মোটরবাইক দুটো চলে যাওয়ার সঙ্গে—সঙ্গে ”ডাকাত, ডাকাত” রব যথারীতি উঠল। লোকজন বাইরে থেকে ছুটে এল। সবাই জানতে চায় কত টাকা ডাকাতি হয়েছে, কেউ মরেছে কিনা। ম্যানেজার মুহ্যমানের মতো হলঘরে বসে শুধু মাথা নেড়ে যাচ্ছেন। থানায় ও লালবাজারে খবর দেওয়া হয়েছে, পুলিশ আসছে। আজ আর ব্যাঙ্কের কোনও কাজকর্ম হবে না। টাকা নেওয়াও নয়, দেওয়াও নয়।
টোকেনটা সঙ্গে নিয়ে কলাবতী বাড়ি ফিরে এল। তার মন খুব খারাপ লাগছে কাকার সেই বেয়ারাটির কথা ভেবে, যে আজ সন্ধ্যায় এক হাজার টাকা নিতে আসবে। তার ছেলে কাল মুম্বই যাবে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে, হাতে একটা টাকাও নেই। মুম্বই তো আর রানাঘাট কি বর্ধমানের মতো একদিনেই যাতায়াত করা যায় না, হাজার—বারোশো মাইল দূরে তো হবেই। অতদূরে যেতে হলে কিছু টাকা তো সঙ্গে রাখা উচিত।
আজই স্কুলের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। সন্ধ্যাবেলায় তাকে নাটকে নামতে হবে। তার ইচ্ছে করছে না স্কুলে যেতে। দাদুকে সে ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনাটা সবিস্তারে বলল। আর বলল, কেন সত্যশেখর টাকাটা তুলতে তাকে পাঠিয়েছিল।
”সতুর কাছে এক হাজার টাকা নেই! আশ্চর্য! এক হাজার টাকা দেওয়ার জন্য সিংহিবাড়ির ছেলে কিনা চেক কাটল?” রাজশেখর রাগে গরগর করে কথাগুলো বলে শোয়ার ঘরে গিয়ে সিন্দুক থেকে দশটা একশো টাকার নোট বার করে এনে কলাবতীর সামনে ধরে বললেন, ”যা, মুরারির কাছে রেখে আয়।”
স্কুলের অনুষ্ঠানের পর রাত্রে বাড়ি ফিরে সদর দরজা পেরোতেই কলাবতী সেরেস্তা থেকে চাপা গলায় কাকার ডাক শুনল, ”কালু, একটু দাঁড়া।”
ঘর থেকে বেরিয়ে এল সত্যশেখর। কলাবতীর মুখে নাটকের মেকআপ, সত্যশেখরের মুখে বিপক্ষ কৌঁসুলির আচমকা তোলা নতুন এক পয়েন্ট। ”বাবাকে তুই বলেছিস আমার কাছে টাকা নেই?”
অবাক কলাবতী বলল, ”তা তো বলিনি। শুধু বলেছি চেকে টাকা তোলার জন্য আমাকে ব্যাঙ্কে পাঠিয়েছ। তোমার লোক টাকা নিতে এসেছিল?”
”এসেছিল, নিয়ে গেছে। নাটক কেমন হল?”
