পটল হালদার এসেই রাজশেখরের পদধুলি নিয়ে (যা তাঁর পায়ে কখনও থাকে না) মাথায় ঠেকাল।
”বাড়ির খবর সব ভাল? বোসো বোসো ওই চেয়ারটায়।”
সঙ্কুচিত হয়ে বসে পটল হালদার বলল, ”আপনার আশীর্বাদে ভালই আছি। শুধু মুশকিল হয়েছে ধানের ফলনটা এবার বেশি হয়ে দাম পড়ে গেছে। চাষি দায়ে পড়ে কম দামে ধান বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে পঞ্চায়েত ভোট এসে গেল। মানুষ আমাদের ওপর খুবই অসন্তুষ্ট।”
রাজশেখর বললেন, ”মানুষের আর দোষ কী? আয় কমে গেলে তুমি কি ভেবেছ লোকে সন্তুষ্ট থাকে?”
চুলে হাত বুলিয়ে পটল হালদার বলল, ”তা অবশ্য থাকে না, তবে এ ব্যাপারে আমার তো কিছু করার নেই। ধানের দাম তোলার মতো শক্তি আমার পঞ্চায়েত পাবে কোথা থেকে। সামনের ভোটে বোধ হয় আর জিততে পারব না। জিতলে হ্যাটট্রিক হবে।” দীর্ঘশ্বাস পড়ল প্রধানের।
করুণ অসহায়ভাবে তাকিয়ে পটল হালদার। রাজশেখর দেখে কষ্ট পেলেন। দাঁড়িয়ে থাকা মুরারির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলেন। মুরারি মাথা হেলিয়ে বেরিয়ে গেল।
”এবার বলো, হঠাৎ আমার কাছে কেন?”
”বড়দিন দিন তো এসে পড়ল বড়বাবু তাই ক্রিকেট ম্যাচটার কথা মনে করিয়ে দিতে এলুম। গতবার হয়েছিল বকদিঘিতে, এবার হবে আমাদের মাঠে। হরিবাবুর মানিকতলার বাড়ি হয়ে আপনার কাছে আসছি।” হরিশঙ্কর মুখুজ্যে হলেন বকদিঘির প্রাক্তন জমিদার। রাজশেখরের সমবয়সি।
”হরি কী বলল?”
”বললেন পতু মুখুজ্যে এসে ওর সঙ্গে দেখা করে গেছে। গত বছরের মতো এবারও ওরা আমাদের হারাবে বলে নতুন টিম করছে।”
রাজশেখর বললেন, ”নতুন আবার কী? গতবার যারা খেলেছিল, তারাই তো খেলবে।”
”না না, ফুটবলের মতো ক্রিকেটার হায়ার করে আনবে কলকাতা থেকে। হরিবাবু বললেন, ইস্টবেঙ্গল থেকে ফাস্ট বোলার খোকন ব্যানার্জি আর মোহনবাগান থেকে ওপেনিং ব্যাট মদন গুহকে আনবেন, কথাবার্তা নাকি চলছে। আমি বললুম, তা কী করে হয়, আমাদের এই বাৎসরিক ম্যাচের তো নিয়ম, যে গ্রামের হয়ে খেলবে সেই গ্রামে পূর্বপুরুষের বসতবাড়ি থাকতে হবে আর ম্যাচের আগে কম করে টানা তেরাত্তির বাস না করলে সে খেলার যোগ্যতা পাবে না। তাতে উনি বললেন, সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
রাজশেখর অবাক হয়ে বললেন, ”আশ্চর্য! হরিটা এত নীচে নেমে গেছে। এটা কি টুর্নামেন্ট যে, ট্রফি জেতার জন্য প্লেয়ার ভাড়া করতে হবে। এটা তো বাৎসরিক একটা ফেস্টিভ্যাল ম্যাচ, শুধু দুটো গ্রামের মধ্যে খেলা হয়। না না, পটল এসব করলে খেলার মজাটা আর থাকবে না। কত বছর ধরে হয়ে আসছে বল তো এই খেলাটা, শুধু আমাদের দুটো কেন, আশপাশের গ্রামের লোকেরাও মুখিয়ে থাকে, উৎসবের মেজাজে শীতের সারাদিন হইচই করে কাটাবার জন্য ইডেনে টেস্টম্যাচের থেকে কি কম গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচ গ্রামের লোকের কাছে।”
রাজশেখর সখেদে মাথা নাড়লেন এবং তাই দেখে পটল হালদারও। রাজশেখর টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিয়ে বললেন, ”হরির সঙ্গে একবার কথা বলি।” পুশবাটন টিপতে টিপতে পটলের দিকে তাকালেন, ”তুমি ঠিক বলছ তো, দুটো প্লেয়ার ভাড়া করে আনবে বলেছে?”
