এই বলে সত্যশেখর চেকটা কলাবতীর হাতে দিল। সে এর আগে ব্যাঙ্ক থেকে কয়েকবার চেক ভাঙিয়েছে। তাদের বাড়ির খুব কাছেই ক্যালকাটা ব্যাঙ্কের শাখা। ব্যাঙ্কের কর্মচারীদের অনেকে তাকে চেনে। সাড়ে দশটায় কলাবতী ব্যাঙ্কের কোলাপসিবল গেটে এল। এক মানুষ গলে যাওয়ার মতো ফাঁক রেখে গেটটা মোটা লোহার শিকল জড়িয়ে সেটায় তালা লাগিয়ে বন্ধ। একনলা বন্দুক হাতে দরোয়ান ভেতরে দাঁড়িয়ে। ভেতরে বেশ ভিড়। কলাবতী বুকসমান উঁচু খোলা কাউন্টারে বসা লোকটিকে চেক দিয়ে পেতলের একটা চাকতি টোকেন নিল। তাতে নম্বর লেখা সতেরো। সে পেমেন্ট লেখা লোহার খাঁচার মতো জাল ঘেরা কাউন্টারের সামনে ছোট ভিড়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। খাঁচার মধ্যের লোকটি টোকেন নাম্বার ডাকছে, টোকেন নিচ্ছে, নোট গুনে ফোকরের মধ্যে দিয়ে সেগুলো এগিয়ে দিচ্ছে, টাকা পেয়ে নোট গুনে নিচ্ছে। কলাবতী দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছে এবং দেখতে তার ভালই লাগছে। ব্যাঙ্কের লোকেরা কী অদ্ভুত দ্রুত নোট গোনে এবং ভুল করে না। এটা তাকে অবাক করে। সে এর আগে যে ক’বার টাকা তুলেছে কখনও কাউন্টারে দাঁড়িয়ে গুনে মিলিয়ে নেয়নি। বাড়ি এসে গুনে দেখেছে একটা টাকাও বেশি বা কম নেই।
.
নিবিষ্ট হয়ে সে পিঁপড়ের শুঁড় নাড়ানোর মতো নোট গোনা আঙুলের নড়াচড়া দেখছিল তখনই একটা ভারী গলার চিৎকার করে বলা কথা সে শুনতে পেল, ”কেউ নড়বেন না। যে যেখানে যেমনভাবে আছেন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকুন। বাধা না দিলে আপনাদের কোনও ক্ষতি আমরা করব না।” ব্যাঙ্কের ভেতরে দাঁড়িয়ে কোলাপসিবল গেট টেনে বন্ধ করে দিয়ে লোকটি হাতের রিভলভার দারোয়ানের পেটে ঠেকিয়ে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ভয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিল।
লোকটির মাথায় সাদা ক্যাপ যেমনটি ক্রিকেটাররা পরে। চোখের নীচ থেকে গলা পর্যন্ত মুখ একটা সবুজ রুমাল বেঁধে ঢেকে রাখা। পরনে বিবর্ণ জিনস আর গোলগলা নীল গেঞ্জি, স্বাস্থ্যটা মোটেই কলাবতীর পড়া বিশেডাকাত বা রোঘোডাকাতের মতো নয়, খুবই ছিপছিপে পাতলা।
কলাবতীর পাশ থেকে কেউ ফিসফিস করে বলল, ”ডাকাত পড়েছে। কেউ যেন না বাধা দেয়। ওরা ব্যাঙ্ক লুট করেই চলে যাবে।”
ব্যাঙ্কের ভেতরে তখন প্রায় তিরিশজন লোক। তার মধ্য থেকে তিনজন দ্রুত মুখে কালো রুমাল বেঁধে নিয়ে ছুটে কাডন্টারের ওধারে হলঘরে ঢুকে পড়ল। তাদের দু’জনের হাতে পাইপগান, অন্যজনের হাতে বড় একটা সাদা ক্যাম্বিসের ব্যাগ। ব্যাগ থেকে সে দু’হাত লম্বা একটা মোটা রড বার করে হলঘরের একমাত্র টেলিফোনটাকে পেটাল। ভেঙে ছত্রাকার হয়ে গেল টেলিফোনটা। তারপরই সে হাত বাড়াল সেই টেবলে বসা অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের দিকে। তিনি ভয়ে—ভয়ে মাথা নাড়লেন। ডাকাতটি তার টেবলের খোলা ড্রয়ারটা টেনে একটা চামড়ার ওয়ালেট বার করে খুশিতে মাথা নাড়ল।
