একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল কলাবতী। মলয়া তার কাছে এসে কৈফিয়ত দেওয়ার স্বরে বলল, ”বাচ্চচাগুলোকে সকালে পেটভরে খাইয়ে দিয়ে ওকে ফিরিয়ে দিয়ে যাব, এই ভেবেই খয়েরিকে রেখে দিয়েছিলুম। একটু দেরি হয়ে গেল, এবার ও নিজের বাচ্চচাদের খাওয়াক।”
কলাবতী শান্ত স্বরে বলল, ”তার আর দরকার হবে না বড়দি। খয়েরি তার বাচ্চচাদের আর দুধ খাওয়াতে পারবে না, ওরা মরে গেছে, ওই দেখুন কবর।”
কলাবতী আঙুল তুলে যেখানটা দেখাল তার ধারেই দাঁড়িয়ে খয়েরি মুখটা আকাশের দিকে তুলে করুণ সুরে দু’বার ডাকল—”ও ঔ ঔ ঔ, অউ অউ অউ”। তারপর সে কলাবতীর কাছে এগিয়ে এল। কলাবতীর মনে হল খয়েরি যেন জিজ্ঞেস করছে—আমার বাচ্চচারা কোথায়! তুমি জানো কী?
হতভম্ভ মলয়াকে দাঁড় করিয়ে রেখে কলাবতী ছুটতে ছুটতে বাড়ির মধ্যে ফিরে এল। রান্নাঘরে সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত চোখে সে সদর দরজার দিকে তাকাল, খয়েরি তার পিছু নিয়ে আসছে কি?
খয়েরি নয়, এল মলয়া।
”কালু, আমি মঙ্গলার বাচ্চচাদের কথাই শুধু স্বার্থপরের মতো ভেবেছি, খয়েরির বাচ্চচাদের কথা ভাবিনি।” অনুতপ্ত স্বরে সে বলল।
রাজশেখর সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মলয়ার কথাগুলি শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, ”খয়েরির মুশকিল কী জানো, ও অবোলা, মানুষের মতো কথা বলতে পারে না, পারলে অনেক কিছু বলত।”
সদর দরজার কাছ থেকে শোনা গেল, ”ভুক ভুক ভ উ উ উ।”
রাজশেখর বললেন, ”কী বলল বলো তো?”
সবাই চুপ করে রইল।
কালু ওকে ডেকে আনো, না ডাকলে তো বাড়ির মধ্যে ঢুকবে না।”
কলাবতী সদরে গিয়ে খয়েরিকে সঙ্গে করে ফিরে এল। এত চেনা মানুষকে একসঙ্গে দেখে সে লেজ নাড়তে লাগল। অপুর মা ওকে বকলস ধরে সিঁড়ির নীচে টেনে নিয়ে গেল, ”এই নে তোর বাচ্চচা, ওকে বাঁচিয়ে তোল।”
রাজশেখর বললেন, ”অপরাধ যা হওয়ার তা তো হয়েছেই, আর সংশোধন করতে পারে বলে মানুষকে মানুষ বলা হয়। মলু তোমার বাড়ির বাচ্চচাগুলোকে এবার বাঁচাতে হবে, ওরা যেন না মরে যায়। এই বাড়িতে ওর পা গেল, বাচ্চচাদের হারাল, আর নয়—এবার খয়েরিকে তুমি নিয়ে যাও।”
অপুর মা জুড়ে দিল, ”সঙ্গে ওর বাচ্চচাটাকেও নিয়ে যেও।”
মলয়া তাই নিয়েই বাড়িতে ফিরল।
.
ছ’মাস পর পূর্ব কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব লখনউ, কানপুর, দিল্লি দু’সপ্তাহের জন্য সফরে যাচ্ছে আটটি ম্যাচ খেলতে। কলাবতীকে হাওড়া স্টেশনে মোটরে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে সত্যশেখর, সঙ্গে ধুপুও চলেছে। সিংহিবাড়ি থেকে গাড়ি বেরোতেই কলাবতী বলল, ”কাকা একবার বড়দির বাড়ি হয়ে যাবে, এখনও তো ট্রেনের জন্য হাতে অনেক সময় রয়েছে।”
সত্যশেখর বলল, ”বড়দির বাড়িতে আবার কেন!”
