বাবুর নির্দেশমতো মেয়েরা ছড়িয়ে গিয়ে জায়গা নিল। বাবুর প্রথম বল লেগব্রেক। লেগস্টাম্পের দু’ ইঞ্চি বাইরে আলতো করে তুলে দেওয়া গুড লেংথে। সত্যশেখর শূন্য থেকে বলের অবরোহণ মুখ তুলে দেখতে দেখতে এক কদম বেরিয়ে বিশালভাবে পিছনে তোলা ব্যাট দিয়ে কপিবুক অন ড্রাইভ করল এবং ফসকাল।
”হাউজ দ্যাট।”
কলাবতী কাকাকে স্টাম্পড করার আনন্দে একটু বেশিই চেঁচিয়ে ফেলল। সত্যশেখর এক চোখ বন্ধ করে ভাইঝির দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বলল, ”বাইফোকাল চশমার জন্য ফ্লাইটটা কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল। অতটা ফ্লাইট করাবে বুঝতে পারিনি। কনট্যাক্ট লেন্স না পরে ভুল করেছি। বাড়ি গিয়েই পরে নেব।” তারপর সে চেঁচিয়ে বাবুকে বলল, ”একটু জোরে দে।”
বাবুর ডেলিভারটা জোরেই এল এবং ঈষৎ ওভারপিচ। সত্যশেখর আগের মতোই ব্যাট পিছনে তুলে চালাল। ব্যাট বলে লাগল আর বলটা প্রায় আটতলা বাড়ির উচ্চচতায় লং অনের দিকে উঠল। সেখানে দুটি মেয়ের একজন অন্যজনকে চিৎকার করে ”লিভ ইট” বলেই বলের নেমে আসার পথটা আন্দাজ করতে করতে ডাইনে বাঁয়ে, সামনে পিছনে কয়েক পা করেই ছুটে পাঁচ হাত সরে গিয়ে হাত মাথায় চাপা দিল এবং বলটা চার হাত দূরে জমিতে পড়ল।
বাবু চেঁচিয়ে বলল, ”নমামি কী হল? ক্যাচটা ধরার চেষ্টা করলে না কেন?”
”বাবুদা, মেয়েদের ক্রিকেটে অত উঁচুতে ক্যাচ ওঠে না, ধরার তো ওভ্যেসই নেই। ওনাকে একটু কমজোরে মাতে বলুন।”
বাবু এর পর বল করল শর্টপিচ। সত্যশেখর এক—পা পিছিয়ে পরম সুখে পুল করল। বল বিদ্যুৎগতিতে জমি দিয়ে গড়িয়ে স্কোয়্যার লেগে গেল। সেখানে ফিল্ড করছিল অলিপ্রিয়া। কামানের গোলার মতো বলটাকে আসতে দেখে সে হাত পেতেও তুলে নিল।
বাবু চেঁচিয়ে বলল, ”এভাবে ফিল্ড করলে তো চারের মিছিল চলবে।”
অলিপ্রিয়া বলল, ”বাবুদা, এত জোরে মেয়েদের ক্রিকেটে বল মারা হয় না।”
এর পর বাবু এগিয়ে এসে সত্যশেখরকে বলল, ”সতু, তোর রিফ্লেক্স পারফেক্ট, তোর বডি কো—অর্ডিনেশনও ঠিক আছে। তোকে দেখে আমার ইনজামাম উল—হককে মনে পড়ে যাচ্ছে, চালিয়ে যা।”
এর পর দুটি মেয়ে সত্যশেখরকে চার ওভার বল করল। চব্বিশটা বলের দশটা পার্ক পার হয়ে রাস্তায় পড়ল। ভাগ্য ভাল, রাস্তা দিয়ে তখন লোকজন কমই চলছিল।
”সতু, সব বলই যদি পার্ক পেরিয়ে যায়, তা হলে আমার মেয়েরা লুফবে কী? ওদের তৈরি করার জন্যই তো এই ক্লাব।”
সত্যশেখর বাবুর সমস্যাটা বুঝতে পারল। একটু ভেবে সে বলল, ”ব্যাপারটায় খেয়াল রাখব। বাবু এবার বল, আমি কি পারব।”
”কী, পারবি?”
”তোর মামার ভাড়াটে বোলারকে ঠ্যাঙাতে।”
”কী নাম বল তো বোলারটার, কোন ক্লাবের?”
