বাবুকে এখন দেখাচ্ছে গুগলিতে বিভ্রান্ত ব্যাটসম্যানের স্টাম্পড হওয়ার মতো। ঢোক গিলে বলল, ”আচ্ছা, আচ্ছা মানছি, তুই সি কে—র থেকেও বড় ব্যাটসম্যান। ব্যারিস্টারি করিস যুক্তির জাল ছড়িয়ে, জজেদের মাথায় টুপি পরানো তোর পেশা। তা হঠাৎ ফিট হওয়ার ইচ্ছেটা হল কেন? বিয়েবাড়ি কি শ্রাদ্ধবাড়িতে নেমন্তন্নটন্ন, পেয়েছিস নাকি?”
”অই তোর এক কথা। কবে সেই মলুর মায়ের শ্রাদ্ধে রাজভোগ পিছু দশ পয়সা বাজি রেখে তিরিশটা খেয়েছিলুম, সেটা নিয়ে আজও খোঁটা দিয়ে যাচ্ছিস।” সত্যশেখরের গলায় অভিমান ফুটে উঠল।
”দেবে না খোঁটা? তিন—তিনটে টাকা পকেট থেকে বার করে দিতে হল। তখন কলেজে পড়ি, হাতখরচ পাই তিরিশ টাকা, তার থেকে তিন টাকা চলে গেলে কী অসুবিধায় পড়তে হয়, তা তুই বুঝবি না,” এই বলেই বাবু চক্রাকারে দৌড়ানো মেয়েদের দিকে তাকিয়ে দেখল, দৌড় এখন জগিংয়ের পর্যায়ে নেমে এসেছে। বাবু আপন মনে বলল, ”পাঁচ পাক মানে প্রায় এক মাইল, তাও পারে না।” তারপর সে সত্যশেখরকে বলল, ”সতু, ওরা এখন লাস্ট ল্যাপে, তুই ওদের পিছু নিয়ে ছোট। হারি আপ।”
চার পাক শেষ করে মেয়েরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এখন তারা ওয়াকিং রেসের থেকে জোরে এবং দৌড়ের মাঝামাঝি অবস্থায়। সত্যশেখর সবার পিছনে থাকা মেয়েটির সঙ্গ নিল। মেয়েটি হঠাৎ একটি বয়স্ক ভারিক্কি লোককে তার পাশে দৌড়তে দেখে দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিল। সত্যশেখরও গতি বাড়াল এবং পঞ্চাশ মিটার পর্যন্ত গতি বজায় রেখে বুঝল খুবই ভুল করে ফেলেছে। বুক ধড়ফড় করছে, ঊরু দুটোয় মনে হচ্ছে দু’টন লোহা ঝুলছে। পা আর চলছে না, আরও তিরিশ মিটার ছুটে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বাবু হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকল। সত্যশেখর কাছে আসতে সে বলল, ”কতবছর পর দৌড়লি, কুড়ি, পঁচিশ?”
সত্যশেখর একটু ভেবে নিয়ে বলল, ”পঁচিশ নয়, কুড়ি বছর হবে বোধ হয়। একবার একটা ষাঁড় খেপে গিয়ে তাড়া করেছিল, এর থেকে বেশি জোরে ছুটেছিলুম। মনে পড়েছে, মনে পড়েছে, এম. এ ফাইনাল ইয়ার, ইউনিভার্সিটির গেট থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজের গেট পর্যন্ত ছুটেছিলুম।
”ষাঁড়টা কি তোকে শেষ পর্যন্ত তাড়া করেছিল?”
”জানি না, আমি তো পিছন ফিরে দেখিনি।”
”হঠাৎ তোর ফিট হওয়ার ইচ্ছে হল কেন সেটা তো বললি না।”
”আটঘরা—বকদিঘি এ বছরের ম্যাচটায় খেলব বলে। তুই তো জানিস এই ম্যাচের গুরুত্ব কী ভীষণ দুটো গ্রামের লোকের কাছে। এ বছর হরিকাকা দুটো প্লেয়ার কলকাতা থেকে ভাড়া করে আনবে বলেছে। অনৈতিক, একদম ইমমরাল, কনটেস্টের স্পিরিটটাই নষ্ট হয়ে যাবে। ভাড়াটে প্লেয়ার খেলিয়ে জিতলে বকদিঘির লোকেরা কি সেই নির্মল আনন্দটা পাবে, যেটা পেত গ্রামের লোককে দিয়ে খেলে জিতলে? তুই বল, এটা কি হরিকাকার উচিত?”
