”ছুটির দিন সকালে এমন মনমরা হয়ে বসে আছ যে?”
”বলছি, তোর হাতে ওটা কীসের শিশি, মনে হচ্ছে আচার টাচার?”
”আমের। বড়দি দিয়েছেন দাদুকে। দেওয়ার সময় বলে গেছেন শুধু আপনার আর কালুর জন্য, আর কাউকে দেবেন না।”
”ঠিক আছে, দে।” সত্যশেখর হাত বাড়াল।
কলাবতী বলল, ”দাদুও বারণ করেছেন তোমাকে দিতে, মারাত্মক ঝাল!”
”কেন, ঝাল তো আমি খাই।” বলেই সত্যশেখর শিশিটা কলাবতীর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঢাকনা খুলে প্রথমে গন্ধ শুঁকে চোখ বুজে তারিফ জানিয়ে একটা আঙুল ঢুকিয়ে মশলা—মাখানো আমের টুকরো তুলে মুখে পুরে চুষতে শুরু করল।
”দারুণ!” তারপরই শিশিটা ভাইঝির হাতে ফিরিয়ে দিল। কলাবতী দেখল, কাকার চোখ গোল হয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসছে। কপালে বিনবিনে ঘাম ফুটছে। ভিজ বার করে ফেলেছে। ছুটে ঘরের বাইরে গিয়ে বেসিনে কুলকুচি করে ফিরে এল।
”ঝাল কোথায়, এ তো বিষ! উফফ আমার যে মাথায় রক্ত চড়ে গেল! পাখাটা ফুলস্পিড করে দে।” বলতে বলতে সত্যশেখর চিত হয়ে খাটে শুয়ে পড়ল।
”কাকা, চিনি এনে দোব?” নিরীহ স্বরে কলাবতী বলল।
”চিনি দিয়ে কী হবে বরফ আন মাথায় আগুন জ্বলছে। এমন জিনিস তুই খেয়েছিস? বাবা খেয়েছে?”
”হ্যাঁ। আমাদের তো ঝালটাল তেমন লাগল না! বড়দি তেঁতুলের আচারও দিয়েছেন, ওটা একটু চেখে দেখবে?”
”না, না না”। সত্যশেখর আঁতকে উঠে খাট থেকে নেমে পড়ল। ”ফ্রিজ থেকে বরফ আন।”
কলাবতী প্লেটে বরফের দুটো কিউব এনে দিল। সত্যশেখর মুখে একটা কিউব পুরে চুষতে শুরু করল। কলাবতী বলল, ”তুমি অমন মনমরা হয়ে বসে ছিলে কেন?”
”কেন? ঘুম থেকে উঠে মনে এল আমি আনফিট মানে ক্রিকেট খেলার জন্য যে ফিটনেস থাকা দরকার সেটা আমার নেই। এদিকে তো বলে ফেলেছি আমি খেলব।” সত্যশেখর অসহায় চোখে ভাইঝির দিকে তাকিয়ে থেকে যোগ করল, ”বকদিঘির বোলিংকে ঠেঙিয়ে বিষ ঝাড়ার জন্য কী করে ফিট হওয়া যায় বল তো?”
চিন্তিত স্বরে কলাবতী বলল, ”ব্যাট হাতে শুধু ঠ্যাঙালেই তো হবে না, ফিল্ডিংও করতে হবে, মানে দৌড়োদৌড়ি আর ক্যাচধরার ব্যাপারগুলোও রয়েছে।”
”তা হলে।” কী হ্যাপা বল তো। ব্যাটিং, ফিল্ডিং, ক্যাচ ধরা এতসব কাজ একটা লোকের দ্বারা করা কি সম্ভব।” জানি জানি তুই বলবি টুয়েলফথম্যানকে নামিয়ে দিলেই হবে, কিন্তু সেটা কি সিংঘিদের পক্ষে লজ্জার কারণ হবে না? টিভিতে ক্রিকেট দেখে দেখে গ্রামের লোকেরাও এখন অনেক কিছু বোঝে, টুয়েলফথম্যানকে দেখলেই হাসাহাসি শুরু করবে আর সব থেকে আগে সব থেকে বড় করে হাসবে তোর বড়দির বাবা হরিশঙ্কর মুখুজ্যে। উফফ সহ্য করা যাবে না।”
কলাবতী বলল, ”কাকা তা হলে তুমি ফিটনেস ট্রেনিং শুরু করে দাও আর শুরুটা হোক আজ থেকেই। চলো আমার সঙ্গে, ওখানে আমাদের কোচ বাবুদা আছেন তোমার কলেজের বন্ধু, আর—।”
”আর মলয়ার পিসতুতো দাদা।” সত্যশেখর হতাশ স্বরে বলল। প্লেটের দ্বিতীয় কিউবটা গলে অর্ধেক হয়ে গেছে। সেটা মুখে পুরে সে বলল, ”চল।”
মোটরে যেতে যেতে কলাবতী জিজ্ঞেস করল, ”মাথাটা ঠাণ্ডা হয়েছে।”
”না। ভেতরটা দপদপ করছে, ভীষণ রেগে গেলে যেমনটা হয়। তবে জিভটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।”
”বাঁচা গেল।” কলাবতী স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
”তার মানে?”
