”না জ্যাঠামশাই, তা হলে মুশকিলে পড়ে যাব। বকু বোসের জায়গায় যদি কলাবতী উইকেট কিপিং করে, তা হলে তো ওকে বসাতে হবে। ওকে বসালে ডেকরেটরের বিল ডবল হয়ে যাবে।”
”কেন, বকু বোস কি ডেকরেটিংয়ের ব্যবসা করে?”
”ওর শালা করে। সুতরাং ওকে রাখতেই হবে। হাবুময়রা লাঞ্চে এবারও দই মিষ্টি দেবে বলেছে, ওর ছেলে বিশুকে তো রাখতেই হবে।”
”বিশু মানে সেই নীল বেলবটম পরা সাবস্টিটিউট ছেলেটা, ক্যাচ ধরতে গিয়ে যার মাথার উপর বল পড়েছিল?”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনার দেখছি মনে আছে। বিশু সাদা প্যান্ট—শার্ট করিয়েছে, ক্যাচ লোফার প্র্যাকটিস হপ্তায় এক ঘণ্টা করে করছে। খুব সিরিয়াস ছেলে। আগের দারোগাবাবু বদলি হয়ে গেছেন, মেজোবাবু কবমবয়সি একজন, বললেন তো কলেজ টিমে খেলেছেন এগারো বছর আগে। লেগ স্পিনার।”
”তোমাদের ওই ভুবন ডাক্তারটিকে বাদ দিতে পারো?”
”পারি। তা হলে ওর কম্পাউণ্ডার চণ্ডীকেও বাদ দিতে হয়। কেন না ডাক্তারবাবু খেলবেন না অথচ তার কম্পাউণ্ডার খেলবে তা তো হতে পারে না। এতে তো ডাক্তারের প্রেস্টিজে লাগবে। ডাক্তারের প্রেস্টিজ চলে গেলে সে তো আর ডাক্তারই থাকবে না, হাতুড়ে হয়ে যাবে। জ্যাঠামশাই, আটঘরায় কি আপনি হাতুড়ে চাইবেন।”
”না, না, ডাক্তার থাকুক, একমাত্র এম বি বি এস তো ওই একজনই। তা হলে চণ্ডীকে বাদ দাও।” নিশ্চিন্ত স্বরে রাজশেখর নির্দেশ পাঠালেন।
”জ্যাঠামশাই তাতে সামান্য অসুবিধে আছে। চণ্ডী সত্যিই ভাল ক্রিকেটার। জোরের ওপর অফস্পিন করায় লেংথ রেখে, মোটামুটি ভাল ফিল্ড করে। ব্যাটে একটা দিক ধরে রাখতে পারে।”
”ঠিক আছে রাখো। ক’জন হল তা হলে—সতু, কালু, বকু, বিশু ডাক্তার, দারোসা, কম্পাউন্ডার, সাতজন আর অ্যাকাডেমির চারজন। টিম তো হয়েই গেল। ভাল কথা, টুয়েলফথ ম্যান কে হবে? ভাল দৌড়তে পারে, গ্রো করতে পারে, ক্যাচট্যাচ ধরতে পারে এমন কেউ আছে?”
”এইখানেই একটু বিপদে পড়েছি জ্যাঠামশাই। ক্যান্ডিডেট তিনজন, পঞ্চায়েত সদস্য ভোলানাথ, সে আবার পটলদার ভাইপো, ফিশারিজ অফিসের পাঁচকড়ি আর স্কুলের গেমস টিচার। তবে ভোলানাথ ছাড়া কারুর রেসিডেন্সিয়াল কোয়ালিফিকেশন নেই, দু’জনেই বাইরে থেকে এসে চাকরি করে চলে যায়। সুতরাং দু’জনকে বাদ দেওয়া যায়।”
রাজশেখর এবার ব্যস্ত হয়ে বললেন, ”বকদিঘি যে দু’জন প্লেয়ার ভাড়া করে আনছে তাদের কোয়ালিফিকেশন আছে কি না, খোঁজ নিয়েছ? এটা কিন্তু খুব জরুরি ব্যাপার।”
”কাল নন্তুকে বকদিঘি পাঠিয়েছিলুম। ওখানে ওর দাদার শ্বশুরবাড়ি। ফিরে এসে বলল, খোকন ব্যানার্জিদের পৈতৃক বাড়ি বকদিঘিতে। চল্লিশ বছর আগে ওর ঠাকুর্দা কলকাতায় গিয়ে বসবাস শুরু করে। একটা ঘর নাকি এখনও ওদের অংশে আছে। পুজোর সময় খোকনরা আসে। আর মদন গুহ বকদিঘির কেউ নয়, ওর দিদির বিয়ে হয়েছে ওখানে। তবে শোনা যায় একবার মদন গুহ এক সপ্তাহ দিদির শ্বশুরবাড়িতে এসে থেকেছিল, মাছধরার শখ আছে, ছুটিছাটায় ছিপ নিয়ে আসে।”
রাজশেখরকে হতাশ দেখাল, স্তিমিত স্বরে বললেন, ”তা হলে তো কিছু আর করার নেই। এক সপ্তাহ বাস করলে তো যোগ্যতা পেয়েই গেল। আর পতু মুখুজ্যে সেটা ঠিক প্রমাণও করে দেবে।”
”পটলদা পথসভায় বলেছে কোয়ালিফিকেশন টোয়ালিফিকেশন বুঝি না, ঐতিহ্য যখন ভাঙা হবেই তখন আমরাও পালটা ঐতিহ্য গড়ব।”
বিভ্রান্ত রাজশেখর বললেন, ”পালটা ঐতিহ্য। সেটা আবার কী?”