বাবু চুপ করে রইল। সত্যশেখর ওর দ্বিধাগ্রস্ত মুখ দেখে যথেষ্ট ভরসা পেল। ডান হাতটা মুঠো করে তুলে ঝাঁকিয়ে বলল, ”আমরা এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। আনুক ওরা ভাড়াটে প্লেয়ার, আমরা আটঘরার লোক দিয়েই টিম করব আর জিতবও।”
”তুই খেলবি।” বাবু কৌতূহলী স্বরে বলল।
”অবশ্যই। কালুও খেলবে। দু’বছর আগে এই ম্যাচে আমার একটা সেঞ্চুরি আছে—তেরোটা সিক্সার মেরে।”
বাবু মুচকি হেসে বলল, ”এবারও মারবি নাকি?”
উত্তেজিত হয়ে উৎসাহভরে সত্যশেখর বলল, ”তেরোটা কেন, তার বেশি—” বলেই হোঁচট খেল। স্তিমিত গলায় বলল, ”ফিটনেসটা ঠিক আগের মত নেই রে! তা ছাড়া তারপর আর তো ব্যাট ধরিনি। ছয়গুলো সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নয় মারলুম কিন্তু এক রান, দু’রান নিতে হলে তো দৌড়তে হবে। স্লিপে দাঁড়ালেও তো ঝাঁপাতে—টাপাতে হবে।”
বাবু হেসে হালকা সুরে বলল, ”এখন তোর ওজন কত?”
”পঁচাশি কেজি।”
”হাইট?”
”বাবার থেকে দু’ইঞ্চি কম, ছ’ফুট এক ইঞ্চি।”
”শোন সতু, দু’তিন সপ্তাহের মধ্যে তোর ওজন কম করে পনেরো কেজি কমাতে পারব না। আর ওজন না কমালে যে ফিটনেস চাইছিস সেটা পাবি না। তার থেকে বরং ওই মেয়েগুলো এখন যে ব্যায়াম করছে সেগুলো কর।”
সত্যশেখর চোখ কুঁচকে ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়ামে রত মেয়েদের কিছুক্ষণ দেখে বলল, ”ঠিক আছে, তবে ওদের সঙ্গে করব না, বাড়িতে ছাদে করব।”
”তাই করিস, কালু তোকে দেখিয়ে দেবে।”
বিব্রত হয়ে সত্যশেখর বলল, ”আবার কালু কেন? ও তো সঙ্গে সঙ্গে ওর বড়দিকে টেলিফোনে জানাবে আর সেটা হরিকাকার কানে পৌঁছে যাবে। উফফ। তোর মামা তো বকদিঘিতে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে সেটা চাউর করবে।”
হাসি চেপে বাবু বলল, ”তুই ছয় মারা প্র্যাকটিস কর। মেয়েদের ক্যাচিং প্র্যাকটিস দরকার। আমি বল করছি, তুই তুলে তুলে মার, ওরা লুফুক। প্যাড পরে নে।”
মেয়েদের জন্য খেলার যাবতীয় সরঞ্জাম পার্কের পাশেই একটা বাড়িতে রাখা থাকে। প্র্যাকটিসের আগে ব্যাট প্যাড গ্লাভস স্ট্যাম্প ও বল একটা বিশাল ক্যানভাসের থলিতে ভরে সেগুলো বয়ে আনে মেয়েরাই। সত্যশেখর সেই থলি থেকে প্যাড ব্যাট গ্লাভস বার করে পরে নিয়ে নেটের ক্রিজে এসে দাঁড়াল।
বাবু মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলল, ”এবার ক্যাচিং প্র্যাকটিস। সবাই দূরে দূরে ছড়িয়ে যাও। লং অনে আর লং অফে দু’জন করে, মিড উইকেটে তিনজন, ডিপ ফাইন আর স্কোয়্যার লেগে দু’জন করে। একস্ট্রা কভারে দু’জন। কলাবতী গ্লাভস পরো, উইকেটের পিছনে দাঁড়াও। ফসকালেই স্ট্যাম্পড করবে।”
