”আছে।”
রাজশেখবকে আর কিছু বলতে হল না, মুরারি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
”দু’বছর আগের হারের জ্বলুনিটায় এখনও জ্বলছে। সত্যি বলতে কী, আমি পর্যন্ত জানতুম না কালু ওইভাবে গোপী ঘোষের ছেলের জায়গায় ব্যাট হাতে নামবে।”
”আপনি জানবেন কী করে,” শিঙাড়ার অর্ধেকটা মুখের মধ্যে, দু’বার দাঁতে পিষে গলার স্বর বার করার জায়গা তৈরি করে নিয়ে পটল বলল, ”তখন তো আপনি ব্যাট করছেন মাঠে। কাকপক্ষীতে জানতে পারেনি, এমনকী আমিও না। উফফ, তলে তলে কী ফন্দিটাই না এঁটেছিল আপনার নাতনি! একটা বাচ্চচা মেয়ে যে এত ভাল ব্যাট করে কে জানত বলুন তো?”
”আমি জানতুম, সতুও জানত। তোমার অবশ্য জানার কথা নয়। কালু বাংলার মেয়ে টিমে খেলেছে।” মুরারিকে কাচের গ্লাসে ডাবের জল নিয়ে ঢুকতে দেখে তিনি থামলেন।
দ্বিতীয় শিঙাড়াটা তুলে নিয়ে পটল বলল, ”আপনি, সতুবাবু আর কলাবতী তিনজনে একই ম্যাচে খেললেন। আচ্ছা, তিন পুরুষের একই ম্যাচে খেলাটা বিশ্বরেকর্ড কি না সেটা কি খোঁজ করে দেখেছেন? হলে আমি বিশ্বরেকর্ড স্তম্ভ গড়ব আটঘরা বাজারে, ভোটের আগেই।”
”হ্যাঁ, দেখেছি। আসামের এক চা—বাগানের মালিক, তার ছেলে আর নাতি মিলে একটা ম্যাচ খেলেছিল নাইনটিন থার্টিফোরে। মালিক ছিল ইংলিশম্যান। খেলাটা হয়েছিল শিলংয়ে, ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরের টিমের সঙ্গে।”
আধখাওয়া শিঙাড়া হাতে পটল লাফিয়ে উঠল। ”কী বললেন, নাতি? নাতনি তো নয়। আরে, এটাই তো বিশ্বরেকর্ড! কী আশ্চর্য, আগে কেউ আমায় জানায়নি, তা হলে তো দু’বছর আগেই স্তম্ভ গড়ে ফেলতুম। সেই ম্যাচে সতুবাবু একটা সেঞ্চুরি করেছিলেন যা এই বাৎসরিক খেলার ইতিহাসে এখনও কেউ করতে পারেনি…।”
রাজশেখর গম্ভীর মুখে বললেন, ”পটল শিঙাড়াটা শেষ করে কথা বলো, তারপর সন্দেশগুলোর গতি করো।”
”নিশ্চয়ই করতে হবে। পতু মুখুজ্যে তো এখন থেকেই ভোটের প্রচার শুরু করে দিয়েছে আমার এগেনস্টে। এবার তো আমাকেও শুরু করতে হবে। আচ্ছা, যদি দুটো স্তম্ভ গড়ে ফেলি তা হলে কেমন হয়, একটা আটঘরার বাজারে, অন্যটা বাসস্টপে, অনেক লোকের চোখে পড়বে।” পটল সন্দেশ তোলার জন্য বাড়ানো হাতটা থামিয়ে সমর্থন পাওয়ার আশায় তাকাল।
রাজশেখর বললেন, ”দুটো কীসের কীসের?”
পটল সন্দেশ তুলে নিয়ে বলল, ”সতুবাবু যে তেরোটা ছক্কা হাঁকড়ে একশো চার করেছিলেন, আটঘরার হিস্ট্রিতে এটাই প্রথম সেঞ্চুরি। এখনও লোকে বলে, বাব্বা, এক—একটা ছক্কা তালগাছের মাথায় চড়ে যাচ্ছিল। পরের বছর ইস্কুলের কত ছেলে ওর অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছিল কিন্তু উনি তো আর গেলেন না।” পটল ক্ষুব্ধ মুখের মধ্যে সন্দেশ পুরে দিল।
”আর দ্বিতীয় স্তম্ভটা?”