কলাবতী উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ”দারুণ হয়েছে। সবচেয়ে ভাল হয়েছে বড়দির, উকিলের পার্ট করেছিল। আমি করেছি মিথ্যে সাক্ষী দিতে আসা এক বুড়ির।”
”ব্যাঙ্কের টোকেনটা তোর কাছে রয়েছে, কাল গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসবি।” এই বলে সত্যশেখর ব্যস্ত হয়ে সেরেস্তায় ঢুকে গেল।
রাতে খাওয়ার টেবলে ব্যাঙ্ক ডাকাতি এবং স্কুলের নাটক নিয়ে কথাবার্তা হল। সত্যশেখর জানতে চাইল, ”কালু তুই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলি তো? এতদিন তো শুধু বইয়ের পাতায় আর সিনেমাতেই ডাকাত দেখেছিস, এবার রক্তমাংসের ডাকাত দেখা হয়ে গেল। কেউ যে রেজিস্ট করতে যায়নি এটাই বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে।”
রাজশেখর গর্জন করে উঠলেন, ”বুদ্ধিমান না ছাই। কাপুরুষের মতো কাজ হয়েছে। আটঘরার বাড়িতে একবার ডাকাত পড়েছিল। আমাদের শ্যামা পাইক লাঠি আর সড়কি নিয়ে একা মহড়া দিয়েছিল সেই ডাকাত দলের সঙ্গে, শেষে পালাবার পথ পায় না। গ্রামের লোক তাড়া করে চারটেকে ধরে ফেলে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে দেয় তিনদিন। শেষে মাফ চেয়ে নাকখত দিয়ে বলল, জীবনে আর ডাকাতি করবে না। তখন ওদের ছেড়ে দেওয়া হয়।”
”বাবা, এটা কোন সময়ের ঘটনা।” সত্যশেখর তেরছা চোখে তাকাল বাবার দিকে।
কলাবতী বলল, ”শুনলে না, লাঠি—সড়কি নিয়ে ডাকাতদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল, নাকখত দিইয়ে চারজনকে ছেড়ে দিয়েছিল। দাদু, এটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের ঘটনা, তাই না?”
”এইট্টিন ফিফটি নাইনের। সিপাহি বিদ্রোহের দু’ বছর পরে।” রাজশেখরের গলায় বনেদি আভিজাত্য ঝলসে উঠল। ”তখন বাঙালির সাহস ছিল।”
সত্যশেখর বলল, ”এখন পাইপগান—বোমা আর পিটিয়ে মেরে ফেলার আমল। এখন সাহস দেখায় শুধু ডাকাতরাই। লড়াই করার জন্য এখন কাছে আসতে হয় না। দূর থেকেই গুলি করে দেয়, বোমা ছোড়ে। মানুষ ভয় পায় বলেই ওরা সাহসী।”
এই শুনে রাজশেখরের মুখের উদ্দীপ্ত ভাবটা ধীরে—ধীরে ম্লান হয়ে গেল। গলা নামিয়ে শুধু বললেন, ”অনেক কিছুই আমাদের হারিয়ে গেছে।”
দাদুর মুখ দেখে কলাবতী দুঃখ পেল। এই সময় তার মনে পড়ে গেল একটা কথা। চোখ বড় করে সে বলে উঠল, ”জানো দাদু, নাটকের পর গ্রিনরুমে বড়দি চুপি চুপি আমাকে কী বলল?…মঙ্গলার বাচ্চচা হবে আর তিন মাস পরেই।”
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল অপুর মা। সে ঘরে ঢুকল, চোখ চকচক করছে, গলায় চাপা উত্তেজনা, বলল, ”আমাদের খয়েরিরও বাচ্চচা হবে কালুদি।”
শোনামাত্রই কলাবতী দু’হাত তুলে লাফিয়ে উঠল, রাজশেখরের মুখে হাসি ফুটল আর সত্যশেখর মাথা চুলকোতে শুরু করে দিল।
পরের দিন খবরের কাগজে দশ লাইন বেরোল এই ডাকাতির খবর। খবরের শেষে লেখা: ‘ডাকাতির কোনও সূত্র পুলিশ পায়নি, কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ডাকাতি হওয়া ছয় লক্ষ টাকা উদ্ধার করতে পারবে বলে পুলিশ আশা করছে। জোর অনুসন্ধান চলছে।’
সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের জন্য পরদিনও স্কুলের ছুটি। কলাবতী ব্যাঙ্কে গিয়ে জানল যারা গতদিন টোকেন নিয়ে টাকা তুলতে পারেনি তারা আজ পাবে, ব্যাঙ্কের ফটকে রাইফেল হাতে দু’জন পুলিশ, যারা ঢুকছে তাদের দিকে তীক্ষ্ন চোখে তাকাচ্ছে। ভেতরে যথারীতি কাজকর্ম চলছে, পরিবেশ থমথমে। কলাবতী গতকালের টোকেনটা কাউন্টারে যাকে দিল তিনি মুখচেনা। নতুন একটা টোকেন তাকে দিয়ে তিনি বললেন, ”কাল অত তাড়াতাড়ি চলে গেলে কেন, পুলিশ এসে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করল।
