”দাদু ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক দেখছেন… কাকা এটা কী খাবার?” কলাবতী কৌতূহলে কাকার পাশে এসে দাঁড়াল।
”হুঁ, হুঁ, এখন কলকাতায় কতরকম বিদেশি খাদ্যবস্তু যে তৈরি হচ্ছে। চিনে খাবারটাবার একঘেয়ে হয়ে গেছে, এর নাম পিজ্জা, জাতে ইতালিয়ান।”
ত্রিভুজের আকারে কাটা ইস্ট দিয়ে মাথা ময়দার রুটি ওভেনে বেকড হয়ে মুড়মুড়ে, তার উপরে চিজ, মাংসের পরত, ক্রিম, টম্যাটো সস, ক্যাপসিকাম, চেরি ইত্যাদি। সত্যশেখর দুটো ত্রিভুজ আলতো করে প্লেটে রেখে বলল, ”খেয়ে দ্যাখ।” আঙুলে ক্রিম লেগে গেছে, চেটে নিয়ে সে দুটো পিজ্জা অন্য প্লেটে রেখে তাকাল ভাইঝির দিকে। কলাবতী দু’আঙুল দিয়ে পিজ্জা তুলে বড় হাঁ করে আধখানা মুখে পুরে কামড় বসাল, মুড়মুড়ে পিজ্জা ভেঙে যেতেই সে চিবোতে শুরু করল। সত্যশেখর গভীর উৎকণ্ঠায় খাওয়ার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছে। কলাবতী চোখ বুজে তৃপ্তি করে ঘাড় নাড়তেই হাঁফ ছেড়ে বলল, ”আগে কখনও খাসনি তো। আমাদের এদিকে এসব পাওয়া যায় না, তবে পাওয়া যাবে।”
বলতে বলতে সত্যশেখর নিজের প্লেট থেকে তুলে খেতে শুরু করল। কলাবতী দ্বিতীয় পিজ্জা শেষ করে আঙুল চেটে কাকার খাওয়া দেখতে লাগল।
”কী, আর একটা? তুলে নে। কিন্তু এটাই শেষ।”
”ক’টা এনেছ?” দ্বিতীয় বাক্স থেকে একটা তুলে নিয়ে কলাবতী বলল।
”আটটা।”
”তুমি একাই পাঁচটা খাবে।” অবাক ও ক্ষুব্ধস্বরে বলল কলাবতী।
”কেন, আমার কি পাঁচটা খাওয়ার ক্ষমতা নেই।” সত্যশেখর বলল চ্যালেঞ্জের সুরে।
”ক্ষমতা তো আমারও আছে। আমি তো সিংহি বাড়ির মেয়ে, আমি কি বকদিঘির মুখুজ্যেবাড়ির মেয়ে নাকি যে, এইটুকু টুকু খুঁটে খুঁটে খাব?”
কলাবতী যা আশা করেছিল সেটাই দেখতে পেল। কাকার মুখ প্রসন্নতায় ভরে উঠল। স্মিত চোখে তাকিয়ে বাক্সের দিকে আঙুল দেখিয়ে সত্যশেখর বলল, ”নে একটা, তবে এটাই লাস্ট।”
খাওয়া শেষ করে জিভ দিয়ে ঠোঁট ও আঙুল থেকে ক্রিম চেটে নিয়ে সত্যশেখর বলল, ”ছোটবেলা থেকেই দেখেছি মলু একদমই খেতে পারে না, পাখির আহার।”
”সেজন্যই বড়দির ফিগারটা অত ভাল। চলাফেরায় চটপটে, মেঝেয় কিছু পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে তুলে নিতে পারে। স্কুলের বারান্দায় বৃষ্টির জল জমলে লাফ দিয়ে ডিঙিয়ে যায়…।”
”হয়েছে হয়েছে।” সত্যশেখর থামিয়ে দিয়ে বলল, ”প্লেট দুটো নিয়ে যা, এখুনি গণেন আসবে।”
ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে কলাবতী বলল, ”বাবুদার কথাটা মনে আছে? ওজন না কমালে যে ফিটনেস তুমি চাইছ সেটা পাবে না। ওজন কমাতে গেলে খাওয়া কমাতে হবে, আর ব্যায়াম শুরু করতে হবে।”
কটমট করে তাকিয়েই সত্যশেখরের চাহনি কোমল হয়ে গেল। ঘরে গণেন ঢুকেছে।
.
