অপুর মা’র চিন্তা একটাই, তিনমাস পর তার ছেলের মাধ্যমিক পরীক্ষা। ততদিনে ভাঙা পা সারিয়ে পরীক্ষায় বসতে পারবে কি না বাবা তারকনাথই জানেন। রাজশেখরকে সে তার দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে বলেছিল, ”তারকেশ্বরে নেমেই বাবার পুজো দিয়ে চন্নমেত্ত নিয়ে গিয়ে অপুকে খাওয়াব। বাবার ইচ্ছে থাকলে অপু সাতদিনেই হাঁটতে পারবে।”
শোনামাত্র সত্যশেখর বলে, ”অপুর মা বাবার চরণামৃত খেয়ে অপু হয়তো সাতদিনে হাঁটতে পারবে, তারপর ওকে আবার বিছানা নিতে হবে জন্ডিস কিংবা হেপাটাইটিসে।”
”ডিসটিস কী বলছ ছোটকত্তা?” অপুর মা হতভম্বের মতো তাকিয়ে থেকেছিল।
কলাবতী বলেছিল, ”দুটো খুব খারাপ অসুখ পিসি, এতে মানুষ মারাও যেতে পারে, দূষিত জল থেকে এইসব রোগ হয়।”
অপুর মা নিরুপায় চোখে রাজশেখরের দিকে তাকায়। ”হ্যাঁ কত্তাবাবা, কালুদি যা বলল সত্যি?”
”একশো ভাগ সত্যি।” রাজশেখর খবরটা কঠিন করে জানিয়ে দেন। ”তারকনাথের পুজো দাও, ঠিক আছে। পুজোর ফুলপাতা অনুর মাথায় ঠেকাও, ঠিক আছে। মুখে প্রসাদ দাও, ঠিক আছে কিন্তু ওই পর্যন্ত। আর কিছু ওর পেটে যেন না যায়।”
অপুর মা মাথা কাত করে রাজশেখরের নির্দেশ মেনে নিয়েছিল।
অপুর মা’র অবর্তমানে রান্নার দায়িত্ব নিয়েছে তার রান্নাঘরের সহকারী শকুন্তলা। অপ্রত্যাশিত এই প্রোমোশনে শকুন্তলার কথাবার্তা, চলাফেরা বদলে গেছে। মুরারি তাকে জানিয়েছে, ”ভাল করে রাঁধ, ছোটকত্তার জিভে রুচলে তোর মাইনে দুশো টাকা বাড়িয়ে দিতে বলব।” তাই শুনে শকুন্তলা বলে, ”মাইনে বাড়লে কী হবে, পারমেন্ট তো করবে না। দেশ থেকে দিদি ফিরলেই তো আবার বাটনা বাটতে হবে।”
”তা তো হবেই।” মুরারি নিশ্চিত স্বরে বলেছিল, ”তুই কি ভেবেছিস অপুর মা বাটনা বাটবে আর তুই রাঁধবি আর কত্তাবাবু তাই দেখবে? আমি বরং কত্তাবাবুকে বলে যতদিন না অপুর মা ফিরে আসে বাটনা বাটার কাজটা কান্তির মাকে করতে বলব।”
”ওকে বলে দিয়ো যেভাবে বাটতে বলব ঠিক সেইভাবে যেন বাটে। দিদি আমাকে দিয়ে দু’বার করে কতদিন যে বাটিয়েছে। বড্ড মুখ করে কান্তির মা। আর ওকে বলে দিয়ো এটা টেম্পোরি কাজ, পারমেন্ট নয়।”
শকুন্তলার রান্না প্রথমদিন কয়েক গ্রাস খেয়েই সত্যশেখর বলেছিল, ”হ্যাঁ রে কালু, অপুর মা কবে আসবে বলে গেছে?”