”মানে জিভ ঠাণ্ডা হলে পেটও ঠাণ্ডা থাকে। ফিট হওয়ার জন্য প্রথম কাজ ওজন কমানো, তার মানে খাওয়া কমানো।”
সত্যশেখর আর কথা বলল না, শুধু মুখে ফুটে উঠল বিব্রত ভাব।
ওরা যখন পৌঁছল তখন দশ—বারোটি মেয়ে পার্কের কিনারা ঘিরে ছুটছে। মাঠের মাঝে বাবু অর্থাৎ সুবীর ব্যানার্জি দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছে।
”সাবিনা হাঁটু আর একটু তুলে দৌড়ও…হাসি এটা অলিম্পিক নয় আর একটু স্পিডটা কমাও, মনে রেখো পাঁচ পাক দৌড়তে হবে… ধুপু, খোঁড়াচ্ছ কেন, পায়ে কী হয়েছে? আর দৌড়তে হবে না…কালু দাঁড়িয়ে আছ কেন, ওদের সঙ্গে জয়েন করো, এত দেরি করে এলে সাত পাক দিতে হবে।
এবার বাবুর চোখে পড়ল সাদা শর্টস আর সবুজ স্পোর্টস শার্ট পরা সত্যশেখরের উপর।
”আরে সতু কতদিন পর আবার দেখা। সেই কবে যেন যেদিন কালু প্রথম এখানে এল সেদিন তুইও ওর সঙ্গে এসেছিলি তারপর আজ, কী মনে করে?”
”কী আবার মনে করে, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখাটেখা তো হয় না, আজ ছুটির দিন ভাবলুম যাই বাবু কীরকম কোচিং করায় একটু দেখে আসি। একসময় আমিও তো ক্রিকেটটা খেলেছি।”
বাবু অবাক হয়ে বলল, ”তুই আবার কবে ক্রিকেট খেললি।”
”কবে খেললি মানে? আমাদের পাড়ার টিম বালক সঙ্ঘের হয়ে রীতিমতো ওপেন করতুম। এখনও বাগমারি পার্কে ছক্কা মারার রেকর্ডটা আমার নামেই রয়ে গেছে।” সত্যশেখরকে রীতিমতো ক্ষুব্ধ দেখাল এই তথ্যটি বাবুর না জানা থাকার জন্য। ”এগারোটা ম্যাচ একশো তেত্রিশটা সিক্সার।”
বাবু বলল, ”তুই তো সি কে নাইডুর থেকেও বড় ব্যাটসম্যান। কী বলে খেলতিস, রবারের, না ক্যাম্বিসের বলে?”
”ক্যাম্বিসের বলে।” সত্যশেখর চোখ দুটো সরু করে বলল, ”তাতে হয়েছে কী? ক্রিকেট বল হলে তবেই ছয়গুলো মান্যিগন্যি হবে আর ক্যাম্বিস বলের ছয়গুলো হরিজন সম্প্রদায়ের হয়ে যাবে? যে বলেই হোক ছয় মারতে গেলে তো টাইমিংটা ঠিক রাখতে হয়। পা ঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হয়। মারব কি মারব না এই বিচারটাও তো করে নিতে হয়। তা হলে কী বলে খেলেছিস, এই প্রশ্ন আসছে কেন?”
