”গাড়ি বার করছি, তাড়াতাড়ি আয়।” বলে সত্যশেখর নীচে নেমে গেল।
কলাবতী ফোন করল, ওধারে মলয়া। ”বড়দি, আমরা এবার বেরোচ্ছি। …দেরি হল? সে তো কাকার জন্য, মক্কেলদের সঙ্গে বসলে সময়জ্ঞান থাকে না। তারপর বায়না ধরল তোমার সেই আমের আচারটা খাবে…অ্যাঁ? কী করে আচারের কথা জানল? আমার হাতে শিশিটা দেখে কেড়ে নিয়ে একটুকরো মুখে দেয়, ভীষণ ভাল লেগেছে, তারপর অবশ্য শিশিটা দাদুর কাছে চালান করে দিই। বড়দি কাকা হর্ন দিচ্ছে, রাখছি।”
গাড়িতে যেতে যেতে সত্যশেখর গম্ভীরস্বরে বলল, ”কালু, একটা কথা বলে রাখছি। যখন দেখবি আমি রেগে উঠছি তখন আমার হাতে চিমটি কাটবি কিংবা পা দিয়ে আমার পায়ে একটা ঠোক্কর দিবি। যখন দেখবি কথা বলতে বলতে আমি ভুল রাস্তায় চলে যাচ্ছি তখন হ্যাঁচ্চেচা করে হাঁচবি। আর একটা কথা, নিশ্চয় খেতেটেতে দেবে। দিলে ওদের সম্মান রাখতে একটুখানি খাবি।”
কলাবতী বলল, ”একটুখানিটা কীরকম? পাখির আহার?”
”হ্যাঁ ধর, চারটে সন্দেশ দিল, খাবি একটা।”
”সন্দেশ না দিয়ে যদি বাড়ির তৈরি ফিশফ্রাই দেয়? বড়দি দারুণ করে।”
”যদি খুব বড় সাইজের দেয় তা হলে বলবি, না না এতবড় খেতে পারব না। বলে প্লেটটা সরিয়ে রাখবি। ছোট হলে নিশ্চয় দুটো দেবে, খাবি একটা। মিষ্টি দেবেই, ওই যা বললুম একটা সন্দেশ কিংবা একটা রসগোল্লা। বুঝিয়ে দিবি আমরা খেতে আসিনি, একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে এসেছি।”
”তুমিও কি প্লেট সরিয়ে রাখবে?”
”আমি?” সত্যশেখর মুখুজ্যেবাড়ির গেট দিয়ে গাড়ি ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, ”আমিও তাই করব।”
.
শর্ত প্রত্যাহারে সিংহের আহার
বৈঠকখানায় সোফায় হেলান দিয়ে কাচের নিচু টেবলে পা ছড়িয়ে হরিশঙ্কর টিভি দেখছিলেন। টেবলের ওধারে আর একটা সোফা। দু’—তিনটি গদি মোড়া চেয়ার বড় ঘরটায় ছড়ানো রয়েছে। মেঝের অর্ধেকটা কার্পেটে ঢাকা। ওদের দু’জনকে ঢুকতে দেখে রিমোট কন্ট্রোলে টিভি বন্ধ করে দিয়ে পা নামিয়ে হরিশঙ্কর উদারস্বরে বললেন, ”এসো এসো, কী সৌভাগ্য আমার। বোসো বোসো ওই সোফাটায় বোসো। দুটো সিংহ বাড়িতে ঢুকেছে একা তো সামলাতে পারব না, দাঁড়াও মলুকে ডাকি।” এই বলে তিনি উঠতে যাচ্ছিলেন। তখনই মলয়া ঘরে ঢুকল। তার পিছনে প্রভা। প্রভার হাতে ট্রে। তাতে দুটো কাচের গ্লাস।
টেবলে ট্রে রাখল প্রভা। হালকা ঘোলাটে রঙের পানীয়। মলয়া গ্লাস দুটো দু’জনের সামনে রেখে কলাবতীকে বলল, ”জলজিরা, খেয়ে নাও। বাড়িতেই তৈরি করা।” তারপর সত্যশেখরের দিকে তাকিয়ে বলল, ”ও কী, চুপ করে বসে আছ যে? গ্লাসটা তোলো।”
সত্যশেখর আড়চোখে দেখল ভাইঝি গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়েছে। সে গলাখাঁকারি দিল। কলাবতী হাত টেনে নিল। মলয়া লক্ষ করে যাচ্ছিল, এবার সে গলা থেকে বড়দিকে বার করে বলল, ”খেয়ে নাও কালু, দেরি কোরো না।” তারপর সত্যশেখরকে বলল, ”তুমিও।”
দু’জনেই গ্লাস তুলে নিল। চুমুক দেওয়ার আগে সত্যশেখর বলল, ”হরিকাকার গ্লাস কই।?”