ইতিমধ্যে দুই পাইপগানধারী একজন ম্যানেজারের ঘরে ঢুকে পড়েছে। কলাবতী তারপরই টেলিফোন আছড়ে ভাঙার শব্দ পেল। কয়েক সেকেন্ড পর ম্যানেজার পিঠে ঠেকানো পাইপগান—সহ নিরক্ত মুখে কাঁপতে—কাঁপতে বেরিয়ে এলেন, স্ট্রংরুমের চাবি রাখা ওয়ালেটটি ম্যানেজারের হাতে দিয়ে ব্যাগধারী তাকে কী যেন বলল। পাশেই তালা দেওয়া একটা ভারী দরজার দিকে ম্যানেজার এগোলেন। তাকে অনুসরণ করল দু’জন।
”হারি আপ, হারি আপ, ডোন্ট ওয়েস্ট টাইম।” গেটে দাঁড়ানো নেতা অধৈর্য হয়ে চিৎকার করে উঠল। সারা ব্যাঙ্ক পাথর, বোবা। টেবলে বসা কর্মচারীরা ফ্যালফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে। কিছু করতে গেলেই গুলি খেতে হবে। কলাবতী লক্ষ করছিল নেতাকে। একটা মশা বা কোনও পোকা নেতার বাঁ চোখের পাশে কামড়েছে বোধ হয়। মুখে বাঁধা রুমালটা টেনে নামিয়ে সে চুলকোতে শুরু করল। কলাবতী দেখল ওর বাঁ চোখের নীচেই একটা বড় আঁচিল আর বাঁ চোখের ওপর পাতাটা অর্ধেক নেমে, ঘুম পেলে যেমন আধবোজা হয় অনেকটা সেইরকম। নেতার চোখ হঠাৎ পড়ল কলাবতীর ওপর, ভ্রূ তুলে মেয়েটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে। সে দ্রুত রুমালটা টেনে তুলে দিয়ে অস্বস্তিভরে বারকয়েক কলাবতীর দিকে তাকাল।
”ম্যানেজারের টেবলের নীচে তো অ্যালার্মের বাটন আছে, টিপে দিল না কেন?” ফিসফিস করে একজন বলল।
”টিপুক আর গুলি থাক।” সঙ্গে—সঙ্গে আর একটা ফিসফিস হল। ”আগে ব্যাঙ্ক না আগে প্রাণ?”
কলাবতীর কানে আরও কিছু কথা এল :
”দেখলেন, সব আগে থেকে ওরা অবজার্ভ করে রেখেছে, চাবির ব্যাগটা কীরকম ভাবে ড্রয়ার থেকে বার করে নিল!”
”আরে মশাই, ভেতরে ওদের লোক আছে খবর দেওয়ার। ঠিক জানে ভল্ট খুলতে দুটো চাবি লাগে আর সে দুটো কার কার কাছে থাকে।”
ডাকাতদুটো মিনিট তিনেকের মধ্যেই ছুটে স্ট্রংরুম থেকে বেরিয়ে এল। তিনজন হলঘরের মধ্য দিয়ে দৌড়ে কাউন্টারের এদিকে এসে গেটের দিকে এগোল। ভিড় বিভক্ত হয়ে ওদের জন্য যাওয়ার পথ করে দিল। গেটটা ফাঁক করে নেতা দাঁড়িয়ে। ক্যাম্বিসের ব্যাগটা রুগণ অবস্থায় স্ট্রংরুমে ঢুকেছিল, বেরোল এমনই নধর হয়ে যে, গেটের ফাঁক দিয়ে তাকে গলাতে গিয়ে পেটটা আটকে গেল। অবশেষে একটা হ্যাঁচকা টানে তাকে বার করা গেল।
সবশেষে বেরোল নেতা। বেরোবার আগে সে কলাবতীর দিকে একঝলক তাকিয়ে নিল। বেরিয়ে গেটটা টেনে বন্ধ করেই সে ছুটে গিয়ে, ইঞ্জিন চালিয়ে রেখে অপেক্ষা করা একটা মোটরবাইকে উঠে পড়ল। তাতে চালক ছাড়াও বসে ছিল ব্যাগ কোলে নিয়ে অন্য ডাকাতটি। নেতা ওঠামাত্র তিনজনকে নিয়ে বাইকটা পশ্চিম দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল। বাকি দুই ডাকাতকে নিয়ে আর একটা বাইক আগেই রওনা দিয়েছে পূর্ব দিকে। পুরো ব্যাপারটা ঘটতে সময় লাগল মিনিট সাতেক।