”অবরোধ। পটলদা পথ অবরোধ করবেন। যে পথ দিয়ে ভাড়াটে সৈনিকরা মোটরে আসবে খেলার দিন, তিনি সেই পথ সকাল থেকে একশো ছেলেমেয়ে দিয়ে বন্ধ করে দেবেন, যাতে ওই দু’জন কোনওভাবে মাঠে পৌঁছতে না পারে। আর এটাও জানিয়ে দিয়েছেন, এই কাজ গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে, সংবিধানে নাকি লেখা আছে।”
সন্ত্রস্ত হয়ে রাজশেখর খাড়া হয়ে বসলেন। ”পথ অবরোধ গণতান্ত্রিক অধিকার। বলো কী পরমেশ, এই বাৎসরিক ম্যাচটা এবার তো বন্ধ করে দিতে হয়, আর পটলকে নয় তো পাগলা গারদে পাঠাতে হয়। কোনটা করা উচিত?”
”কোনওটাই নয়, পটলদাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এসব কী বলছেন? তাইতে উনি বললেন, একটা কুকুর গাড়ি চাপা গেলে কলকাতায় পথ অবরোধ হয়, কেউ কিচ্ছু বাধা দেয় না, সবাই মাথা নিচু করে মেনে নেয়, আর এটা তো কুকুরের থেকেও বড় ব্যাপার, ঐতিহ্যের বিনাশ। জ্যাঠামশাই এর পর আর কী বলব বুঝে উঠতে পারলুম না। ঐতিহ্যটাকে ইস্যু করে পোস্টার মারা শুরু হয়ে গেছে। সত্যশেখর সিংহর শতরানকে এই ম্যাচের শতাব্দীর সেরা ব্যাটিং কৃতিত্ব বলে তাকে অমর করে রাখতে স্তম্ভ গড়ার জন্য সাহায্যের আবেদন জানানো হচ্ছে। জ্যাঠামশাই ওকে থামাতে পারবেন না, পঞ্চায়েত নির্বাচনে জিতে পটলদা এই বাৎসরিক ম্যাচকে তুরুপের তাস করেছে। পোস্টারে, মিছিলে, জ্বালাময়ী বক্তৃতায় আটঘরা এমন তেতে উঠেছে যে, ধানের দাম পড়ে যাওয়া নিয়ে কেউ আর কোনও কথা তুলছে না। পোস্টারে এবারের ম্যাচকে মিলেনিয়াম ম্যাচ বলে লাল কালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয়েছে।”
রাজশেখর হতভম্ব হয়ে বললেন, ”মিলেনিয়াম? শব্দটা পটলের মাথায় ঢুকল কীভাবে।”
”বোধ হয় বাবুঘাটে গঙ্গার ধারে মিলেনিয়াম পার্ক দেখে ওর মাথায় এটা খেলে গেছে। ম্যাচের তিনদিন আগে থেকে রথতলা মাঠ ঘিরে মেলা বসাবার ব্যবস্থা হয়েছে। নাগরদোলা, মেরি গো রাউন্ড তো থাকবেই, আর থাকবে নতুন খাবার চাউমিন আর রোলের দোকান, তাই শুনে এখানকার মিষ্টির দোকানদাররা প্রবল প্রতিবাদ জানাতে এই ফরেন খাবারের অনুপ্রবেশ রুখতে ঠিক করেছে খেলার আগের দিন দোকানের ঝাঁপ ফেলে রাখবে।”