”ইস্টবেঙ্গলের কে এক খোকন ব্যানার্জি।” সত্যশেখর প্যাড খুলে দুটো পা টানটান করে ঝাঁকিয়ে নিতে নিতে বলল।
”খোকন।” বাবু অবাক হয়ে তাকাল। ”কে এক বলছিস কী রে, খোকন তো এবারই রঞ্জি ট্রফিতে ত্রিপুরার এগেনস্টে ম্যাচে এগারোটা উইকেট নিয়েছে। একেই তুই ‘কে এক’ বলছিস। বাংলা খববের কাগজ কি তুই পড়িস না? খোকনকে ওয়ান ডে ইন্টারন্যাশনাল দলে না নেওয়ার জন্য কাগজগুলো সিলেক্টরদের মুণ্ডুপাত করছে।”
সত্যশেখর টেরিয়ে তাকাল বাবুর দিকে। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ”এ—গা—রো—টা! কী বল করে? শোয়েব আখতার না শোন ওয়ার্ন? ফাস্ট, না স্লো?”
”মিডিয়াম ফাস্ট।”
”ওহহ তা হলে তো হেসেখেলে ছক্কা চালাব। মিডিয়াম পেসারদের বল ব্যাটের ঠিক জায়গায় টাইমিং মতো লাগালেই আর দেখতে হবে না। দেখলি তো কেমন মারলুম।”
”সতু, আমি যে বল করলুম সেটা ক্যাচিং প্র্যাকটিসের বল। ওগুলো হাঁকড়ে মনে করছিস খোকনকেও হাঁকড়াবি? ভাল। ক’টা ছয় মারিস সেটা হরিমামা কি কালুর কাছ থেকে জেনে নেব।”
এবার মেয়েদের ব্যাটিং ও বোলিং এবং কলাবতীর উইকেটকিপিং প্র্যাকটিস শুরু হবে। সত্যশেখরকে সোমবার একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলার সওয়াল করতে হবে হাওড়া কোর্টে, মক্কেল আসবে আর ঘণ্টাখানেক পর, সে ব্যস্ত হয়ে কলাবতীকে বলল, ”কালু আমি চললুম। আচারটা খেয়ে ঝালের চোটে মাথা সেই যে গরম হয়ে উঠল, বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা জলে চান করতে হবে।” তারপর গলা নামিয়ে বলল ”আচার খেয়েছি সেটা বাবাকে বলিসনি, আর অন্য কাউকেও নয়।”
বিকেলে কলাবতী গাড়িবারান্দা থেকে দেখল কাকা গাড়ি নিয়ে বেরোল এবং একঘণ্টা পরই ফিরে এসে তার সেরেস্তায় ঢুকল, হাতে একটা পলিব্যাগ। সে বুঝে গেল কাকা কোথাও থেকে খাবার কিনে এনেছে। কলাবতী নীচে নেমে এল।
সে সেরেস্তায় ঢুকে দেখল কাকা গভীর মনোযোগে একটা ব্রিফ পড়ছে। কলাবতী এবার—ওধার তাকিয়ে পলিব্যাগটা খুঁজল কিন্তু দেখতে পেল না।
ব্রিফ থেকে মুখ না তুলে সত্যশেখর বলল, ”জানতুম আসবি। গাড়ি থেকে নামার সময়ই দেখেছি তুই বারান্দায় এসে দাঁড়ালি। যা, চট করে দুটো প্লেট নিয়ে আয়। আটটার সময় গণেন আসবে, তার আগেই শেষ করে ফেলতে হবে।”
গণেন টাইপিস্ট। সত্যশেখর ডিকটেশন দেয় আর শুনতে শুনতে সে ঝড়ের বেগে টাইপ করে যায়। যেদিন থেকে সত্যশেখর সেরেস্তা খুলে ওকালতি শুরু করেছে গণেন সেইদিন থেকেই সন্ধ্যায় এসে টাইপরাইটারে বসছে।
কলাবতী দুটো প্লেট নিয়ে এসে দেখল টেবলে পলিব্যাগটা বসানো, তার ভেতরে কাগজের দুটো বাক্স, বাক্স বার করতে করতে সত্যশেখর বলল, ”বাবা কোথায় রে?”
