কলাবতী আলগোছে বলল, ”জিজ্ঞেস করলে আমি বলতুমই বা কী? সবাই যা দেখেছে আমিও তাই দেখেছি। কী জিজ্ঞেস করল পুলিশ?”
”কাউকে চেনা মনে হল কি না, দেখলে চিনতে পারবেন কি না, এইসব। আজও তো ওরা এসে জিজ্ঞেস করছে, ঘুরে—ঘুরে দেখছে, ওই দ্যাখো না দুটো লোক। ডাকাতরা কি আর কোনও ক্লু রেখে গেছে যে, চাইলেই পেয়ে যাবে।” লোকটি তাচ্ছিল্যভরে তাকাল।
কলাবতী দেখল হাওয়াই শার্ট পরা সাধারণ চেহারার দুটি লোককে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার টেবলের ড্রয়ার টেনে খুলে—খুলে দেখাচ্ছেন। এর পর ওই দু’জনের একজন নিজে ড্রয়ার টানাটানি শুরু করল।
ব্যাঙ্কে আজও বেশ ভিড়। কলাবতী সরে গিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াল। তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, লোকটির কথাগুলো—কাউকে চেনা মনে হল কি না, দেখলে চিনতে পারবেন কি না। নাহ, চেনা মনে হওয়ার কোনও উপায়ই ছিল না। সবাই মুখ ঢেকে রেখেছিল রুমালে, শুধু চোখদুটো দেখা যাচ্ছিল। তাই দিয়ে কাউকে পরে চেনা সম্ভব নয়, কেউ কথা বলেনি শুধু লিডার ছাড়া। গলার আওয়াজটা তার মনে আছে শুনলে হয়তো চিনতে পারবে।
একটু পরেই তার টোকেন নাম্বার ধরে ডাক হল। কলাবতী পেমেন্ট কাউন্টারের দিকে এগোল। তার আগের লোক টাকা পেয়ে তখন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে গুনছে। গুনতে—গুনতে লোকটি আঙুল দিয়ে দু’—তিনবার চোখের কোণ ঘষল। তাই দেখে কলাবতীর হঠাৎই ডাকাতদের নেতার কথা মনে পড়ে গেল, সেও চোখের নীচে চুলকোচ্ছিল, একটা আঁচিল, চোখটা আধবোজা…এই তো ক্লু!
.
টাকা নিয়ে সে কাউন্টার ঘুরে ব্যাঙ্কের ভেতরে ঢুকল। কোথায় পুলিশের লোক দু’জন? সে এধার—ওধার তাকিয়ে তাদের দেখতে পেল না। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করল, তিনি বললেন, ”ওরা তো এইমাত্র চলে গেল। কেন, কী দরকার?”
”দরকার আছে।” বলেই কলাবতী ছুটল কোলাপসিবল গেট লক্ষ করে। লোক দু’টি তখন একটা জিপে উঠতে যাচ্ছে।
”এই যে, এই যে, শুনুন।” হাত তুলে সে দৌড়ে গেল। লোকদুটি ফিরে তাকাল।
হাঁফাতে—হাঁফাতে কলাবতী বলল, ”আপনাদের আমি একটা ক্লু দিতে পারি। কাল যে ডাকাতিটা হল তার লিডারের বাঁ চোখের নীচেই একটা বড় আঁচিল আছে আর লোকটার বাঁ চোখটা আধবোজা।”
ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করার পর একজন বলল, ”চলো, ভেতরে চলো।”
লোকদুটি কলাবতীকে নিয়ে ব্যাঙ্কের ভেতরে এসে ম্যানেজারের ঘরে ঢুকল। একজন বিনীতভাবে ম্যানেজারকে বলল, ”আপনার কাজে একটু ব্যাঘাত ঘটাব। আমরা এই মেয়েটির সঙ্গে একটু কথা বলব। জরুরি গুরুত্বপূর্ণ কথা, বাইরে বসে বলতে চাই না।”
ম্যানেজার শশব্যস্ত বললেন, ”বসুন, বসুন। যতক্ষণ ইচ্ছে কথা বলুন।”
লোকদুটির একজন নোটবই বার করল পকেট থেকে। কলাবতীর নাম, বাড়ির ঠিকানা, কে কে আছে বাড়িতে, কোন স্কুলে কোন ক্লাসে পড়ে, কীজন্য কাল ব্যাঙ্কে এসেছিল, চেকটা কার ছিল ইত্যাদি জেনে নিয়ে প্রশ্ন করল, ”তুমি ঠিক দেখেছ বাঁ চোখের নীচে আঁচিল আছে আর চোখটা ডিফেক্টিভ।”
কলাবতী জোর দিয়ে বলল, ”হ্যাঁ, ঠিক দেখেছি। লোকটা যখন দেখল আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি তখন তাড়াতাড়ি রুমালটা টেনে তুলল আর বারকয়েক আমার দিকে তাকাল। আমি যে আঁচিলটা দেখে ফেলেছি সেটা ও বুঝতে পেরেছে মনে হল।”
লোকটি খসখস করে তার কথাগুলো লিখে নিয়ে বলল, ”আমাদের কাছে ডাকাতদের যেসব ছবি আর চেহারার বর্ণনার ফাইল আছে তোমার কথামতো সেখানে আমরা খুঁজব। আমাদের যা বললে সেসব কথা আর কাউকে কি বলেছ?”