হরিশঙ্কর ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”আমি সন্ধেবেলাতেই একগ্লাস খেয়েছি, ও—ই যথেষ্ট। বুঝলে, দারুণ খিদে হয়। জিরেভাজা, পুদিনা, কাঁচালঙ্কা বাটা লেবুর রস, সন্ধব নুন এইসব দিয়ে যা টক ঝাল নোনতা একটা জিনিস তৈরি হয় না, কী বলব। বড্ড দেরি করে তোমরা এলে।”
দু’ চুমুকে ওরা দু’জন গ্লাস শেষ করে টেবলে রাখল। দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল মলয়া। বুঝল ভাল লেগেছে, ”আর এক গ্লাস করে হয়ে যাক।”
মলয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই কলাবতী ফিসফিস করে বলল, ”কাকা, খাব?”
”হুঁ।” সত্যশেখর চাপাস্বরে বলল।
”তারপর সতু, ম্যাচটা সম্পর্কে কী যেন বলবে শুনলুম মলুর কাছে। রাজু তো আমাকে চ্যালেঞ্জ দিল এবার আটঘরার জিত কেউ ঠেকাতে পারবে না। তুমি আবার নতুন কোনও চ্যালেঞ্জ—ট্যালেঞ্জ দেবে নাকি।” হরিশঙ্কর সোফায় দেহ এলিয়ে দিয়ে বললেন।
”না হরিকাকা, আপনাকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার মতো ক্ষমতা বা স্পর্ধা আমার নেই।” বিনীত ও মৃদুস্বরে সত্যশেখর বলল, ”আমি এসেছি একটা প্রস্তাব নিয়ে।”
সত্যশেখরের কথা শুনে হরিশঙ্কর সিধে হয়ে বসলেন আর মলয়া বসে পড়ল একটা চেয়ারে।
”পৃথিবীর বয়স তো টু মিলেনিয়াম মানে দু’হাজার বছর হল। একটা হাজার বছর পূর্তি দেখা তো মানুষের জীবনে চট করে ঘটে না। এটা একটা বিশেষ ব্যাপার আমাদের মানে আটঘরা আর বকদিঘির জীবনে। তাই বলছিলুম—”
সত্যশেখরকে হাত তুলে থামিয়ে মলয়া বলল, ”সতু তুমি কি নিশ্চিত পৃথিবীর বয়স দু’ হাজার বছর? আমি তো জানি জিওলজিস্টরা পাথর পরীক্ষা—নিরীক্ষা করে বলেছেন প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। তুমি বোধ হয় খ্রিস্টাব্দের কথা বলতে চাও।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, খ্রিস্টাব্দ। মলু ঠিক বলেছে।” সত্যশেখর এই ডিসেম্বরে ঘেমে উঠে পকেট থেকে রুমাল বার করে কপাল মুছল।
”ঠিক আছে, মিলেনিয়াম তো বুঝলুম। এর সঙ্গে আটঘরা—বকদিঘির কী সম্পর্ক?” হরিশঙ্করের গলায় কৌতুক ফুটে উঠল।
”সম্পর্ক মানে, পৃথিবীর জীবনে এতবড় একটা ব্যাপার ঘটল, আমরা এটাকে স্মরণীয় করে রাখতে কিছু একটা তো করতে পারি?”
”যেমন?” হরিশঙ্কর ভ্রূ কোঁচকালেন।
”যেমন আমাদের বাৎসরিক ম্যাচটার নাম দিতে পারি মিলেনিয়াম ম্যাচ।” বলেই সত্যশেখর ঝুঁকে পড়ল হরিশঙ্করের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার জন্য।