মিলেনিয়াম ম্যাচের তোড়জোড়
রাজশেখরের সঙ্গে পঞ্চায়েত প্রধান পটল হালদারের কথাবার্তার চারদিন পর রাত্রে আটঘরা থেকে পরমেশের টেলিফোন এল। সিংহিরা তখন খাওয়ার টেবলে। মুরারি হ্যান্ডসেটটা এনে রাজশেখরকে দিয়ে বলল, ”আটঘরা থেকে।”
শুনেই সত্যশেখর ও কলাবতী খাওয়া বন্ধ রেখে উৎসুক চোখে তাকাল। এর পর যে সংলাপ বিনিময় হল তার একপক্ষেরটা ওরা দু’জন শুনতে পেল। তবে পাঠকদের সুবিধের জন্য দু’পক্ষের কথাই লেখা হল এখানে :
”হ্যালো, কে?”
”জ্যাঠামশাই, আমি পরমেশ।”
চুঁচুড়া কোর্টে চাকরি করে পরমেশ এবং আটঘরা থেকেই সে বাসে যাতায়াত করে। আটঘরার ক্রিকেট উন্নয়নের দায়দায়িত্ব তার হাতে এবং বাৎসরিক ম্যাচটিরও অন্যতম সংগঠক। নিজে ক্রিকেট খেলে না।
”বলো পরমেশ কেমন আছ, এই ক’দিন আগে পটল এসেছিল। বলল হরি মুখুজ্যে এবার কলকাতা থেকে দু’জন ক্রিকেটার ভাড়া করে আনবে। একজন মোহনবাগানের, অন্যজন ইস্টবেঙ্গলের। আমি হরিকে বললুম, এই ম্যাচে আজ পর্যন্ত কখনও ভাড়া করে এনে কাউকে খেলানো হয়নি। দুটো গ্রামের লোকেদের থেকে টিম করে খেলা হয়। এই ঐতিহ্য বকদিঘি যদি ভাঙতে চায় ভাঙুক, আটঘরা ভাঙবে না। দেখি বকদিঘি কেমন করে জেতে। পরমেশ, ওকে আমি চ্যালেঞ্জ দিয়েছি।”
”আর সেই চ্যালেঞ্জের কথা পটলদা এখানে হাটেবাজারে, শিবতলায়, রিকশা স্ট্যান্ডে পথসভা করে দু’দিন ধরে বলে বেড়াচ্ছে। আপনিও খেলবেন, কলাবতীও খেলে ম্যাচ জেতাবে। এইসব বলে যাচ্ছে। সতুদা আবার সেঞ্চুরি করবেন আর রেকর্ড গড়বেন। লোকে বেশ তেতে উঠেছে।”
কলাবতী দেখল, শুনতে শুনতে দাদুর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে।
”বল কী, আমিও খেলব বলে বেড়াচ্ছে। ওকে থামাও, থামাও। এ তো মহাবিপদ হল! সতু আর কালু খেলবে, বাকি ন’জন তোমরা ঠিক করবে।”
”টিম এবার ঢেলে সাজানো হবে। আটঘরা স্কুলের ভেতরের ছোট্ট মাঠটায় গত বছর থেকে ক্রিকেট কোচিং চালু হয়েছে। ভানু ঘোষাল ডিস্ট্রিক্ট টিমে খেলেছে, সে—ই কোচ। খরচ দিচ্ছে মোহিনী রাইস মিল আর কালীমাতা কোল্ড স্টোরেজ। তাই কোচিং সেন্টারের নাম মোহিনী কালীমাতা আটঘরা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। সংক্ষেপে এম কে এ ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। ভুবনডাক্তার অ্যাকাডেমিকে অকাদেমি করতে চেয়েছিলেন, ভোটে বাতিল হয়ে যায়। অ্যাকাডেমি সামনের বছর কলকাতায় অম্বর রায় সাব জুনিয়ার টুর্নামেন্টে নাম দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। এদেরই চারটে ছেলেকে খেলাব বলে ঠিক করেছি।”
সত্যশেখর ভ্রূ কুঁচকে প্রায় ধমকে উঠলেন, ”চারটে কেন? ন’জনকে খেলাও।”
