”তুমি বলতে চাও কী?” কলাবতীর খটকা লাগল কথাগুলো শুনে। নিশ্চয় কিছু একটা ভেবে অপুর মা কথাটা বলল।
”বলতে চাই খয়েরিকে মঙ্গলার বাচ্চচাদের কাছে নিয়ে যাও।” দু’ হাত শূন্যে তুলে কলাবতী চেঁচিয়ে উঠল, ”দি আইডিয়া।” সে ছুটে গেল সত্যশেখরের ঘরে। ”কাকা, প্রবলেম সলভড। এখনই খয়েরিকে নিয়ে যেতে হবে বড়দির বাড়ি, মঙ্গলার বাচ্চচাদের ও দুধ খাওয়াবে। এটা অপুর মার সাজেশন। আবার তুমি গাড়ি বার করো।”
ফিটনের ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। টর্চ জ্বেলে হাজির হল অপুর মা আর কলাবতী। খয়েরি কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল। বাচ্চচারা ছড়িয়ে—ছিটিয়ে ঘুমোচ্ছে। খয়েরি উঠে দাঁড়াল ওদের দেখে।
অপুর মা ডাকল, ”খয়েরি, আয় আমার সঙ্গে।” কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সে আবার ডাকল। ”আয়, আয়।”
খয়েরি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অপুর মা’র পিছু নিল। কলাবতী তাকে পাঁজাকোলা করে মোটরে তুলল। ইতিমধ্যে রাজশেখর টেলিফোনে হরিশঙ্করকে জানিয়ে দিয়েছেন খয়েরিকে নিয়ে কালু আর অপুর মা যাচ্ছে। ওরা পৌঁছেই দেখল দরজার ব্যগ্র মুখে হরিশঙ্কর দাঁড়িয়ে তাদের জন্য।
গাড়ি থেকে নেমেই খয়েরি মুখ তুলে ”ঘৌ উ উ উ উ” ডাক দিল। কলাবতীর মনে হল ও মঙ্গলাকে যেন বলছে আমি এসেছি। গামলাভরা বাচ্চচাগুলিকে বৈঠকখানায় এনে রাখা হয়েছে। খয়েরি এগিয়ে গিয়ে বাচ্চচাগুলোকে প্রথমে শুঁকল, তারপর কলাবতী আর অপুর মার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল। অপুর মা ওর গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে চাপ দিয়ে কাত করে শুইয়ে দিল। তারপর সে গামলা থেকে একটি একটি করে বাচ্চচা তুলে খয়েরির বুকের কাছে রেখে দিল। ক্ষুধার্ত বাচ্চচাগুলো আঁকুপাঁকু করে হামলে পড়ল খয়েরির ওপর। মাথা ঘুরিয়ে খয়েরি ওদের গা চাটতে শুরু করল।
হরিশঙ্কর পাশের ঘর থেকে মলয়াকে ডেকে আনলেন দেখার জন্য। বাচ্চচাদের দুধ খাওয়াতে দেখে মলয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সত্যশেখর বলল, ”এখনকার মতো তো সমস্যা মিটল, কিন্তু এর পর?”
অপুর মা বলল, ”ওর নিজের তো বাচ্চচা রয়েছে, তাদেরও তো দুধ খাওয়াতে হবে। অত বাচ্চচাকে পারবে কি?”
