”বড়দি শুনেছেন তো খয়েরির বাচ্চচা হয়েছে, পাঁচটা।” উচ্ছ্বাস চেপে কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে কলাবতী বলল। মঙ্গলার কষ্টের কথা শোনার পর আনন্দ প্রকাশ করা যায় না।
”বাচ্চচা হওয়ার খবর তো সকালেই মুরারি দিয়ে গেছে, সেইসঙ্গে সন্দেশও। কেমন আছে খয়েরি, বাচ্চচারা দেখতে কেমন হয়েছে?”
”মায়ের মতো অত সুন্দর কেউ নয়।”
”আমার মন খুব খারাপ। কাল স্কুলে যাব না। মঙ্গলার কাছেই সারাক্ষণ রয়েছি, বেচারা খালি কাঁদছে। কী যে হবে জানি না।” মলয়া ভিজে গলায় কথাগুলো বলে ফোন রেখে দিল।
পরদিন সকালে কলাবতী মলয়াকে ফোন করে জানল, মঙ্গলার কষ্ট আরও বেড়েছে। ডাক্তার বলছেন আর দেরি নয়, বাড়িতেই সিজারিয়ান অপারেশন করবেন। একতলায় একটা ফাঁকা ঘর আছে, সেখানে একটা বড় টেবল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ডাক্তারের সঙ্গে থাকবেন দু’জন সহকারী। মঙ্গলার হার্টের অবস্থা খুব ভাল নয়।
কলাবতী ভাবল স্কুল ছুটির পর মঙ্গলাকে দেখে আসবে। ছুটির পর মলয়াদের বাড়ির দিকে কিছুটা হেঁটে হঠাৎ কী এক অজানা ভয় তার মনে ধরল। সে আর না এগিয়ে বাড়ি ফিরে এল। ফটকে আজ খয়েরি তার জন্য অপেক্ষায় ছিল না। সে ফিটনের ঘরে গিয়ে দেখল পাঁচটা বাচ্চচা জড়ামড়ি করে একের ঘাড়ে অন্যজন ওঠার চেষ্টা করছে। দুটো বাচ্চচা খুবই রুগণ, বোধ হয় বাঁচবে না। খয়েরি জিভ দিয়ে ওদের গা চেটে চলেছে। কলাবতীকে দেখে শুধু একবার চোখ তুলে তাকাল। খয়েরির ভাতের থালাটা পরিষ্কার একটা কণাও পড়ে নেই। সে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে টিফিনবক্স বার করল। খয়েরির লেজ নড়ে উঠল।
সন্ধ্যায় ক্ষুদিরামবাবুর কাছে কলাবতী যখন পড়ছে তখন মলয়াদের বাড়ি থেকে ফোন এল, ধরলেন রাজশেখর। অপর প্রান্তে মলয়ার গলায় তিনি শুনলেন শুধু একটি বাক্য, ”জ্যাঠামশাই মঙ্গলা আর নেই।” এর পর হাউহাউ করে কান্নায় শব্দ এবং ফোন রেখে দেওয়া।
রাজশেখর খবরটা বাড়ির কাউকে তখন দিলেন না। কলাবতীর পড়া শেষ হওয়ার পর তিনি তাকে ডেকে বললেন, ”সতুকে গাড়ি বার করতে বল কালু, হরির বাড়িতে যাব। মঙ্গলা মারা গেছে।”
শোনামাত্রা কলাবতীর মুখ থেকে আর্তনাদের মতো একটা শব্দ বেরিয়ে এল। সে ছুটে গেল কাকার সেরেস্তায়। একটু পরেই হন্তদন্ত হয়ে সত্যশেখর দোতলায় উঠে এল। ”বাবা এ কী শুনছি?”
