মুরারি কলাবতীকে দাঁড় করিয়ে পিঠ থেকে স্কুলব্যাগটা খুলে নিয়ে বলল, ”অপুর মা ওকে তুলে ঘরে নিয়ে গেছে, কত্তাবাবু পুলিশ আর ডাক্তারকে ফোন করছেন, তুমি কি পারবে আস্তে—আস্তে হেঁটে বৈঠকখানা পর্যন্ত যেতে?”
”আমার হয়েছে কী যে, পারব না?” এই বলে কলাবতী সটান হয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকল। অপুর মা তার নিজের ঘরের মেঝেয় খয়েরিকে শুইয়ে একটা ন্যাকড়া দিয়ে পা—টা বেঁধে রেখেছে। কলাবতী ঘরে ঢুকতেই খয়েরি মুখ তুলে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে লেজটা নাড়ল। হাড় ভেঙে ওর বাঁ পায়ের থাবাটা ঝুলে পড়েছে।
রাজশেখর ঘরে ঢুকে বললেন, ”ডাক্তার গুপ্ত অর্থোপেডিক সার্জন। তাকে ফোন করে পেলুম না, এখন কী করি?”
কলাবতী বলল, ”উনি তো মানুষের ডাক্তার। এখন দরকার ভেটারিনারি সার্জন, তুমি বরং বড়দিকে ফোন করো, মঙ্গলাকে যে ডাক্তার দেখেন তাকে কল করো।”
রাজশেখর ফোন করলেন মলয়াদের বাড়িতে। ফোন ধরলেন মলয়ার বাবা হরিশঙ্কর মুখুজ্জে।
”বলছিস কী রে রাজু, একটা নেড়িকুত্তার চিকিচ্ছের জন্য মঙ্গলার ডাক্তারকে চাই! অবাক করলি। বাড়িতে গেলে ডাক্তার পাল তিনশো টাকা নেন। দিবি?”
”হরি, তিনশো বলছিস কী রে তিন হাজার, তিন লক্ষ দেব। এই নেড়ি কুত্তাটাকে বাঁচাতেই হবে। ও আমার একমাত্র নাতনির প্রাণরক্ষা করেছে। হরি এসব বোঝার মতো ঘিলু তোর মাথায় নেই। মলু কোথায়, ফোনটা ওকে দে।”
আধঘণটার মধ্যে ডাক্তার পালকে নিয়ে মলয়া হাজির হল সিংহি বাড়িতে। শেষবার সে এ বাড়িতে এসেছিল মাধ্যমিকে থার্ড স্ট্যান্ড করে রাজশেখরকে যখন প্রণাম করতে আসে। ডাক্তার পাল খয়েরির পা দেখে বললেন, হাড় ভেঙেছে, অপারেশন করে ঠিক করতে হবে।
লোকাল অ্যানাসথেসিয়া করে ডাক্তার পাল ভাঙা হাড় জুড়লেন। সারাক্ষণ অপুর মার কোলে মাথা রেখে খয়েরি ঘরের লোকেদের মুখগুলো শুধু দেখে গেল। তার মুখ দেখে মনে হল সে যেন বুঝতে চাইছে—আমাকে নিয়ে আবার এত বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে কেন!
অপুর মা বলল, ”ডাক্তারবাবু খয়েরি মা হবে, ওর পেটের বাচ্চচাদের কোনও ক্ষেতি হবেনি তো?”