”উনি আমাকে দু’জনের নামও বলেছেন, খোকন আর মদন।”
ওদিক থেকে সাড়া পেয়ে রাজশেখর জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, ”হরিশঙ্কর মুখুজ্যের সঙ্গে কথা বলতে চাই।… আমি রাজশেখর সিংহি। কী শুনলুম পটল হালদারের কাছে, তুই নাকি দুটো প্লেয়ার কলকাতা থেকে ভাড়া করে আনবি? ছি ছি ছি হরি, তুই ক্রিকেটে এইসব ফুটবলের জিনিস আনছিস। ক্রিকেটের জাত মারবি? ক্রিকেটটা বুঝিস না তা আমি জানি কিন্তু এই বাৎসরিক ম্যাচটায় ভাড়াটে প্লেয়ার ঢুকিয়ে বকদিঘির লোকের আনন্দটা নষ্ট করিসনি। হাতজোড় করে বলছি, হরি হারজিতটা বড় কথা নয়। এগারোজনই গ্রামের লোক খেলবে হইহই করে, এটাই বড় কথা।…কী বললি? কালু ছেলের ছদ্মবেশে খেলে আটঘরাকে জিতিয়ে দিয়েছিল, তারই বদলা নিবি? দুটো কি একরকম ব্যাপার?”
রাজশেখরের গলা উত্তেজিত। হাত মুঠো, চোয়ালের পেশি শক্ত, ভ্রূ কুঞ্চিত। ওধার থেকে হরিশঙ্করের জবাব শুনে বললেন, ”কালুর খেলাটা বেআইনি কেন? ক্রিকেট আইনে কোথাও কি বলা আছে, মেয়েরা ছেলেদের টিমে খেলতে পারবে না? বলবি কনভেনশন, প্রথা, ঐতিহ্য, বেশ, তা হলে এই আটঘরা—বকদিঘি ম্যাচেরও একটা কনভেনশন আছে, আশা করি সেটা তুই ভাল করেই জানিস…অ্যাঁ, কী বললি? দরকার হলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব প্রথাটথা ভাঙতে হবে! বেশ, তুই ভাঙ। আমিও দেখব কেমন করে তোরা জিতিস। এই ম্যাচের আনন্দ আমি নষ্ট হতে দেব না।”
খটাস করে রাজেশেখর রিসিভার রেখে পটলের দিকে তাকালেন, রাগে থমথমে চাহনি, অবাক গলায় পটল বলল, ”আপনি বলে দিলেন, দেখব কী করে তোরা জিতিস? এটা তো চ্যালেঞ্জ!”
”হ্যাঁ, সিংহিবাড়ির চ্যালেঞ্জ, আটঘরার চ্যালেঞ্জ।”
ঘরে ঢুকল মুরারি, হাতে ট্রে। উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল পটল হালদারের চোখ। তবে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার উদ্দীপনায়, না ট্রে—তে রাখা প্লেটের সন্দেশ ও শিঙাড়া দেখে, সেটা বোঝা গেল না।
”আবার এসব কেন।”
”হরির বাড়িতে কী খেয়ে এসেছ।” রাজশেখর গম্ভীর স্বরে জানতে চাইলেন। পটল ইতস্তত করে বলল, ”একটা ভেজিটেবল চপ, দুটো দরবেশ আর চা।”
রাজশেখর ঠোঁট মোচড়ালেন। ”প্লেটটা শেষ করো। মুরারি, ডাব আছে?”