পটল সন্দেশটার গতি করার জন্য একটু সময় নিল। এক ঢোক ডাবের জল খেয়ে বলল, ”দ্বিতীয়টা তিনপুরুষ স্তম্ভ। স্তম্ভে পাথর লাগানো থাকবে, তাতে থাকবে তিনজনের নাম আর তাদের কীর্তির কথা। আমাদের বাংলার টিচারকে দিয়ে লেখাব, বড় ভাল বাংলা লেখে।”
রাজশেখর গম্ভীর হয়ে গেলেন শুনতে শুনতে। ধীরস্বরে বললেন, ”পটল, চালের দাম পড়ে গেছে। মানুষ অসন্তুষ্ট। এখন এসব করলে তুমি একটাও ভোট পাবে না।”
গলা নামিয়ে চুপিসারে পটল বলল, ”এই সময়েই তো এসব করতে হয় বড়বাবু। দেখেননি দেশের অবস্থা খারাপ হলে রায়ট কিংবা যুদ্ধ লাগিয়ে দেশবাসীর নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। আমিও ক্রিকেটের হুজুগ তুলে…কী বলব আপনাকে, ওয়ান ডে ক্রিকেট টিভিতে দেখানো শুরু হলেই আটঘরা একেবারে সুনসান হয়ে যায়, বাজারে বেচাকেনা লাটে ওঠে, ইস্কুলে মাস্টারমশাইরাও কামাই করেন, ফুটবল মাঠে ছেলেরা সারা বছর এখন ক্রিকেট খেলছে। বড়দের মুখে শুধু ক্রিকেটের কথা। চালের দামটাম সব ভুলিয়ে দেওয়া যাবে স্তম্ভ গড়ার জন্য শোরগোল তুলে দিয়ে।”
রাজশেখর আর কথা বললেন না। পটলের সন্দেশ খাওয়া দেখতে লাগলেন। ডাবের জলটা খেয়ে পটল গ্লাস রেখে বলল, ”বকদিঘিকে যে চ্যালেঞ্জটা দিলেন, সেটাকেই মূলধন করে কাল থেকেই আটঘরাকে তাতাবার কাজ শুরু করব। বাইরের লোক এনে খেলানো তো ভ্রষ্টাচার, বাৎসরিক ম্যাচটাকে তো অপবিত্র করে দেওয়া। এর মূলে পতু মুখুজ্যের বুদ্ধি কাজ করছে। উদ্দেশ্য একটাই। আটঘরাকে নয়, আমাকে হারানো।”
রাজশেখর চিন্তিত স্বরে বললেন, ”সেবারের ম্যাচ দেখে তো মনে হয়েছিল দুই আম্পায়ারের মধ্যেই যেন খেলাটা হচ্ছিল। আমাদের আম্পায়ার—কী যেন নাম?”
”বুদ্ধুস্যার, বুদ্ধদেব ঘোষ অঙ্কের টিচার, ওদের আম্পায়ার হরিশ কর্মকার, বকদিঘি ড্রামাটিক পার্টির প্রম্পটার।”
”বুদ্ধদেব প্রথম দু’ওভারেই তিনটে রান আউট আর দুটো স্টাম্পড দেন। ওদের হরিশ কর্মকারও প্রথম ওভারেই চারটে এল বি ডবলু দিয়েছিল। দেখো পটল, এভাবে খেলা হয় না। নিজেদের গ্রামের লোককে আম্পায়ার রাখলে পুকুরচুরি হবেই। এবার থেকে নিউট্রাল আম্পায়ার রাখার ব্যবস্থা করো পারলে কলকাতা থেকে নিয়ে যাও।”
”আবার কলকাতা! বকদিঘি কলকাতা থেকে প্লেয়ার আনাচ্ছে বলে আপনি আপত্তি তুলছেন, আর—।”
”দুটো এক ব্যাপার নয় পটল। আম্পায়াররা তো আর ব্যাট—বল নিয়ে খেলবে না। ওরা শুধু খেলাটা পরিচালনা করবে। খেলার আইনে বলেছে, ইনিংসের জন্য টস করার আগে আইনের প্রয়োজন অনুযায়ী চরম নিরপেক্ষতা সহকারে খেলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতি প্রান্তে একজন করে, দু’জন আম্পায়ার নিয়োগ করতে হবে। এবার তুমিই বলো, ওইসব রানআউট, স্টাম্পড আর এল. বি. ডবলুগুলো কি চরম নিরপেক্ষতার নমুনা? ও তো রেষারেষি করে আউট দেওয়া দিনে ডাকাতি। ব্যাপারটা তা হলে তো স্রেফ ভাঁড়ামিতে দাঁড়াল। তুমি ওদের বলো, কলকাতা থেকে আম্পায়ার আনতে। আমরাও নিয়ে যাব আম্পায়ার।”