খয়েরির পায়ে প্লাস্টার করতে—করতে ডাক্তার বললেন, ”কোনও ক্ষতি হবে না। তবে বোধ হয় খোঁড়া হয়ে যাবে। অসম্ভব শান্ত আমাদের দিশি কুকুররা। পৃথিবীর যে—কোনও দেশের কুকুরদের সঙ্গে টক্কর দিতে পারে। আপনি কিছু ভাবছেন না।” ডাক্তার পাল খয়েরির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন।
সেই গুণ্ডাটি পালাতে গিয়ে সিংহিবাড়ির কাছেই জনতার হাতে ধরা পড়ে এবং গণপ্রহারে মারা যায়। পুলিশ একজনও ডাকাত ধরতে বা ছ’ লাখ টাকা উদ্ধার করতে এখনও পারেনি।
পায়ে প্লাস্টার করা খয়েরি আশ্রয় পেল সিংহিবাড়ির ভেতরে একতলায় সিঁড়ির নিচে। আগে এই জায়গায় সত্যশেখরের প্রিয় জার্মান শেফার্ড কুকুর হিটলার থাকত। জায়গাটাকে সে বলত, ‘হিটলারের বাঙ্কার।’ পঁচিশ বছর পর বাঙ্কারে এল আদ্যন্ত বাঙালি খয়েরি, তবে দেড়মাসের জন্য। পায়ের প্লাস্টার কাটার পর ক্ষতস্থান শুকোতেই সে আবার ফিরে যায় নিজের আস্তানা ফিটনের ঘরে। খোঁড়াতে—খোঁড়াতে সে বাগানে ঘুরে বেড়ায় আর ফটক পর্যন্ত গিয়ে কলাবতীর জন্য বিকেলে অপেক্ষা করে।
.
সকালে খাওয়ার টেবলে একবাক্স দানাদার দেখে সবাই অবাক! মুরারি মাথা চুলকে বলল, ”অপুর মার কাণ্ড। বলল মুরারিদা এমন একটা শুভদিনে সবাইকে মিষ্টিমুখ না করালে কি চলে? ও দশটা টাকা দিল, আমিও দশটা টাকা দিলুম।”
রাজশেখর অবাক হয়ে বললেন, ”কীসের শুভদিন?”
সত্যশেখর আর কলাবতী জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল মুরারির দিকে। একবার দরজার দিকে তাকিয়ে মুরারি বলল, ”কত্তাবাবু, আপনার আটঘরার মেয়েই বলুক। আয় রে খবরটা তুই দে।”
অপুর মা ঘরে ঢুকে কোনও ভণিতা না করে যথাসম্ভব তার বিখ্যাত গলাটা চেপে বলল, ”খয়েরি আজ ভোরে মা হয়েছে, পাঁচটা বাচ্চচা।”
কলাবতীর আগেই রাজশেখর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। সত্যশেখর বাক্স থেকে দানাদার তুলে মুখে ঢোকাতে গিয়ে থমকে বলল, ”পাঁচ—পাঁচটা?”
”সতু, তোমার কাছে তো নগদ টাকা থাকে না কিন্তু এখন কি তোমার পকেটে কয়েকটা টাকা আছে চন্দ্রপুলি কেনার মতো?” রাজশেখর গম্ভীর সিরিয়াস গলায় বললেন।
সত্যশেখর পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে কয়েকটা নোট বার করে কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ”বাবা শ’ তিনেক হবে।”
”মুরারি ফেলু ঘোষের দোকানে এক্ষুনি যা। চন্দ্রপুলি বাসী হলেও নিয়ে নিবি, না থাকলে কড়াপাক। ফেরার সময় অর্ধেকটা মলয়াকে দিয়ে খবরটা দিবি।”
এর পর সারা সিংহিবাড়ি ফিটনের ঘরে গিয়ে হাজির হল। একটা চটের ওপর খয়েরি হাত—পা ছড়িয়ে পাশ ফিরে শুয়ে। কালো খয়েরি সাদা লোমের, ধাড়ি ইঁদুরের সাইজের পাঁচটা চোখ—না—ফোটা বাচ্চচা তার বুকের কাছে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে। কলাবতী একটা বাচ্চচা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই অপুর মা ধমকে উঠল, ”হাত দিউনি, গায়ে নোনা লাগবে। আর একটু বড় হোক।”
সত্যশেখর বলল, ”একটা বেবি কটে বাচ্চচাগুলোকে রাখলে কেমন হয়, কালু কী বলিস?”
”অপুর মাকে জিজ্ঞেস করো।”
কথাটা বুঝে নিয়ে অপুর মা বলল, ”কটমট আবার কী, মায়ের পাশে না থাকলে ওরা দুধ খাবে কী করে?”
সন্ধ্যায় ফোন এল কলাবতীর কাছে, করেছে মলয়া। তার গলায় দুশ্চিন্তা, ”কালু, কাল রাত থেকে মঙ্গলার লেবার পেন উঠেছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ডাক্তার পাল দুপুরে এসেছিলেন, বললেন আরও চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করে দেখতে, নাহলে সিজারিয়ান করবেন।”