”আপনাদেরই প্রথম বললুম।”
অন্য লোকটি বলল, ”একদম এই নিয়ে কাউকে একটি কথাও বলবে না। বললে বিপদ হতে পারে। এখন তুমি আসতে পারো, অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।”
বাড়ি ফিরে কলাবতী ব্যাঙ্ক থেকে তোলা টাকাগুলো দাদুকে দিয়ে পুলিশ দু’জনকে সে যেসব কথা বলেছে তা বলল। শুনে রাজশেখরের মুখ উদ্বেগে ভরে গেল।
”তুই বলে ভালই করেছিস কিন্তু ওই যে বিপদের কথা বলল সেটা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার নয়। তুই যেমন ডাকাতটার মুখ দেখেছিস তেমনই ডাকাতটাও তোর মুখ দেখে রেখেছে। যদি ও জানতে পারে তুই পুলিশকে বলে দিয়েছিস মুখে কী কী চিহ্ন আছে, তা হলে কিন্তু লোকটা তোকে আঘাত করতে পারে।” রাজশেখর থেমে—থেমে চিন্তিত স্বরে বললেন।
কলাবতীর বুকের মধ্যে হালকা একটা ভয় মেঘের মতো উড়ে গেল। ফুঁ দিয়ে সেটা সরিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে সে বলল, ”লোকটা জানবে কী করে পুলিশকে আমি বলেছি। সেখানে তো ছিলেন শুধু ম্যানেজার, তিনি নিশ্চয় ডাকাতটাকে বলতে যাবেন না।”
”পুলিশের মধ্যেও গুণ্ডাবদমাশদের লোক আছে, তারা জানিয়ে দেবে।”
তিনদিন পর বিকেলে একটা টেলিফোন এল। রিসিভার তুলে রাজশেখর বললেন, ”রাজশেখর বলছি।”
ওধার থেকে একজন পুরুষ শান্ত গলায় বলল, ”কলাবতী আপনার কে হয়?”
”নাতনি।”
শীতলকণ্ঠে লোকটি বলল, ”ওকে বারণ করে দেবেন যেন ডাকাত চেনাবার জন্য উৎসাহ না দেখায় আর সাবধানে থাকতে বলবেন।”
রেগে উঠে বললেন রাজশেখর, ”যদি উৎসাহ দেখায় তা হলে কী করবেন?”
আরও ঠাণ্ডা গলায় উত্তর এল, ”তা হলে চিরকালের মতো উৎসাহ দেখানো বন্ধ করে দেব।”
রাজশেখর জবাব দেওয়ার আগেই ওধারে ফোন রেখে দিল। এই ফোন পাওয়ার কথাটা তিনি কাউকে বললেন না, কলাবতীকেও না। তাঁর মনে হল, ডাকাতরা এখনও জানে না কালু পুলিশকে ঠিক কী বলেছে। ফোনটা করেছে আন্দাজে, আগাম একটা হুমকি দিয়ে, ভয় দেখাতে। তবে কালু কী বলেছে সেটা ওরা ঠিকই জেনে যাবে।