হরিশঙ্কর বললেন, ”খয়েরি আজ রাত্তিরটা এখানেই থাকুক, কাল সকালে ওকে দিয়ে আসব।”
তার কথামতো খয়েরি রয়ে গেল। খয়েরির বাচ্চচারা সারারাত একা—একা কাটাল। খিদের জ্বালায় মাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে ওরা ফিটনের ঘর থেকে রাত্রে বেরিয়ে আসে দরজার বাইরে। সকাল ন’টা বেজে গেল তবুও খয়েরিকে ওরা পাঠাচ্ছে না দেখে কলাবতী ফোন করল। ওধার থেকে হরিশঙ্কর বললেন, ”এই পাঠাচ্ছি। খয়েরি এখন বাচ্চচাদের দুধ খাওয়াচ্ছে।”
ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে কলাবতী গাড়ি বারান্দায় এসে দাঁড়াল। খয়েরিকে এখনও ওরা পাঠায়নি। সে অধৈর্য বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল, রাতে ওকে না রেখে এলেই হত। ওর নিজের বাচ্চচাদেরও তো খাওয়া দরকার। পায়চারি করতে করতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল ফিটনের ঘরের দিকে। গোটা কুড়ি কাক ঘরের মাথায়, পাঁচিলের ওপর আর গাছের ডালে বসে তারস্বরে চিৎকার করে ওড়াউড়ি করে চলেছে। রেলিংয়ে ঝুঁকে সে ফিটনের ঘরের দরজাটা দেখার চেষ্টা করল। যা দেখল তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেল। দুটো চিল ঠুকরে ঠুকরে ছিঁড়ে কী যেন খাচ্ছে।
চিৎকার করে, ”দাদু, অপুর মা, মুরারিদা” বলে উঠে কলাবতী সিঁড়ির দিকে ছুটল। ছ—সাতটা লাফে একতলায় পৌঁছে, ”মেরে ফেলল, মেরে ফেলল” বলে চেঁচাতে চেঁচাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফিটনের ঘরের দিকে পাগলের মতো ছুটে গেল। তার পেছনে ছুটল অপুর মা, মুরারি আর এক ঠিকে ঝি।
পাঁচটা বাচ্চচা নিথর হয়ে পড়ে আছে। চিল দুটো বাচ্চচার পেট ঠোঁট দিয়ে চিরে নাড়িভুঁড়ি বার করে খাচ্ছে। কয়েকটা কাক চিল দুটোর তিন—চার হাত দূরে কা—কা করে ওড়াউড়ি করছে। কলাবতী এধার—ওধার তাকিয়ে একটা বাঁশের টুকরো দেখতে পেয়ে তুলে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে, ”ভাগ ভাগ” বলে এগিয়ে গেল চিলদুটোর দিকে।
”হায় হায় হায়, কী সব্বোনাশ হল গো।” অপুর মা এই বলে ঝুঁকে পড়ল বাচ্চচাগুলোর ওপর। ”এখন আমি খয়েরির কাছে মুখ দেখাব কী করে কালুদি। ওকে তো আমিই বাচ্চচাদের কাছ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ও—বাড়িতে দিয়ে এনু। রেতে যদি ওকে আনতুম তাইলে এই সব্বোনাশটা হতনি গো।” অপুর মা কপাল চাপড়াতে লাগল।
মুরারি বলল, ”দ্যাখ তো এখনও একটা যেন বেঁচে আছে মনে হচ্ছে।” পেটের কাছটা সাদা তা ছাড়া আগাগোড়া খয়েরি লোমের বাচ্চচাটার মাথা নড়ছে, মুরারি আঙুল দিয়ে দেখাল। সন্তর্পণে আলগোছে অপুর মা বাচ্চচাটাকে তুলে নিল। ‘দেখি বাঁচাতে পারি কি না।’
কলাবতীর তাড়া খেয়ে কাক—চিলেরা উড়ে গিয়ে ছাদের ওপর বসল। গাড়ি বারান্দা থেকে রাজশেখর বললেন, ”মুরারি ওখানেই মাটি খুঁড়ে ওদের কবর দিয়ে দে, খয়েরি এসে বাচ্চচাদের মরামুখ যেন না দেখে।”
মৃতপ্রায় বাচ্চচাটিকে অপুর মা বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেল, মুরারি একটা কোদাল এনে জমি খুঁড়তে শুরু করল। কলাবতী একদৃষ্টে মরা বাচ্চচাগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে। চারটে বাচ্চচাকে গর্তে শুইয়ে মুরারি মাটিচাপা দিল।
তার মিনিটখানেক পরেই মলয়ার মোটর সিংহিবাড়িতে ঢুকল। গাড়ি থেকে নামল মলয়া আর খয়েরি। নেমেই খয়েরি খোঁড়াতে খোঁড়াতে ছুটে গেল ফিটন ঘরের দিকে, ঘরের ভিতরে ঢুকে বাচ্চচাদের দেখতে না পেয়ে ঘরের এধার—ওধার ঘুরে ঘুরে মেঝেয় কিছুক্ষণ শোঁকাশুঁকি করে বেরিয়ে এসে চাপা গলায় বাচ্চচাদের ডাকল।
