এর দু’দিন পর কলাবতী স্কুল থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। আজ বিকেলে তার সল্টলেকে প্র্যাকটিসে যাওয়ার দিন নয়। হাওয়াই শার্ট পরা পাতলা গড়নের একটা লোক, যে তাকে স্কুলের গেট থেকে পিছু নিয়েছে তা সে জানে না। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে—করতে সে আসছিল। বন্ধুরা যে যার বাড়ির পথে চলে যেতে সে একাই সিংহিবাড়ির ফটকে পৌঁছল। দূর থেকেই সে দেখেছিল ফটকের সামনে রাস্তায় খয়েরি তার জন্য বসে আছে। প্রতিদিনই বসে থাকে তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য। সদর দরজা পর্যন্ত গিয়ে কলাবতী স্কুল ব্যাগ থেকে টিফিনবক্স বার করবে। খয়েরি তখন দ্বিগুণ বেগে লেজটা নাড়তে—নাড়তে সামনের দু’ পা কলাবতীর কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে উঠে, ”উঁ উঁ” শব্দ করে খাবার চাইবে। না খেয়ে ওর জন্য রেখে দেওয়া টিফিনের খাবার কলাবতী যতক্ষণ না মুখে তুলে দিচ্ছে, খয়েরি নাছোড়বান্দার মতো বারবার দাঁড়িয়ে উঠে খাবার চাইবে। অবশ্য এই সামান্য খাবারে ওর পেট ভরবে না। কিন্তু এটা প্রতি বিকেলে ওর করা চাই—ই। খয়েরি মনে করে রেখে দিয়েছে কলাবতীর সঙ্গে তার প্রথম ভাব হয়েছিল এই টিফিন খাওয়া থেকেই। আজও সে যত অল্পই হোক কলাবতীর হাত থেকে টিফিন খাবেই আর কলাবতীও ওর জন্য টিফিনের ভাগ রেখে দেবেই।
আজও কলাবতী দূর থেকে দেখল ফটকের সামনে খয়েরি উঠে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। সে কাছাকাছি এলে খয়েরি ফটক দিয়ে আগে ঢুকে কয়েক পা গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে তারপর সঙ্গে—সঙ্গে যাবে সদর দরজা পর্যন্ত। এটাই রোজ হয়ে থাকে। কলাবতী ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকল। তার পিছু নেওয়া লোকটি ফটক পর্যন্ত এসে থমকে দাঁড়াল, দু’পাশে ও ভেতরে তাকিয়ে দেখে নিল লোকজন আছে কিনা। রাস্তা দিয়ে দু’চারজন যাচ্ছে বটে কিন্তু ভেতরের বাগানে একটা কুকুর ছাড়া আর কাউকে সে দেখতে পেল না। লোকটা চট করে ফটক পেরিয়ে ঢুকল।
”অ্যাই অ্যাই, দাঁড়াও তো।”
কর্কশ গলায় ধমকের মতো কথাগুলো শুনে অবাক কলাবতী ঘুরে দাঁড়াল। চকরাবকরা হাওয়াই শার্ট পরা, বেঁটে, কালো বিশ্রী মুখের একটা লোককে সে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখল।
”কী বলেছ তুমি পুলিশকে, অ্যাঁ?” লোকটা বাঁ হাতে কলাবতীর ব্লাউজের কলার ধরে খুব জোরে ঝাঁকুনি দিল। কলাবতীর গলায় ও ঘাড়ে ব্যথা লাগল। তার মধ্যেই সে ”গররর” একটা আওয়াজ শুনতে পেল।
লোকটা কলার ছাড়েনি। আরও দু’—তিনবার ঝাঁকুনি দিয়ে চাপা গলায় হিংস্র স্বরে বলল, ”কী বলেছ, অ্যাঁ কী বলেছ?”