রাজশেখর ভ্রূ তুলে বলেন, ”কেন? শকুন্তলার রান্না কী এমন খারাপ, বেশ তো খেতে লাগছে।”
সত্যশেখর কথা না বাড়িয়ে মুখ নামিয়ে বিড়বিড় করে, ”বিশ্বনাথের ব্যাটিংয়ের পর বিষাণ বেদির ব্যাটিং।”
কাকার রসনা অপুর মা’র হাতের রান্নার অভাবে বিষণ্ণবোধ করলেও ভাইঝির রসনাকে তেল ও লঙ্কায় মাখামাখি তেঁতুলের বা কাঁচা আমের আচারে, যা স্কুল গেটের বাইরে বিক্রি হয়, পুলকিত করে তোলার সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। অপুর মা বরাবর সন্দেহ প্রকাশ করে এসেছে, স্কুল থেকে ফিরে কলাবতীর ”খিদে নেই” ঘোষণার একমাত্র কারণ ‘টিপিনের সময় হজমি চাটনি আচার আলুকাবলি, ঝালমুড়ি ইত্যাদি অখাদ্য’ গিলে আসা।
অপুর মা এখন আটঘরায়, তাই সেদিন স্কুল ছুটির পর নির্ভয়ে কিনে আনা জলপাইয়ের আচার কলাবতী মুখে রেখে চুষছিল গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়ে। জিভ ও টাকরায় টক আর ঝালের ছোঁয়া লাগিয়ে চোখমুখ কুঁচকে সে, মাঘ মাসে পুকুরে নামার মুহূর্তে যেমন হিহি কাঁপুনি দেয় সেইরকম একটা কম্পন উপভোগ করতে করতে সে আচার খেয়ে যাচ্ছিল।
গাড়িবারান্দাটা একটা উঠোনের মতো। তিনদিকে কোমরসমান উঁচু ঢালাই লোহার নকশাকাটা রেলিং। বারান্দা থেকে প্রায় চল্লিশ মিটার দূরে দেড়শো বছরের পুরনো লোহার গেট, যাকে সবাই বলে ফটক। বাড়ির সদরে দশ ফুট উঁচু ছ’ফুট চওড়া কাঠের দরজা। পাঁচিল ঘেরা বাড়িতে দুটো টেনিস কোর্ট হওয়ার মতো জমি। দেবদারু, পাম, কাঁঠালি চাঁপা, পেয়ারা, বকুল, বাতাবি ও পাতিলেবুর গাছ পাঁচিল ঘেঁষে। সদর দরজা থেকে মোরামের রাস্তা গেছে ফটক পর্যন্ত। কলাবতী জলপাইয়ের আচার খেতে খেতে দেখল সাদা হাফশার্ট ধুতি পরা, পায়ে পাম্পশু, লম্বা, রোগা, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, পাতাকাটা চুল একটি লোক ফটক দিয়ে ঢুকল। পকেট থেকে চিরুনি বার করে চুল ঠিক করল, সবুজ রুমাল দিয়ে মুখটা রগড়ে মুছল।
কলাবতীর মনে হল লোকটিকে সে দেখেছে। কোথায়? এই বাড়িতে, না অন্য কোথাও? সে ভেবে চলেছে ততক্ষণে লোকটি সদর দরজায় পৌঁছে কলিংবেল বাজিয়েছে। তখনই মনে পড়ে গেল তার। সে ছুটে লাইব্রেরি ঘরে গিয়ে উত্তেজিত স্বরে বলল, ”দাদু, দাদু, আটঘরার সেই পটল প্রধান এসেছে। নীচে বেল বাজাল বোধ হয় মুরারিদা সদর দরজা খুলেছে।”
রাজশেখর চিঠি লিখছিলেন, ”একটু অবাক হয়ে বললেন, ”পটল প্রধান?…ওহো গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান পটল হালদার, তাই বল। মুরারিকে বলো ওকে এখানে পাঠিয়ে দিতে, লোকটা খুব সরল আর সৎ, শুধু বুদ্ধিটা—” রাজশেখর থেমে গিয়ে হাসলেন, তারপর বললেন, ”দিদি, তুমি আর আঙুল চেটো না, এবার সাবান দিয়ে ধুয়ে নাও। অপুর মা ফিরে এসেই তোমার আঙুলের গন্ধ শুঁকবে, তারপর কী কাণ্ড যে হবে।” বলেই তিনি শিউরে ওঠার ভাব দেখালেন।
মুরারি এসে দাঁড়াল। কলাবতী বলল, ”কে এসেছে আমরা জানি মুরারিদা, তুমি ওকে এখানে নিয়ে এসো।” বলেই সে হাত ধুতে বেসিনের দিকে চলে গেল।