”মলয়া ফোন করে আমায় জানিয়েছে কিছুক্ষণ আগে।’ ধীর স্তিমিত গলা রাজশেখরের।
দশ মিনিটের মধ্যে ওঁরা তিনজন মলয়াদের বাড়ি পৌঁছলেন। রাজশেখর তিরিশ বছর আগে হরিশঙ্কর মুখুজ্জের মায়ের শ্রাদ্ধে শেষবার এই বাড়িতে এসেছিলেন তারপর আজ এলেন। বাড়ির বাইরের আলোগুলো নেভানো। ভেতরেও টিমটিম করছে একটি—দুটি। সাড়াশব্দ নেই কোথাও।
”আয়।” হরিশঙ্কর ডাকলেন রাজশেখরকে, নিয়ে বসালেন, বৈঠকখানায়।
”মলয়া কোথায়?” রাজশেখর নিচুগলায় জিজ্ঞেস করলেন।
”পাশের ঘরে।”
সত্যশেখর আর কলাবতী পাশের ঘরে গিয়ে দেখল, মঙ্গলাকে টেবলেই শুইয়ে রাখা হয়েছে গলা পর্যন্ত একটা সাদা চাদরে ঢেকে। তার পাশে দাঁড়িয়ে মলয়া হাত বুলিয়ে যাচ্ছে মৃত মঙ্গলার মাথায়।
ঘরের একধারে একটা বড় প্লাস্টিকের গামলায় মঙ্গলার বাচ্চচারা স্তূপ হয়ে রয়েছে। পলতে পাকানো ন্যাকড়া গোরুর দুধে ডুবিয়ে চাকর চেষ্টা করছে ওদের খাওয়াতে। কয়েক ঘণ্টা বয়সী বাচ্চচারা পারছে না পলতে চুষে দুধ খেতে।
কলাবতী ফিসফিস করে চাকরটিকে জিজ্ঞেস করল, ”ক’টা বাচ্চচা হয়েছে?”
”সাতটা। তার মধ্যে দুটো মরা।”
”এভাবে কি ওরা খেতে পারে? ড্রপারে করে খাওয়াতে হবে।” কলাবতী পরামর্শ দিল।
”চেষ্টা করেছি, মুখ থেকে ফেলে দিল।” চাকরটির অসহায়ত্ব গলায় ফুটল।
সত্যশেখর বলল, ”ফিডিংবটলে করে খাইয়ে দেখা যেতে পারে। তুমি দৌড়ে স্টেশনারি দোকান থেকে একটা কিনে আনো।”
ম্যানিব্যাগ থেকে সে টাকা বার করে দিল। রাজশেখর ঘরে এলেন, সঙ্গে হরিশঙ্কর। মলয়ার মাথায় হাত রেখে রাজশেখর বললেন, ”মঙ্গলা যাদের রেখে গেল এবার তাদের তো দেখতে হবে। ওদের মধ্য দিয়েই মঙ্গলা বেঁচে থাকবে।”
.
মুখ ফিরিয়ে মলয়া গামলাটার দিকে তাকাল। তার চোখ দিয়ে টপটপ জল ঝরে পড়ল। চাকরটি একটি দুই খাওয়াবার ফিডিং বটল আনল। তাতে দুধ ভরে সে নিপলটা একটা বাচ্চচার মুখে ঢোকাল। কিন্তু অত বড় মোটা নিপল মানুষের বাচ্চচাকে দুধ খাওয়াবার জন্য। অতটুকু সদ্যোজাত কুকুরের বাচ্চচা চুষে দুধ বার করতে পারল না।
”তাহলে কী হবে?” হরিশঙ্কর দুশ্চিন্তায় পড়লেন। ”এরা তো না খেয়ে মারা যাবে।”
গামলার মধ্যে পাঁচটা দৃষ্টিহীন বাচ্চচা নড়াচড়া করছে, কলাবতীর মনে হয় ওরা খিদেয় ছটফটাচ্ছে। কিন্তু কীই—বা তারা এখন করতে পারে! বাচ্চচাগুলো না খেতে পেয়ে হয়তো একে—একে মরে যাবে। এ—কথা ভেবে তার চোখে জল এসে গেল। সে আর এখানে থাকতে চাইল না, রাজশেখরকে কানে—কানে বলল, ”দাদু বাড়ি চলো।”
ওরা বাড়ি ফিরে আসতেই অপুর মা ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইল, মঙ্গলা মারা গেল কেন? কলাবতী তাকে কারণটা বলল, হার্টফেল। তারপর অপুর মা জিজ্ঞেস করল, ”বাচ্চচাক’টার কী হবে?”
মনের কষ্ট চেপে কলাবতী উদাসীন ভাবে বলল, ”কী আবার হবে, মায়ের দুধ না পেয়ে একসময় মরে যাবে।”
অপুর মা অবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ডে কলাবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”সে কী। মরে যাবে কেন? এই তো আমি দিব্যি বেঁচে আছি। আমাকে জম্মো দিয়েই তো মা মরে গেল। সেই সময় মাসির ছেলে হয়েছে। মাসিই তো আমাকে আর নিজের ছেলেকে একসঙ্গে বুকের দুধ খাওয়াত।”