কলাবতী বলল, ”খয়েরিকে একবার দেখব।”
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সত্যশেখর বলল, ”যাবি তো, তারপর বড়দি যদি তোর খেলতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়? দেড়শো গ্রাম ওজনের লোহার মতো শক্ত বল ঘণ্টায় তিরিশ—চল্লিশ মাইল স্পিডে আসবে, সেই বল ধরতে তোকে বারণ করেছিল না?” গাড়িটা মলয়াদের বাড়ির পথে ঘুরিয়ে সত্যশেখর বলল।
”সেই বড়দি এখন আর নেই, একদম বদলে গেছে। আমি প্র্যাকটিসে ঠিকমতো যাচ্ছি কিনা বাবুদার কাছে প্রায়ই খোঁজ নেন।”
মলয়াদের বাড়ির ফটক দিয়ে গাড়িটা ঢুকে সদর দরজার সামনে দাঁড়াল। গাড়ির শব্দে দোতলার বারান্দার রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে তিনটি অ্যালসেসিয়ান ও একটি দেশি কুকুরের মুখ বেরিয়ে এল। মোটর থেকে নামল শুধু কলাবতী। তাকে দেখেই ওরা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। কলাবতী কলিং বেল বাজাতে কাজের লোক এসে দরজা খুলল।
”বড়দি, কী করছে?”
”বেরিয়েছেন।”
”খয়েরি কোথায়?”
”ঘুমোচ্ছে।”
ভৃত্যটির কথা শেষ হওয়ামাত্র কলাবতীর কানে এল ভেতরের ঘর থেকে ”ভুক ভুক ঘৌ উ উ উ” একটা চাপা ডাক। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এল খয়েরি। কলাবতীকে দেখেই সে ছুটে এসে সামনের দু’ পা তুলে দিল ওর কোমরে। কলাবতী মুখ নামাল, খয়েরি ওর গাল চেটে কুঁই কুঁই শব্দ করে লেজ নাড়তে লাগল, কান দুটো ঘাড়ে মিশিয়ে দিয়ে। কলাবতী আড়চোখে দেখল সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে পাঁশুটে ও কালো রঙের একটু বড়সড় চেহারার পাঁচটি আর তাদের মাঝে ছোটখাটো চেহারার খয়েরি কিন্তু পেটের কাছে সাদা রঙের একটি কুকুর। এখন আর ওদের বাচ্চচা বলা যায় না। ওরা নেমে এসে খয়েরির পেছনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ এল।
”এখন কেমন আছিস?” কলাবতী জানতে চাইল খয়েরির গলা জড়িয়ে ধরে।
”ঘেউ।”
”এবার আমি যাই। আবার আসব।”
”ঘেউ ঘেউ।”
দরজা থেকে বেরিয়ে কলাবতী পেছন ফিরে তাকাল। দেখল, ছ’টি সন্তান নিয়ে খয়েরি তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
কলাবতী ও মিলেনিয়াম ম্যাচ (২০০৩)
কলাবতী ও মিলেনিয়াম ম্যাচ (২০০৩) – মতি নন্দী / প্রথম সংস্করণ: জানুয়ারি ২০০৩ / আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা ৯ পৃ. ১২৮ / মূল্য ৭৫.০০ / প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কৃষ্ণেন্দু চাকী / উৎসর্গ: প্রশান্ত মাজি-কে
বকদিঘিকে চ্যালেঞ্জ দিলেন রাজশেখর
চারদিন আগে আটঘরা থেকে রাত্রে টেলিফোনে খবর এসেছিল অপু ফুটবল খেলতে গিয়ে বাঁ পায়ের গোছ ভেঙেছে। পরদিন সকালে সত্যশেখর মোটরে করে অপুর মাকে হাওড়া স্টেশনে নিয়ে গিয়ে তারকেশ্বর লোকালে তুলে দিয়ে আসে। যাওয়ার সময় রাজশেখর বলে দেন, ”যদি বোঝো ব্যাপারটা গুরুতর, তা হলে অপুকে মোটরে কলকাতায় নিয়ে আসবে। খরচের জন্য চিন্তা করবে না।”
