠিক বলেছে।”