কলাবতী বুঝে গেছে গায়ের জোরে সে এই গুণ্ডার সঙ্গে পারবে না। মুখটা নিচু করে সে গুণ্ডার হাতটা কামড়ে ধরল সজোরে। দাঁত বসে গেল আঙুলের ওপর দিকে।
”আহহহ।” চিৎকার করে উঠেই গুণ্ডাটা ডান হাতে কলাবতীর গালে ঘুসি মারল। টলে পড়ে গেল কলাবতী। পড়ার সময় তার কানে এল, ”খ্যা খ্যা খ্যা খ্যা” একটা শব্দ।
গুণ্ডাটা জামা তুলে প্যান্টে গুঁজে রাখা একটা ছোরা বার করে কলাবতীর গলার কাছে ধরে বলে উঠল, ”কী বলেছ পুলিশকে, কী বলেছ? না বললে এই ছোরা গলায় ঢুকিয়ে দেব।”
কলাবতী চোখে অন্ধকার দেখছে। চিৎকার করে কাউকে যে ডাকবে সে জোরও তার গলায় নেই। শুকিয়ে গেছে গলা। ছোরার ঠাণ্ডা ছুঁচোলো আগাটা তার গলায় খোঁচা দিচ্ছে। সে হাঁটু গেড়ে বসা গুণ্ডাটার চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেল। তার মনে হচ্ছে ছোরাটা তার গলায় সত্যিই ঢুকিয়ে দেবে। অজ্ঞান হয়ে পড়ার আগে শুনতে পেল খয়েরির গলায় যা কখনও শোনেনি এমন একটা হাড়কাঁপানো হিংস্র গর্জন— ”ঘউউঅউঅউ।”
গুণ্ডাটার ডান পায়ের ডিমের কাছটায় খয়েরি কামড়ে ধরে মুখটা ঝাঁকাচ্ছে। প্যান্টের মধ্য দিয়ে তার দাঁত বসে গেছে মাংসে। ছোরা ধরা হাতটা সে ঘুরিয়ে সজোরে চালাল খয়েরির উদ্দেশ্যে। ছোরাটা লাগল খয়েরির সামনের বাঁ পায়ের থাবার ওপরে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে বেরোল। কিন্তু খয়েরি তার কামড় আলগা করল না।
ঠিক এই সময় বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অপুর মা। চোখের সামনে কলাবতীকে শুয়ে থাকতে, একটা লোককে ছোরা হাতে এবং খয়েরি তাকে কামড়ে ধরে আছে দেখে সে তার বিখ্যাত আকাশ ফাটানো গলায় চিৎকার করে উঠল, ”ওগো কে কোথায় আছ গো, ডাকাতে কালুদিদিকে মেরে ফেলল গো।” বলতে—বলতে অপুর মা ছুটে গেল গুণ্ডাটার দিকে। চিৎকার শুনে রাস্তা দিয়ে যাওয়া দুটি লোক ফটকের সামনে থমকে দাঁড়াল, গাড়ি বারান্দায় ছুটে এলেন রাজশেখর। অপুর মা একটা আধলা ইট কুড়িয়ে নিয়ে ছুটলেন গুণ্ডাটার দিকে।
গতিক সুবিধের নয় বুঝে, কুকুরের কামড়ের যন্ত্রণা এবং সেকেলে ডাকাতদের মতো পিলে চমকানো হাঁক দিয়ে আসা রণরঙ্গিণী মূর্তিটিকে দেখে গুণ্ডাটি ফটকের দিকে দৌড় দিল। খয়েরি তাড়া করতে গিয়ে কয়েক পা দৌড়ে লুটিয়ে পড়ল। রাজশেখর তার দোনলা বন্দুকে কার্তুজ ভরে আবার যখন গাড়ি বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন তখন অপুর মার ছোড়া ইটটা ফটকের লোহার গরাদে লেগে ‘ঠং’ করে শব্দ তুলেছে আর গুণ্ডাটা খোঁড়াতে—খোঁড়াতে তখন রাস্তা দিয়ে দৌড়চ্ছে এবং একদল লোক তার পেছনে ছুটছে।
কলাবতীর জ্ঞান একটু পরেই ফিরে এল। প্রথমেই সে বলল, ”খয়েরি কোথায়?”
